
দেশের সম্পদ– খাল-বিল-নদী-নালা, বন-জঙ্গল, জমি, খনিজ সম্পদ– সমস্ত কিছু দেশি-বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া জোরদার হয়েছে সেই ১৯৯০ সাল থেকে। তারপর ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই প্রক্রিয়া বেগবান হতে হতে চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে। তারই একটা উদাহরণ হল– ‘খনি ও খনিজ দ্রব্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধনী বিল, ২০২৬’ বা এম এম ডি আর সংশোধনী আইন।
এ বছর ১২ আগস্ট বিরোধী বেঞ্চের প্রবল প্রতিবাদের মধ্যে, কোনও আলোচনা ছাড়াই এই আইন লোকসভায় পাশ হয়েছে। পরদিন রাজ্যসভাও তাতে অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে।
এই আইন দেশের খনিজ সম্পদের উপর দেশের কৃষক ও আদিবাসীদের সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে তাঁদের জমির উপর অধিকার। কোনও সংসদীয় কমিটি এই আইনকে পরীক্ষা করে দেখেনি। কোনও রাজ্য সরকারের সাথে পরামর্শ করা হয়নি। যাদের জমি ও জীবিকা সরাসরি বিপন্ন হতে চলেছে, সেই কৃষক ও জমির মালিকরা কিছুই জানতে পারেননি। বাস্তবে শুধু গায়ের জোরে, সংখ্যার জোরে আইনটিকে পাশ করিয়ে নেওয়া হল।
সরকারের উদ্দেশ্য যদি স্বচ্ছ হত, তবে তারা প্রকাশ্যে তা নিয়ে বিতর্ক করতে ভয় পেত না। কিন্তু বিজেপি সরকার জানে, জনগণের স্বার্থরক্ষা এই আইনের উদ্দেশ্য নয়, বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থরক্ষাই এর উদ্দেশ্য। তাই যতটা সম্ভব চুপিসারে, বিতর্ক এড়িয়ে বিল পাশ করিয়ে নিতে সচেষ্ট তারা।
আইনের প্রকৃত চরিত্র
১৯৫৭ সালের ‘খনি ও খনিজ দ্রব্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ)’ সম্পর্কে যে মূল আইন ছিল, এই নতুন আইন তাকে সংশোধন করেছে। এতে মাত্র পাঁচটি ধারা আছে। তবে এর আকার ছোট হলেও এর প্রতিটি ধারাই রাজ্যগুলির কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে কেন্দ্রের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে, প্রতিটি ধারাই সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী।
প্রথমত, এটি মূল আইনের ২ নম্বর ধারাকে পরিবর্তন করে সরকার ‘খনির নিয়ন্ত্রণ এবং খনিজ দ্রব্যের উন্নয়ন’ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেবে। কথাগুলির সাথে ‘এবং খনিজ সমৃদ্ধ জমি’ (and mineral bearing lands) এই চারটি শব্দ যোগ করার মাধ্যমে শুধু খনি এবং খনিজ দ্রব্য নয়, যে জমিতে মানুষ বাস করে, কৃষিকাজ করে, সেই জমিও সরাসরি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বলা হয়েছে ‘খনিজ সমৃদ্ধ জমি’ বলতে বোঝাবে ‘কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী খনিজ উপাদান যুক্ত যে কোনও জমি’। লক্ষ করুন– ‘যে কোনও জমি’। কোন জমির এই যোগ্যতা আছে তা সংসদ, রাজ্য বিধানসভাও ঠিক করবে না, আর গ্রামসভার তো প্রশ্নই ওঠে না। তা ঠিক করবে কেন্দ্রীয় সরকার। তাদের সুবিধামতো নিয়ম (রুলস) তৈরি করে তারাই ঠিক করবে কোন জমি নেওয়া হবে। কতটা খনিজ থাকলে তা নেওয়া হবে বা কতটা বিস্তৃত এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত হবে, তার কোনও মাপকাঠি বা সংজ্ঞা আইনে দেওয়া হয়নি। এই আইন বলে কেন্দ্রীয় সরকার আগামীকালই সিদ্ধান্ত নিতে পারে– এই বনাঞ্চল, এই নদীতীর, এই উপকূলীয় এলাকা বা খনিজ সম্ভারের উপর অবস্থিত এই কৃষিপ্রধান গ্রাম হল ‘খনিজ সমৃদ্ধ জমি’ এবং এই সিদ্ধান্তের বলে সেই জমিকে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যাবে।
তৃতীয়ত, এই নতুন (৯ডি) ধারা যুক্ত করে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকারের শর্তের বাইরে ‘খনিজ অধিকার বা খনিজ সমৃদ্ধ জমির’ উপর রাজ্য সরকার কোনও ট্যাক্স, সেস বা এই ধরনের অন্য কোনও শুল্ক (যে নামেই ডাকা হোক না কেন) বসাতে পারবে না। চতুর্থত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল– ডি-২ ধারা। এই ধারা শুরু হয়েছে এই কথা দিয়ে– ‘বর্তমানে বলবৎ কোনও আইনে, অথবা আদালতের কোনও রায়, ডিক্রি বা আদেশে যা-ই থাকুক না কেন– রাজ্য সরকার যে সব শুল্ক এখনও আদায় করতে পারেনি, তা ‘চিরকালের জন্য বাতিল বলে গণ্য হবে’। তবে রাজ্যগুলো এর মধ্যেই যা আদায় করে ফেলেছে, ‘তা ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন নেই’।
আদালতের কোন রায়ে আপত্তি
আদালতের যে রায়ে আপত্তি, সেটি হল– ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই, ‘মিনারেল এরিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বনাম স্টিল অথরিটি অব ইন্ডিয়া’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট প্রদত্ত রায়। এই রায়ে মাটির নিচের খনিজ সম্পদের ওপর রাজ্যের কিছুটা অধিকার স্বীকার করে বলা হয়েছিল– রয়ালটি কোনও কর নয়, খনিজ অধিকারের ওপর কর বসানোর ক্ষমতা রাজ্যগুলির আছে এবং জমির ওপর কর বসানোর ক্ষমতা খনিজ সমৃদ্ধ জমির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আদালত রাজ্যগুলোকে ২০০৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে কোম্পানিগুলির কাছ থেকে বকেয়া আদায়ের অনুমতি দিয়েছিল। তাতে বলা হয়– ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে বারো বছরের মেয়াদে বকেয়া পরিশোধ করতে হবে। শিল্প দপ্তরের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, এই বকেয়ার পরিমাণ ছিল ১.৫ লক্ষ কোটি থেকে ২ লক্ষ কোটি টাকা।
কথা ছিল ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে এই বকেয়া মেটানো শুরু হবে। কিন্তু কী আশ্চর্য, নতুন আইন তৈরি করার জন্য বিল সংসদে পেশ করা হল ২০২৬ সালের ১০ আগস্ট! আমাদের প্রশ্ন হল, এত তাড়াহুড়ো কাদের স্বার্থে এবং কেন? এখন কোনও সংস্থা রাজ্য সরকারের বকেয়া পরিশোধ না করলেও রাজ্য সরকার সেই টাকার দাবি আর করতে পারবে না। কিন্তু অন্য কোনও সংস্থা যদি একই বকেয়া সময়মতো মিটিয়ে দিয়ে থাকে, তবে তারা আর সেই টাকা ফেরত পাবে না। সুতরাং, যে সংস্থা আইন মোতাবেক কাজ করেছে তার ক্ষতি হল। আর যে সংস্থা মামলা চালিয়ে গেছে, বকেয়া টাকা দিতে অস্বীকার করেছে, সে অনায়াসে ছাড় পেয়ে গেল। এই আইন শুধু খেলাপিদের মাফই করছে না, বরং তাদের পুরস্কার দিচ্ছে এবং যারা আইন মেনেছে তাদের শাস্তি দিচ্ছে।
প্রশ্ন হল, বছরের পর বছর কারা রাজ্য সরকারের বকেয়া টাকা মেটায়নি? তারা হল বড় বড় খনি কর্পোরেশন। তারা রাজ্য সরকার নির্ধারিত কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য অনন্তকাল মামলা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে এবং তারাই রাজ্য সরকারের বকেয়া টাকা দেয়নি। যে লুঠ করতে পারবে তাকে মদত দাও। অর্থাৎ, এই আইন বলছে, সরকারের প্রাপ্য টাকা না দেওয়াটাই এখন বুদ্ধিমানের বাণিজ্যিক কৌশল আর আইন মেনে চলা ব্যয়বহুল বোকামি।
ক্ষতি সাধারণ মানুষের
কিন্তু এটা কেবল সরকার ও কোম্পানিগুলোর হিসাব-নিকাশের বিষয় নয়। রাজস্ব হল জনগণের টাকা। এই টাকাতেই রাস্তা, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, অঙ্গনওয়াড়ি ও পানীয় জলের প্রকল্প তৈরি হয়। যখন কোনও কোম্পানিকে আইনত প্রাপ্য শুল্ক মকুব করা হয়, তখন রাজকোষের যে ক্ষতি হয় তাতে সাধারণ মানুষ নতুন স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা সেচ ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত হন। সেই কারণেই এই নতুন আইনে উল্লিখিত মকুবের বিষয় কোনও কর্পোরেট করের প্রযুক্তিগত প্রশ্ন নয় বা ব্যবসার নীতি সংক্রান্ত কোনও বিতর্ক নয়। এ ক্ষেত্রে জনগণের টাকা বেসরকারি মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ৯ডি(২) ধারায় বাতিল হওয়া প্রতিটি বকেয়া টাকা খনিজ সমৃদ্ধ রাজ্যের মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে খনি কোম্পানিগুলির ব্যালেন্স শিটে রেখে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ জনগণের টাকা গিয়ে ঢুকছে মালিক শ্রেণির পকেটে। একে ‘সংস্কার’ বলার অর্থ হল কর্পোরেট বোর্ডের ভাষা ব্যবহার করে গরিব মানুষের সম্পদ ধনীদের দিয়ে দেওয়া। পরিষ্কার এ একটা জনবিরোধী নীতি এবং এই নীতির সৃষ্টি হয়েছে মুষ্টিমেয় কিছু খনি কর্পোরেশনের (যার মধ্যে অনেক বহুজাতিক সংস্থাও রয়েছে) মুনাফাকে স্ফীত করার জন্য। এবং তা করা হচ্ছে সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিনিময়ে।
জমি রাজ্যের বিষয়
আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, জমি রাজ্যের বিষয় এবং রাজ্য সরকার জমির ওপর কর বসাতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, রাজ্যের এই অধিকার খর্ব করা যায় না। রাজ্য সরকারের এই ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার একতিয়ার সংসদের নেই। সেই কারণে রাজ্য সরকারের কর আরোপের ক্ষমতা সংকুচিত করার কোনও নীতিনির্দেশক মানদণ্ড নতুন আইনে নেই। পুরো বিষয়টাই রুলসের মাধ্যমে নির্ধারণ করার জন্য কার্যনির্বাহী কর্তৃপক্ষের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যার সহজ অর্থ, কেন্দ্রীয় সরকারের শুভ ইচ্ছার উপর সব কিছু ছেড়ে দিতে হবে। প্রশাসনিক আদেশ বলেই কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছা মতো রাজ্য সরকারের মতামতের কোনও তোয়াক্কা না করে জমি অধিগ্রহণ করতে পারবে।
এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার জাতীয় স্বার্থের কথা বলছে।
প্রশ্ন হল, এই তথাকথিত জাতীয় স্বার্থ কাদের স্বার্থ রক্ষা করবে? কাদের জন্য আইন
নতুন আইন তৈরির ‘উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কিত সরকারের বিবৃতি’ পড়ে দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যাবে, এই আইন কাদের জন্য রচিত। এই বিবৃতিতে অভিযোগের সুরে বলা হয়েছে, রাজ্য সরকার কোম্পানিগুলোর উপর ‘ভারী করের বোঝা’ চাপিয়েছে, তারা খনি খাতকে ‘বাণিজ্যিক ভাবে অলাভজনক’ করে তোলার মতো শুল্কের বোঝা চাপিয়েছে। এতে শিল্পের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। তাই, ‘বিকশিত ভারত-২০৪৭-এর ভিশন’-কে সামনে রেখে এর অবসান প্রয়োজন।
প্রতিশ্রুতিতে ভরা কথাগুলো একপাশে সরিয়ে রাখলে দেখা যাবে, মূল যুক্তি খুবই সাধারণ–রাজ্যগুলো খনি কোম্পানির কাছ থেকে অতিরিক্ত চার্জ নিচ্ছিল এবং এতে তাদের মুনাফা কমে যাচ্ছিল। তাই রাজ্যগুলোকে থামাতে হবে।
এখানে ‘বোঝা’ শব্দটি কী ভাবে নিঃশব্দে ব্যবহার করা হয়েছে তা লক্ষ করুন। খনিজের উপর রাজ্য সরকারের শুল্ককে শিল্পের ওপর ‘বোঝা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু মাটির নিচ থেকে সম্পদ নিয়ে যাওয়ার বিনিময়ে এই শুল্ক যে রাজ্যের প্রাপ্য– বিষয়টিকে এই ভাবে দেখা হয়নি।
কোনটা সমস্যা? যে সম্পদ আর কখনও ফিরে আসবে না, সেই সম্পদ লুট করা সমস্যা নয়! বিষাক্ত নদী, কেটে ফেলা বন বা প্ল্যান্ট তৈরির জন্য জলে ডুবে যাওয়া গ্রামের সমস্যার কথা বলা হয়নি। খনি পরিচালনার ‘অর্থনৈতিক মূল্য ও লাভজনকতা’ কমে যাওয়াটাই ওদের ভাষায় মূল সমস্যা! কার লাভজনকতা? কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর লাভজনকতা। সংসদে সরকার তা গোপন করার চেষ্টা করেনি।
সংসদের উভয় কক্ষে বিলটি পাশ হওয়ার পর কেন্দ্রীয় সরকার আত্মপক্ষ সমর্থন করেছে। বলেছে, এটা কেবল প্রধান খনিজগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং রাজ্যগুলো এখনও খনি রাজস্বের প্রায় ৯০ শতাংশ পাবে। বাস্তবে বিষয়টা একেবারেই তা নয়। রাজ্যগুলোকে কতটা অংশ দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন, নতুন আইনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যে রাজ্যের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে। দেশের যে সব রাজ্যে খনিজ সম্পদ রয়েছে, সেখানকার মানুষই পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি, উচ্ছেদ, বন ধ্বংস এবং জল দূষণের শিকার হয়। তাদের বলা হচ্ছে, স্বাধীনভাবে নিজস্ব জমির জন্য তারা আর শুল্ক নির্ধারণ করতে পারবে না। যে রাজ্যকে নিজের জমির উপর কর বসাতে দিল্লির অনুমতি নিতে হয়, সে কি কখনও যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্রের সমান অংশীদার থাকে? থাকে না। সে কেন্দ্রের শর্তে কাজ করা এক ঠিকাদারে পরিণত হয়।
এ কোনও একটা দল বা কোনও একটা অঞ্চলের অভিযোগ নয়। ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী একে একটা ‘কালা আইন’ বলে অভিহিত করেছেন এবং আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ২০২৪-২৫ সালে ঝাড়খণ্ডের নিজস্ব অ-কর রাজস্বের ৮৪.৯ শতাংশই এসেছিল খনি রাজস্ব থেকে। এই রাজস্ব কেড়ে নিলে রাজ্যের পুরো জনকল্যাণমূলক কাঠামো ভেঙে পড়বে। কেরালা বলেছে, এটা যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতির লঙ্ঘন এবং তারা আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অন্যান্য রাজ্যগুলোও এই আইন পর্যালোচনা করছে।
যদিও ভুলে গেলে চলবে না যে, সব সরকার নিজেরাই আদিবাসীদের জমি কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিযোগিতা করছে, তারা জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য গ্যারান্টি হতে পারে না। একমাত্র প্রকৃত গ্যারান্টি হল– কৃষক, আদিবাসী ও শ্রমজীবী মানুষের সংগঠিত শক্তি।
যে বিষয়ে আইন নীরব
এই নতুন আইন বে-আইনি খনি ব্যবসা সম্পর্কে কিছুই বলেনি। অথচ, এই বে-আইনি খনি ব্যবসা প্রতি বছর দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার খনিজ সম্পদ লুটে নেয়। একের পর এক কমিশনের রিপোর্টে এই সব ঘটনা নথিভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত কোনও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কোন জমি খনিজ সমৃদ্ধ এবং তার উপর কী চার্জ নেওয়া যেতে পারে তা ঠিক করার ক্ষমতা কেন্দ্র নিজের হাতে নিয়েছে, কিন্তু রাজ্যে তা প্রয়োগ করার পুরো দায়ভার সেই রাজ্যগুলোর উপরেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের টাকা কেড়ে নিয়ে তারপর তাকে খনি মাফিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হচ্ছে। সবাই জানেন এ অবাস্তব এবং খনি মাফিয়া নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্য নয়।
এই জমিতে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের সম্মতি প্রসঙ্গে কোনও কথা নেই, গ্রামসভা সম্পর্কে কিছু নেই, বন অধিকার আইন (Forest Rights Act) সম্পর্কে কিছু নেই, বা বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন সম্পর্কেও কোনও কথা বলা হয়নি। এই দেশের খনিজ অঞ্চলে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ আদিবাসী ও কৃষকের পরিণতি কী হবে তা নিয়ে একটি শব্দও এই আইনে খরচ করা হয়নি।
বিশ্বের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলেছেন, খনিজ পদার্থ উত্তোলনের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, পরিবেশের উপর তার প্রভাবকে খেয়ালে রাখতে হবে। কিন্তু এই নতুন আইনে এই প্রসঙ্গে একটা কথাও বলা হয়নি। যেন ভারতে খনি খাতের একমাত্র সমস্যা হল– কোম্পানিগুলো যথেষ্ট দ্রুত গতিতে মুনাফা করতে পারছে না! সাম্যবাদী আন্দোলনের অন্যতম পথপ্রদর্শক এঙ্গেলস বহু দিন আগে যা লিখেছিলেন এই প্রসঙ্গে তা আমাদের মনে রাখা উচিত– ‘প্রকৃতির উপর মানব বিজয়ের জন্য আমরা যেন নিজেদের অতিরিক্ত প্রশংসা না করি। কারণ প্রতিটি বিজয়ের জন্য প্রকৃতি আমাদের উপর প্রতিশোধ নেয়।’ এই আইন বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর খনিজ উত্তোলনকে দ্রুত ও লাভজনক করার জন্য তৈরি হয়েছে। তৈরি হয়েছে এমন একটা সময়ে যখন জলবায়ু সংকট দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে। তাই এই আইন জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে এ কথা বলা চলে না। এই আইন জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ও প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মালিকদের পকেট ভরানোর আইন।
আইন আরও যে বিষয়টা লুকোচ্ছে তা হল– খনিজ কোনও ফসল নয়। মাটি থেকে তোলা প্রতি টন আকরিক এমন এক সম্পদ যা মানুষ পুনরুৎপাদন করতে পারে না। এর মূল্য চোকানো হয় জমি, জল, বন এবং তার উপরে থাকা মানুষের জীবনের বিনিময়ে। এই ধরনের সম্পদকে সচেতন ভাবে, পরিমিত ভাবে এবং একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে হয়। আর সেই উদ্দেশ্য হতে পারে কেবল দেশের মানুষের উন্নয়ন ও কল্যাণ। খনি খননের যৌক্তিকতা কেবল তখনই থাকে যখন তা যে মাটি থেকে নেওয়া হয়েছে সেখানকার মানুষকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়া হয়, অন্য কিছুতেই তার ক্ষতিপূরণ হয় না।
এখানে বা দুনিয়ার অধিকাংশ খনিজ সমৃদ্ধ দেশে তা ঘটছে না। প্রকৃতপক্ষে মানুষের কী প্রয়োজন তার তোয়াক্কা না করে অসংযতভাবে খনিজ দ্রব্য উত্তোলন করা হচ্ছে এবং বিদেশের বাজারে তা চালান করা হচ্ছে। অন্য দিকে যাঁরা সেই জমিতে বাস করেন তাঁদের জন্য পড়ে থাকছে গর্ত, ধুলো আর শুকনো কুয়ো। আকরিক চলে যায়। মুনাফা চলে যায়। থেকে যায় কেবল ক্ষয়ক্ষতি। মানুষের উন্নয়নের জন্য সীমিত সম্পদের সতর্ক ব্যবহার আর কর্পোরেট মুনাফা ও রপ্তানি অর্ডারের জন্য পৃথিবীর বুক নির্দয় ভাবে চিরে ফেলা– এই দুয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত।
এই দেশের খনিজ অঞ্চল কোনও ফাঁকা জমি নয়। এ ভারতের আদিবাসী, দলিত ও সবচেয়ে দরিদ্র কৃষকদের বাসস্থান। এই বাসস্থান পূর্বাঞ্চলের ও মধ্যাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে বিস্তৃত। সেই অঞ্চলে মাটির নিচে আকরিক ও কয়লা পড়ে আছে।
আজ আমরা দেশের নানা এলাকায় দেখতে পাচ্ছি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নামে ইস্পাত কারখানা এবং বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য উর্বর গ্রাম ও বনাঞ্চল অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। সেখানে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সেই চাকরি কখনও পাওয়া যায় না অথবা নির্মাণ পর্ব শেষ হলেই তা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। এই আইনেও একই উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে– কিন্তু তারও অবস্থা যে একই রকম হবে এতে কোনও সন্দেহ নেই।
তাই সাধারণ মানুষের কাছে এই আইনের দুটো বাস্তব অর্থ দাঁড়ায়। প্রথমত, যে টাকা তাদের জেলায় একটি স্কুল, একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা একটি চেক ড্যামের জন্য দেওয়া যেত, তা এখন খনি কোম্পানিগুলোর অ্যাকাউন্টে থেকে যাবে। এই ধরনের অনেকগুলি জেলায় অন্য কোনও উল্লেখযোগ্য রাজস্বই নেই। আদিবাসী সম্প্রদায়, মহিলা ও শিশুদের জন্য জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো এই খনিজ শুল্কের ওপর ভিত্তি করেই চলে। শুল্ক চলে গেলে প্রকল্পগুলোও তার সাথে চলে যাবে।
দ্বিতীয়ত, কেন্দ্র নিজের তৈরি মানদণ্ডের ভিত্তিতে ‘যে কোনও জমি’-কে খনিজ সমৃদ্ধ জমি হিসেবে ঘোষণা করার ক্ষমতার অধিকারী। যেখানে খনি আছে, জমি তার সাথেই চলে যাবে। উপরের মাটি ছেঁটে ফেলা হবে এবং যে জমি বংশপরম্পরায় একটি পরিবারকে অন্ন জোগাত তা শেষ হয়ে যাবে। খনি শুকনো রাখার জন্য ভূগর্ভস্থ জল তুলে নেওয়ার ফলে কুয়োগুলো বছরের পর বছর শুকিয়ে থাকে, আর অবশিষ্ট জল পানের অযোগ্য হয়ে পড়ে। গবাদি পশুর চরে বেড়ানোর জায়গা থাকে না এবং যতটুকু ফসল টিকে থাকে তা ধুলোয় ঢেকে যায়। যে বন আদিবাসী পরিবারকে জ্বালানি কাঠ, মহুয়া, কেন্দু পাতা ও ওষুধ জোগাত তা কেটে ফেলা হয় এবং জঙ্গলে যে সব প্রাণী বাস করত তাদের তাড়িয়ে দেওয়া বা মেরে ফেলা হয়। অন্য কারও ঠিক করা ক্ষতিপূরণের টাকাকে ভিত্তি করে পুরো পাড়াকে কোনও পুনর্বাসন কলোনিতে সরিয়ে নেওয়া হয়, আর শত শত বছর ধরে যারা নিজস্ব অস্তিত্ব বজায় রেখেছে এমন এক-একটি জনগোষ্ঠী ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তারা এই স্থানান্তরণের ধাক্কা সামলাতে পারে না। খনি অঞ্চলে যা পড়ে থাকে তা উন্নয়ন নয়, বরং একটা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট যা আকরিক শেষ হওয়ার পরও বহুকাল ধরে বজায় থাকে। সরকারের ‘অর্থনৈতিক মূল্য ও লাভজনকতা’-র হিসাবের মধ্যে এর কোনও কিছুরই অস্তিত্ব থাকে না। কোম্পানি হিসাব করে সে কত মুনাফা পেল। সে হিসাব করে না, পেছনে সে কী ফেলে গেল।
ওরা এই সব কিছুকে ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে দাবি করে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, কার দেশ, কার স্বার্থ? ভারতের মাটির নিচের সম্পদ সেই মাটির মানুষের, যাঁরা বহু প্রজন্ম ধরে সেখানে বাস করছেন, যাঁরা এর ওপর তাদের জীবন ও সমাজ গড়ে তুলেছেন। ২০২৬ সালের ১৫৪ নম্বর বিল এবং লোকসভার কোনও সংখ্যাগরিষ্ঠতাই এই সত্যকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে না। তাই এই কালা আইনের বিরোধিতা করতেই হবে আদালতে, বিধানসভায় এবং সর্বোপরি গ্রাম ও ময়দানে, যেখানে এর প্রভাব সবচেয়ে আগে এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ভাবে পড়বে।