Breaking News

গণবিক্ষোভে উত্তাল আলবেনিয়া

একটা গোটা দ্বীপপুঞ্জ বেসরকারি মালিকের হাতে তুলে দিচ্ছে আলবেনিয়া সরকার! সেখানে বিলাসবহুল রিসর্ট, হোটেল সহ টুরিস্টদের বিনোদনের যাবতীয় ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দশ হাজারের বেশি অ্যাপার্টমেন্ট, ভিলা তৈরি হবে সেই এলাকায়। এর মালিক যে সে নন, স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাই জারেড কুশনার ও মেয়ে ইভাঙ্কা ট্রাম্প।

মাত্র পৌনে তিরিশ লক্ষ নাগরিকের বাস দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের ছোট দেশ আলবেনিয়ায়। সেখানে প্রভাবশালী ওই বেসরকারি সংস্থার কুনজর পড়ায় আতঙ্কিত দেশের সমস্ত স্তরের মানুষ। এ দিকে আলবেনিয়া সরকার কুশনারের ট্যুরিজম ব্যবসার যাবতীয় বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী এডি রামা বলেছেন, ‘দেশ যে ব্যবসা-বান্ধব নয় সেই কলঙ্ক এ বার ঘুচবে। এই প্রকল্প কার্যকর হলে সাজন দ্বীপপুঞ্জ ও উপকূলবত¹ এলাকা ভারন্যাকে উন্নয়ন হবে। এই প্রকল্পকে সাদরে আবাহন করা উচিত দেশবাসীর’।

তা হলে গোটা আলবেনিয়ার মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছে কেন, পরিবেশবিদরাই বা বিরোধিতা করছেন কেন এই প্রকল্পের?

এই প্রকল্পের অন্তর্গত সাজন দ্বীপপুঞ্জ ও ভারন্যাকের উপকূলবত¹ এলাকায় অসংখ্য ফ্লেমিঙ্গো পাখি, সিল মাছ ও কচ্ছপের বসবাসের জলাভূমি, বিভিন্ন পরিযায়ী পাখির বাসা বাঁধার জায়গা, নানা বন্যপ্রাণীর সংরক্ষিত অঞ্চল। এ ছাড়া রয়েছে পাইনের ঘন বন। উন্নয়নের নাম করে ়কার্যত প্রকৃতিকে ধ্বংস করে বিনোদন-ব্যবসার এই উদ্যোগকে পরিবেশবিদরা মেনে নিতে পারেননি। বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষও ‘জাতীয় সম্পত্তি বিক্রির জন্য নয়’, ‘আমরা আলবেনিয়াকে দুবাই বানাতে চাই না’– স্লোগান দিয়ে রাজপথে নেমেছেন। দুষ্পাপ্র্য ফ্লেমিঙ্গো পাখি বাঁচাতে আন্দোলনকারীরা এই বিক্ষোভের নাম দিয়েছেন ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’।

কুশনারের প্রকল্পের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভে ফুঁসছে গোটা আলবেনিয়া। ‘প্রকল্প বন্ধ কর’, ‘আলবেনিয়া বিক্রির জন্য নয়’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে হাজার হাজার মানুষ রাজধানী তিরানাতে বিক্ষোভ দেখিয়ে চলেছেন। মে মাসে কুশনারের কোম্পানির সাথে আলবেনিয়া সরকারের চুক্তির সময় থেকেই প্রতিবাদ জানিয়ে চলেছেন দেশের পরিবেশবিদ থেকে শুরু করে অসংখ্য পরিবেশ সচেতন মানুষ। ইতিমধ্যেই ১.৪ বিলিয়ন ইউরোর এই প্রকল্প নিয়ে দুন¹তির অভিযোগও উঠেছে। বিক্ষোভের আগুন মাত্রাছাড়া হয় যখন প্রকল্প এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া এবং অন্যান্য নির্মাণকাজ শুরু হয়। জুনের শুরু থেকেই লাগাতার বিক্ষোভ চলতে থাকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও প্রশাসনিক নানা ভবনের সামনে। সরকার বিক্ষোভ দমন করতে সেনাবাহিনীকে নামায়, নির্বিচারে গ্রেপ্তার করে, আহত হন অনেকে। বিক্ষোভ প্রবল হতে থাকে। ১০ জুন রাজধানীতে এ যাবৎ কালের সর্ববৃহৎ বিক্ষোভে সামিল হন হাজার হাজার মানুষ।

সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ তীব্র বুঝেই স্বৈরাচারী এডি রামা সরকারের দাঁত-নখ বেরিয়ে পড়ে। বেসরকারি নিরাপত্তা বাহিনী, সেনা নামিয়ে তারা বিক্ষোভ দমনের পথ নেয়। সেনার ধরপাকড়ের ভিডিও ভাইরাল হতেই আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভ থেকে দাবি ওঠে, কুশনার কোম্পানির সমস্ত নির্মাণকাজ বন্ধ করতে হবে, অবিলম্বে সব যন্ত্রপাতি সরিয়ে নাও’। জানা গেছে, কুশনারের কোম্পানির থাবা বসানোর পরিকল্পনা বহুদূর বিস্তৃত। তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের বিস্তার আলবেনিয়া সংলগ্ন সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড পর্যন্ত। আসলে আলবেনিয়ার এডি রামা সরকার ঘরে-বাইরে বিপদের মুখে পড়েছে। এক দিকে দেশের ভিতরে প্রবল বিক্ষোভ, উন্নয়ন পদক্ষেপে ঝুঁকি রয়েছে জেনেও তাঁর অনড় অবস্থান জটিলতা বাড়াচ্ছে। অন্য দিকে আলবেনিয়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। অথচ ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী সংস্থা ইউরোপিয়ান কমিশন আলবেনিয়াকে সতর্ক করেছে এই ঘটনা নিয়ে।

আলবেনিয়ার ঘটনার সাথে ভারতের হুবহু মিল রয়েছে। ওই দেশের সরকার স্থানীয় পরিবেশ-প্রকৃতি ধ্বংসের তোয়াক্কা না করে উন্নয়নের নামে কর্পোরেট পুঁজিগোষ্ঠীর হাতে তুলে দিচ্ছে সাজন দ্বীপপুঞ্জ ও ভারন্যাকের উপকূলবত¹ এলাকাকে। ভারতের বিজেপি সরকার নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে কর্পোরেট আদানিগোষ্ঠীর হাতে তুলে দিচ্ছে প্রতিরক্ষায় উন্নয়নের কথা বলে। ধ্বংস করছে লুপ্তপ্রায় জনজাতি, বণ্যপ্রাণী ও প্রবাল প্রাচীর, চিরহরিৎ অরণ্য সহ বিপুল এলাকা। ভারতের মতো আলবেনিয়াতেও জল-জঙ্গল-জমি কর্পোরেট হাঙরদের হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে।

দেশে দেশে আন্দোলনকারী জনগণ বুঝতে পারছে, উন্নয়ন আসলে হচ্ছে কর্পোরেট পুঁজিপতিদের। সাথে সাথে তারা এটাও উপলব্ধি করছে, সরকারের পুঁজিপতি তোষণকারী নীতির বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলাই সাধারণ মানুষের অধিকার বুঝে নেওয়ার একমাত্র পথ।