Breaking News

শাসকদলের পূর্ণ মদতেই জ্ঞানেশ কুমার কাজ করেছেন

জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্ত ও এসআইআর বাতিলের দাবিতে ২৮ সেপ্টেম্বর এসপ্ল্যানেডে এসইউসিআই(সি)-র বিক্ষোভ মিছিল। পোড়ানো হয় জ্ঞানেশ কুমারের কুশপুতুল।

এত দিন ধরে নির্বাচন কমিশনের সাথে বিজেপি-র আঁতাতের যে অভিযোগ সাধারণ মানুষ করছিলেন, তা একেবারে খোলাখুলি সামনে চলে এল ২৩ সেপ্টেম্বর। ‘দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে দুই সাংবাদিকের অন্তর্তদন্তে দেখা গেছে, এসআইআর নামক বিশাল কাণ্ডটি যে নির্বাচন কমিশনের নামে সম্পন্ন হয়েছে, তা বাস্তবে চলেছে কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপির কলের পুতুল হিসাবে কাজ করা মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে। এমনকি তাঁর সমান পদমর্যাদার অন্য দুই কমিশনারও থেকেছেন পুরো অন্ধকারে। এই কায়দাতেই দেশের ১৩ কোটি মানুষের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। সমস্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও আইনি পরিসরকে অস্বীকার করে যথেচ্ছাচার চালিয়েছেন বিজেপির শীর্ষ নেতাদের বিশেষ আস্থাভাজন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী মুখ্য নির্বাচন কমিশনার একা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তিন কমিশনারের মতানৈক্যের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকেই মান্যতা দেওয়া বিধি। অথচ এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে দিনের পর দিন কোনও বৈঠক হয়নি। বৈঠকের কোনও লিখিত সিদ্ধান্ত নেই। ভারতের নির্বাচন কমিশনের বহু নির্দেশিকা অপর দুই কমিশনার সংবাদমাধ্যম থেকে বা অন্য সূত্র থেকে জেনেছেন। অর্থাৎ স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা হিসাবে যে অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থাকা দরকার, তার কিছুই ছিল না নির্বাচন কমিশনে।

জ্ঞানেশ কুমার তবে কার সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করেছেন? কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহের তিনি বিশেষ ঘনিষ্ঠ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব থাকার সময় তিনি সংসদকেও কার্যত অন্ধকারে রেখে জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিলের পরিকল্পনা তৈরি, রাম জন্মভূমি ট্রাস্ট গঠনের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিজেপির রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাকে প্রশাসনিক স্তরে রূপ দেওয়ার কাজ দক্ষতার সাথে করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, ২০১৯ সালে কেরলার প্রাক্তন মুখ্য সচিবকে বিজেপির টিকিটে লোকসভা ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরামর্শ দেন তিনি, মন্ত্রীত্বের সম্ভাবনার কথাও বলেন। এ ভাবে জ্ঞানেশ কুমার বিজেপির সেবকের ভূমিকা পালন করে গেছেন। রাজ্যে রাজ্যে সরকার দখলের জন্য বিজেপি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে, জ্ঞানেশ কুমারের উপর দায়িত্ব দিয়ে কার্যত দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করে ওই পদকেই অসম্মান করেছে।

যে ১৩ কোটি মানুষকে ‘অনাগরিক’ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, বিজেপির নেতামন্ত্রীরা গলা ফাটিয়ে বলে গেছেন– এরা ‘দেশবিরোধী’, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’, ‘রোহিঙ্গা’। এতদিন দেখা যাচ্ছিল ভোটার তালিকা থেকে কত নাম বাদ যাবে তা বিজেপি নেতারা আগাম বলে দিতে পারছিলেন। মানুষ অবাক হয়ে ভাবত, কী করে সম্ভব! আজ স্পষ্ট, নির্বাচন কমিশন বিজেপির দপ্তরে পরিণত হয়েছে বলেই তাঁদের পক্ষে এগুলো বলে দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল। তাই নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে যখন সমালোচনার ঝড় উঠছে, তখন নির্বাচন কমিশন কোনও উত্তর দেওয়ার আগেই বিজেপির বিভিন্ন স্তরের নেতা নেত্রী মুখপাত্ররা ব্যাকুল হয়ে তার জবাব দেওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছেন বিজেপি নেতা-মন্ত্রীরা। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে যে অন্ততপক্ষে পদ্ম পুরস্কারে ভূষিত করা দরকার সে কথা বলছেন এ রাজ্যের বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য! কারণ কী? পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় কাটা গেছে প্রায় ৯১ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার। পরিসংখ্যান বলছে, এ রাজ্যে বিজেপির জয়ের ব্যবধান প্রায় ৩৩ লক্ষ। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ৪৯টি আসনে জয়ের ব্যবধানের থেকে ডিলিটেড ভোটারের সংখ্যা বেশি। বিহারে প্রায় ৪৭ লক্ষ মানুষ ভোট প্রয়োগের অধিকার হারিয়েছেন। বিহারের ২৪টি আসনে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ২০২৪-এ লোকসভা ভোটের জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ এই বাদ পড়া ভোটাররা নির্বাচনের ফলাফলে অন্যতম নির্ণায়ক শক্তি।

বোঝা যাচ্ছে, কেন ২০২৩ সালে একশো জন বিরোধী সাংসদকে সাসপেন্ড করে তড়িঘড়ি লোকসভায় ‘নির্বাচন কমিশন নিয়োগ বিল’ উত্থাপন করেছিল মোদি সরকার। কার্যত বিরোধীশূন্য অবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের রায় বদলে দিয়ে এই বিলকে আইনে পরিণত করা হয়েছিল। নতুন আইন অনুযায়ী মুখ্য ও অপর দুই নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ কমিটি থেকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী, তাঁর মনোনীত কোনও এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিরোধী দলনেতা নির্বাচক কমিটির অন্তর্ভুক্ত হন। গণতন্তে্রর বাইরের ঠাট বজায় রাখতে বিরোধী দলনেতাকে নির্বাচক কমিটিতে রাখলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনাররা যে শাসক শিবিরের মনোনীতই হবেন তা বলাই বাহুল্য।

তাই দেখা গেল, বিজেপি ‘অনুপ্রবেশ’, ‘অনুপ্রবেশ’ করে যত চিৎকার করেছে নির্বাচন কমিশন তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিত্যনতুন নিয়ম পরিবর্তন করে, আবেদনপত্রের বিন্যাস পাল্টে দিয়ে, সেই বক্তব্যেই সিলমোহর দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে দেখা গেছে এসআইআর-এর প্রথম ধাপে ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জনের নাম বাদ যায়। বিজেপি নেতারা অনুপ্রবেশকারীর যে সংখ্যা দাবি করছিলেন, তার তুলনায় নির্বাচন কমিশনের বাদ দেওয়া নামের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় কমিশন ঝাঁপিয়ে পড়ে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির অদ্ভুত তত্ত্ব এনে তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে একটা বড় অংশের নাগরিকদের বিচারাধীন বলে চিহ্নিত করার কাজে। শেষপর্যন্ত প্রায় ৯১ লক্ষ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

কিন্তু শুধু কি নির্বাচন কমিশন? বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর ক্ষেত্রে দেখা গেছে ব্যাপক বিক্ষোভকে সামাল দিতে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের কিছু সাধারণ পদক্ষেপের সমালোচনা করে তা সংশোধন করার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে যে পদ্ধতিতে কমিশন এসআইআর পরিচালনা করছে এবং তার ফলে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে সেই সম্পর্কে নীরবই থেকেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ও কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সুপারিশে নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়া নাগরিকদের শুনানির ক্ষেত্রে ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। মূলত কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়ে এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। এ ছাড়াও দেড়শো জন বর্তমান ও প্রাক্তন জেলা জজকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে এই যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হল, তার কাজের অগ্রগতি কেমন? পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর ট্রাইব্যুনালে মুর্শিদাবাদ থেকে সর্বোচ্চ– ৭ লক্ষ ৪৮ হাজারের কিছু বেশি আবেদন জমা পড়েছে। এ পর্যন্ত ফয়সালা হয়েছে মাত্র ৫৯৫টি, অর্থাৎ ০.১ শতাংশ। মালদহে প্রায় ৫ লক্ষ ৩১ হাজার আবেদনপত্রের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৬১০টি, অর্থাৎ ০.৩ শতাংশ। এই গতিতে কাজ চললে সমস্ত আবেদনের নিষ্পত্তি হতে অন্তত ১২ বছর সময় লাগবে বলে অনুমান। নাম বাদ পড়া লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের যে আশঙ্কা-হতাশা, এতগুলি বছর ধরে তা কি তাঁরা বয়ে নিয়ে চলবেন? এই মানুষগুলির দিকে আদালতের কি সত্যিই নজর আছে? গোটা এসআইআর প্রক্রিয়াটি নাগরিকদের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি করেছে, ব্লক লেভেল অফিসারদের সীমিত সময়ের মধ্যে নিত্যনতুন অভিনব নির্দেশিকা দিয়ে যে ভাবে চাপে ফেলা হয়েছে, তাতে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে শতাধিক মৃত্যু ও আত্মহত্যার ঘটনা ইতিমধ্যে ঘটেছে এবং এখনও ঘটে চলেছে। এর দায় কার? ভোটের দিন রক্তপাত সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম না হলেও প্রাক-ভোট পর্বে শতাধিক মৃত্যু ভারতের ইতিহাসে কখনও ঘটেছে? নির্বাচন কমিশনের কর্তাব্যক্তিরা, মহামান্য আদালত– এর উত্তর দেবেন কি? এখন দেখা যাচ্ছে, দুই কমিশনার আগেই বলেছিলেন, নাম তোলার ফর্ম ৬-এ বেআইনি পরিবর্তন সহ নানা বেআইনি কাজ এসআইআর-এর সময় হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ইআরও-দের ইসিআই নেট অ্যাপে কার্যত ঢুকতে না দিয়ে নির্বাচন কমিশনের আইটি সেলের প্রধান এবং মুখ্য কমিশনারই বেআইনি ভাবে নাম তোলা ও কাটার কাজ করেছেন। এমনকি রাজ্য সিইও-রাও কোনও কিছুতে হস্তক্ষেপ করতে পারেননি। সমস্তটাই চরম বেআইনি। কিন্তু আদালতও এই বেআইনি কাজের প্রতি চোখ বুজে থাকল কী করে– এ প্রশ্ন উঠছে।

আজ দেখা যাচ্ছে আদালত, নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইত্যাদি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি শাসকদলের আজ্ঞাবহে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনিক ফ্যাসিবাদ অনেকাংশেই কায়েম হয়েছে। ধীরে ধীরে প্রশাসনিক ফ্যাসিবাদ কায়েম করার জন্য তাদের বিশ্বস্ত সেবাদাস বিজেপিকে তারা দায়িত্ব দিয়েছে। এ জন্য তারা উগ্র হিন্দুত্ববাদ-মুসলিম বিদ্বেষ ছড়াতে অধুনা ‘অনুপ্রবেশ তত্ত্ব’ খাড়া করছে। যে কোনও বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দিয়ে এই তত্ত্বকে বাস্তবে রূপ দিতে সংবাদমাধ্যম, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনকে কাজে লাগাচ্ছে তারা। তবে আশার কথা, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সব মানুষ মুখ বুজে এগুলি সহ্য করছেন না। সাংবাদিকদের কেউ কেউ সত্য উদঘাটনে এগিয়ে আসছেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ ও সমস্ত বৈধ নাগরিকদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে রাজ্যে রাজ্যে ছাত্র-যুবক-মহিলারা পথে নামছেন। পুলিশি নিপীড়ন, জল কামান উপেক্ষা করে প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন। চাপে পড়ে মামুলি কিছু নিয়ম পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন। বিবৃতি দিয়ে জানাতে বাধ্য হচ্ছে তাদের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত। আন্দোলনের স্ফূলিঙ্গে যারা ভীত, দাবানলে তাদের ভিত কেঁপে উঠবেই। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের ঐক্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা শক্তিশালী গণআন্দোলনই পারে একদিকে সমস্ত কুকর্মের নায়ক জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে, তেমনই ১৩ কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এসআইআর বাতিল করতে।