সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও ব্যাঙ্কের অস্থায়ী কর্মীদের ন্যূনতম মজুরি মিলছে না

অন্যান্য সংগঠিত শিল্পের মতো ব্যাঙ্ক শিল্পেও আজ কন্ট্র্যাক্ট ও ক্যাজুয়াল কর্মীদের মতো অস্থায়ী কর্মীদের সংখ্যা দিনের পর দিন বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে ব্যাঙ্কের স্থায়ী কর্মচারীর সংখ্যা। এক সময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা ছিল ১৩ লক্ষের উপর। তখন ব্যাঙ্কে কাজের বোঝা যা ছিল বর্তমানে কাজ তার কয়েক গুণ বেশি হওয়া সত্ত্বেও কর্মীসংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ লক্ষ ৫৮ হাজারে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ– স্থায়ী কাজে স্থায়ী কর্মী নিয়োগ করতে হবে। অথচ সরকার নিজেই এই নির্দেশ মানছে না। বিপরীতে ভারত সরকার তথা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার অধীনস্থ সারা দেশের সরকারি এবং বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলিতে স্থায়ী কাজে অস্থায়ী কর্মী কে কত বেশি নিয়োগ করতে পারে তার এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সম কাজে সম বেতনের নীতিও এখানে মানা হয় না। শোষণ বঞ্চনা এত তীব্র যে সরকার ঘোষিত নূ্যনতম বেতন যা বাজারদরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ৬ মাস অন্তর পরিবর্তিত হয়, যা আবার শ্রমের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে যথেষ্ট কম, তাও দেওয়া হয় না ওই সব অস্থায়ী কর্মীদের। এঁদের অধিকাংশ উচ্চশিক্ষিত এবং ব্যাঙ্কের বহুবিধ কাজের উপযুক্ত। সে কারণে তাঁদের অনেককে সুনির্দিষ্ট কাজের বাইরেও কিছু কাজ করতে বাধ্য করা হয়। সেই কাজ না করলে বিভিন্ন অজুহাতে ছাঁটাই করা হয়। কর্তৃপক্ষের দেওয়া উক্ত কাজ করতে নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলে ওভারটাইম পেমেন্ট অনেককে দেওয়া হয় না।

ন্যূনতম বেতনের কথা উঠলে বলা হয় রাজ্য সরকার নির্ধারিত বেতন তাঁদের দেওয়া হচ্ছে। হিসাব কষে দেখা যায় সেটাও পান না অনেকে। কারণ, এঁদের বেশিরভাগকে ব্যাঙ্ক সরাসরি নিয়োগ করে না। ব্যাঙ্ক নিযুক্ত ভেন্ডার বা ঠিকাদারদের দ্বারা এঁরা নিযুক্ত হন। সেখানেও নানা বেনিয়মের অভিযোগ মেলে অহরহ। প্রধান নিয়োগকর্তা ব্যাঙ্ক ভেন্ডারদের কাজকর্ম খতিয়ে দেখলে এমনটা হওয়ার কথা নয়। তা তাঁরা সবসময় ঠিকমতো দেখেন না। যদি দেখা হত, তবে এই সমস্ত কর্মীদের কমপক্ষে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত ন্যূনতম বেতন যা রাজ্য সরকার নির্ধারিত বেতনের চেয়ে বহু ক্ষেত্রে বেশি, তা দিতে ভেন্ডাররা বাধ্য থাকত। বাধ্য থাকত নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বেতন দিতে। এ ব্যাপারে আইন হ’ল, কোনও মাসের বেতন দিতে হবে তার পরের মাসের ৭ তারিখের মধ্যে। ভেন্ডার দিতে ব্যর্থ হলে তা দিতে হবে নিয়োগকর্তাকে। তা অনুসৃত হচ্ছে না। মূল নিয়োগকর্তা সতর্ক থাকলে ভেন্ডার বাধ্য থাকত ছুটি, নির্দিষ্ট পোশাক বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিতে। গ্র্যাচুইটি, বোনাস, লিভ-পে, ওভার টাইম পেমেন্ট, সময়ে পিএফ-এর টাকা জমা করা দিনে দিনে বিলম্বিত কিংবা অধরা হয়ে যাচ্ছে নজরদারির অভাবে।

স্থায়ী কাজে নিযুক্ত অস্থায়ী কর্মীদের সময়ে সময়ে স্থায়ীকরণও সুপ্রিম কোর্টের আর এক নির্দেশ। সেখানেও ব্যাঙ্কের সর্বোচ্চ পরিচালকরা উদাসীন। তাঁরা ব্যাঙ্কের লাভের অঙ্ক বাড়াতে ব্যস্ত। লাভের অঙ্ক বাড়ানোর লক্ষ্যে আমানতের উপর সুদের হার কমানো হয়েছে, পরিষেবা শুল্কের ক্ষেত্র এবং পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে, সেভিংস অ্যাকাউন্টের একটা মোটা অংশকে কারেন্ট অ্যাকাউন্টে রূপান্তরিত করা হচ্ছে, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ঋণে সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। তারা জানে স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা বাড়লে অতি মুনাফার লক্ষ্য ব্যাপক ভাবে মার খাবে। সে কারণেই স্থায়ী কর্মী সংকোচন প্রক্রিয়া অব্যাহত। সেই লাভের টাকা যে ঘুরপথে এ দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের ঘরে ঢুকছে তা নিয়ে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের কোনও উদ্বেগ নেই। প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ তথা জি গ্রুপের কর্ণধার সুভাষচন্দ্রের ২২ হাজার কোটির ঋণ মকুব মাত্র ৬.৫ কোটিতে। এমনি অবাধে বহু বড় বড় বকেয়া ব্যাঙ্কঋণ নানা অছিলায় মকুব করে দেওয়া হচ্ছে বৃহৎ পুঁজির মালিকদের। বস্তুত সরকারের আকাঙক্ষা পূরণ করতে, মুষ্টিমেয় ধনকুবেরের সম্পদ আরও স্ফীত করতেই ব্যাঙ্কের এ হেন পরিকল্পনা, এমন উদ্যোগ। এর ফলে দেশের আর্থিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। মার খাচ্ছে অস্থায়ী ব্যাঙ্ককর্মী, গ্রাহক সহ সাধারণ মানুষ।

শ্রমিক-কর্মচারীদের এ ভাবে নানা কায়দায় বঞ্চনা করেই ব্যাঙ্ক মুনাফার পাহাড় দীর্ঘতর করছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার লক্ষ্য সর্বোচ্চ মুনাফা। সেই লক্ষে্যই এই ব্যবস্থায় শ্রমিক কর্মচারীদের যত বেশি সম্ভব শোষণ করা হয়। শোষণের নানা প্রক্রিয়া কর্তারা আবিষ্কার করে। এই দিকটি সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি করতে হবে। এই শোষণের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ককর্তারা হলেন কার্যকরী ম্যানেজার। এই শোষণ ব্যবস্থা যতদিন থাকবে শ্রমিক বঞ্চনা আরও বহুমুখী পথ নেবে। এর বিরুদ্ধে ব্যাঙ্ককর্মীদের সজাগ হতে হবে, গড়ে তুলতে হবে ন্যায়সঙ্গত ও শক্তিশালী আন্দোলন। গ্রাহক সহ বিভিন্ন অংশের শ্রমজীবী মানুষকে যুক্ত করে ঐক্যবদ্ধ ব্যাঙ্ক কর্মচারী আন্দোলনই পারে এই সমস্যা সমাধানের রাস্তা দেখাতে।