
ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি রাশিয়ায় ঘটে চলেছে। জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েত উঠে দাঁড়িয়েছে। প্রলেতারিয়েতকে বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দিয়েছে সরকার। এখন এ ব্যাপারে সন্দেহের খুব সামান্যই অবকাশ রয়েছে যে সরকার ইচ্ছাকৃত ভাবে এই ধর্মঘট-আন্দোলনকে ক্রমশ বাড়তে দিয়েছিল এবং ব্যাপক বিক্ষোভ-আন্দোলন শুরু হতে দিয়েছিল, যাতে ব্যাপারটা চরম অবস্থায় পৌঁছয় এবং সেনাবাহিনী তলব করার একটা অজুহাত খাড়া করা যায়। এদের কুশলী মতলব সফল হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে। এটাই হল পিটার্সবুর্গের ৯ জানুয়ারির, রক্তাক্ত রবিবারের খতিয়ান।
সেনাবাহিনী দমন করেছে নিরস্ত্র শ্রমিক, মহিলা ও শিশুদের। অসহায় শ্রমিকদের গুলি করে সেনাবাহিনী শত্রুকে পরাভূত করেছে। জারের রাজনৈতিক বিশ্বস্ত পার্শ্বচরেরা এবং তাদের ইউরোপীয় পদলেহী মোসাহেবের দল, রক্ষণশীল বুর্জোয়ারা ব্যঙ্গ করে বলছে, ‘আমরা ওদের একটা উচিত শিক্ষা দিয়েছি’!
হ্যাঁ, সত্যিই এটা একটা খুবই বড় শিক্ষা। এ শিক্ষাটা রুশ প্রলেতারিয়েত ভুলবে না। শ্রমিক শ্রেণির সবচাইতে অশিক্ষিত, সবচাইতে পিছিয়ে পড়া স্তরগুলি, যারা সরল ভাবে জারকে বিশ্বাস করেছিল এবং একটা যন্ত্রণাক্লিষ্ট জাতির প্রার্থনাকে ‘স্বয়ং জারের’ সামনে শান্তিপূর্ণ ভাবে পেশ করবার আন্তরিক ইচ্ছা পোষণ করেছিল, তারা সকলেই জার এবং জারের পিতৃব্য গ্র্যান্ড ডিউক ভ্লাদিমির পরিচালিত সেনাবাহিনীর কাছে একটা শিক্ষা পেল।
গৃহযুদ্ধ থেকে শ্রমিক শ্রেণি একটা বিশাল শিক্ষা পেল। মাসের পর মাস, বছরের পর বছরের একঘেয়েমির জীবনে, প্রতি দিনের হতচেতন অস্তিত্বে তারা বিপ্লবী শিক্ষায় যত দূর শিক্ষিত হতে পারত, এই এক দিনেই প্রলেতারিয়েত এগিয়ে গেল তার চাইতে অনেক বেশি। পিটার্সবুর্গের বীর প্রলেতারিয়েতদের স্লোগান ‘মুক্তি অথবা মৃত্যু’ সমগ্র রাশিয়া জুড়ে প্রতিধবনিত হচ্ছে। ঘটনাগুলি চমৎকার ভাবে বিকশিত হয়ে এগিয়ে চলেছে। পিটার্সবুর্গ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে সাধারণ ধর্মঘট। সমস্ত শিল্প-কারখানা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন পঙ্গু হয়ে পড়েছে। ১০ জানুয়ারি, সোমবার শ্রমিকদল এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে মুখোমুখি লড়াই আরও দুর্দান্ত হয়ে উঠেছিল। সরকারি মিথ্যা বিবৃতিগুলোর বিপরীতে রাজধানীর বিভিন্ন অংশে সংগ্রামের রক্ত ঝরেছে। কলপিনো শ্রমিকেরা জেগে উঠেছে। শ্রমিকরা নিজেদের এবং জনসাধারণকে সশস্ত্র করে তুলেছে। গুজব ছড়িয়ে পড়ছে যে, শ্রমিকরা সেস্ত্রোরেৎস্ক অস্ত্রাগার দখল করেছে। শ্রমিকরা রিভলবার জোগাড় করছে নিজেদের জন্য, তারা ছোটখাটো যন্ত্রপাতি থেকে তৈরি করছে অস্ত্র। মুক্তির লড়াইয়ের জন্য তারা বেপরোয়া, সংগ্রহ করছে বোমা। প্রদেশ থেকে প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ছে সাধারণ ধর্মঘট। ইতিমধ্যে মস্কোতে ১০,০০০ শ্রমিক কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। আগামীকাল মস্কোতে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হতে যাচ্ছে। সমগ্র রিগা জুড়ে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছে। লোদজ-এর শ্রমিকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে, একটা বিদ্রোহের প্রস্তুতি চলছে ওয়ারশতে, হেলসিঙ্গফরসে সংগঠিত হচ্ছে শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ। বাকু, ওডেসা, কিয়েভ, খারকভ, কোভনো এবং ভিলনোতে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে এবং ছড়িয়ে পড়ছে ধর্মঘট। সেবাস্তোপোলে নৌসেনা দপ্তরের গুদাম এবং অস্ত্রাগারগুলি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে সেনাবাহিনী বিদ্রোহী নাবিকদের উপর গুলি চালাতে অস্বীকার করেছে। সারাতভ ও র্যাভেলে ধর্মঘট চলছে। র্যাদমে সংরক্ষিত সেনাবাহিনীর যে অংশটাকে তলব করা হয়েছিল, তার সাথে শ্রমিকদের একটা সম্মুখ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যেই কাঁপতে শুরু করেছে সরকার। রক্তাক্ত নির্মম নিপীড়নের নীতি থেকে সরকার অর্থনৈতিক ছাড় দেওয়ার দিকে সরে আসছে এবং নিজেকে বাঁচাতে দিনে নয় ঘণ্টা কাজের সময় বেঁধে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির মধ্যে দিয়ে সরকার ঘুষ ছুড়ে দিতে চাইছে। কিন্তু রক্তাক্ত রবিবারের শিক্ষাটা কোনও মতেই ভুলে গেলে চলবে না।
সর্বজনীন, প্রত্যক্ষ, সমানাধিকার ও গোপন ব্যালটে ভোটগ্রহণের ভিত্তিতে অবিলম্বে সংবিধান পরিষদ নির্বাচন আহ্বান করুক– পিটার্সবুর্গের শ্রমিকদের এই দাবিটা অবশ্যই সমস্ত ধর্মঘটী শ্রমিকদের দাবি হওয়া উচিত। অবিলম্বে সরকারকে উৎখাত করো– ৯ জানুয়ারির গণহত্যার উত্তরে এই রকম স্লোগানই উঠেছিল। এমনকি পিটার্সবুর্গের সেই সমস্ত শ্রমিকরাও, যারা জারের উপর বিশ্বাস রেখেছিল, তারা তাদের নেতা জর্জ গ্যাপনের মাধ্যমে এই স্লোগান তুলেছিল, যিনি ওই রক্তাক্ত ঘটনার পরে বলেছিলেন ঃ ‘আমাদের আর কোনও জারের দরকার নেই। একটা রক্তের নদী জার থেকে দেশকে আলাদা করে দিয়েছে। মুক্তির সংগ্রাম দীর্ঘজীবী হোক’!
২৫ জানুয়ারি ১৯০৫, জেনেভা