
কয়েক মাস পরেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। এরই মধ্যে কলকাতায় সদ্য অনুষ্ঠিত ‘ব্যবসা ও শিল্প সম্মেলন ২০২৫’-এর মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন গত ১৪ বছরে রাজ্যে নাকি ২ কোটি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, ৪০ শতাংশ বেকারত্ব কমানো গেছে। শুনে রাজ্যের মানুষ রীতিমতো বিস্মিত। এত কর্মসংস্থান যদি তৈরি হয়, বেকারত্ব কমে, তবে হাজার হাজার যুবকদের কেন পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভিন রাজ্যে বা ভিন দেশে পাড়ি দিতে হচ্ছে? এই যে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা শোনা গেল মঞ্চ থেকে, নতুন কোন কোন শিল্প-কল-কারখানা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হল তাতে? আগের বছর কিংবা তারও আগের বছর শিল্প-বাণিজ্য সম্মেলনে মুকেশ আম্বানি, গৌতম আদানি, সঞ্জীব গোয়েঙ্কা থেকে শুরু করে দেশের তাবড় শিল্পগোষ্ঠীর কর্ণধারদের থেকে পাওয়া শিল্প প্রতিশ্রুতিগুলির কী হয়েছে? তাজপুরের বন্দর, শালবনির ইস্পাত কিংবা রঙ ইত্যাদির কারখানা, একাধিক শিল্প-বাণিজ্য হাব, পোশাক হাব– কী হল সেগুলির? এ সব মিলিয়ে কত কর্মসংস্থান হয়েছে? এই সমস্ত প্রশ্ন জনমনে উঠছে। কোথায় তার উত্তর?
এ বারে দেখা গেল, পুঁজিপতিরা বিনিয়োগ করতে চেয়েছেন মূলত স্কুল-হাসপাতাল-রিয়েল এস্টেট-হোটেল এই সব ক্ষেত্রগুলিতে। এগুলির কোনওটিই উৎপাদন শিল্প নয়। কর্মসংস্থানের পক্ষেও খুব উপযুক্ত নয়। শিল্পোদ্যোগের ক্ষেত্রে যে সব প্রকল্পের ঘোষণা হয়েছে তার তিন-চারটি ছাড়া বাকি সবগুলিই আগের কোনও না কোনও সময়ের ঘোষিত প্রকল্প। তা হলে নতুন করে এই সম্মেলন কোন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করল রাজ্যে? এতই যদি কর্মসংস্থান তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনে হয়ে থাকে, তবে মুখ্যমন্ত্রীকে কেন মুড়ি-ঘুগনি-চা-বিস্কুট বিক্রির পরামর্শ দিতে হল মঞ্চে দাঁড়িয়ে?
এই সুযোগে বিজেপি দাবি করছে, তাদের সরকার যে সব রাজ্যে আছে সেখানে নাকি উন্নয়নের ঝোড়ো হাওয়া প্রবল গতিতে বয়ে চলেছে। কিন্তু বিজেপি কি লোকসভা নির্বাচনের সময় বলেছিল যে, তাদের পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার কেবলমাত্র বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলো নিয়েই চলবে? অন্য দলের সরকার রাজ্যে থাকলে তার ভালমন্দের দায় কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর বর্তাবে না? গোটা ভারতের বেকারত্ব, অনুন্নয়ন, শিল্প গড়া বা বন্ধ হওয়া এর দায় কেন্দ্রীয় সরকার অস্বীকার করে কী করে? তাদের শাসনে সারা ভারতে কেমন শিল্পায়ন, কেমন কর্মসংস্থান হচ্ছে?
এ বার একটা পরিসংখ্যান দেখা যাক সংসদে দাঁড়িয়ে স্বয়ং কেন্দ্রীয় শিল্পমন্ত্রী শোভা করণডালজে এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন– ২০২০-২০২৫ এই পাঁচ বছরে বন্ধ হয়েছে সারা ভারতে লক্ষাধিক ছোট ও মাঝারি কারখানা। এর মধ্যে মহারাষ্ট্রে বন্ধ হয়েছে ২৯ হাজার, রাজস্থানে ৯ হাজার, উত্তরপ্রদেশে ৬ হাজার, গুজরাটে ১০ হাজার, মধ্যপ্রদেশে ৫ হাজার, তামিলনাড়ুতে ১৪ হাজার, কর্ণাটকে ৬ হাজার, তেলেঙ্গানায় ৪ হাজার, পশ্চিমবঙ্গে ৪ হাজার ৭০০-র মতো। যাঁরা ভোট এলেই বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকারের জয়ঢাক বাজান, তাঁরা এই পরিসংখ্যান সম্পর্কে কী বলবেন? কেন বিজেপি শাসনে লক্ষাধিক কল-কারখানা বন্ধ হল? বিরোধী দল শাসিত রাজ্যে যদি সেই রাজ্য সরকারের অপদার্থতায় কারখানা বন্ধ হয়ে থাকে, বিজেপি শাসিত অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী কথিত ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের রাজ্যে হাল এমন কেন? কেন মুখ্যমন্ত্রীর চপ-ঘুগনির দোকানে কর্মসংস্থানের মতো প্রধানমন্ত্রীকে পকোড়া ভেজে বেকারদের কর্মসংস্থানের নিদান দিতে হয়?
আজ এটাই বাস্তব যে, দেশে একটা বড় অংশের মানুষের হাতে কাজ নেই, অর্থ নেই। তা হলে এত যে ‘উন্নয়ন-উন্নয়ন’ চিৎকার দেশ জুড়ে চলছে সে কার উন্নয়ন! কিসের উন্নয়ন! এ কথা ঠিক, খুব মুষ্টিমেয় হলেও দেশের একটা অংশের মানুষের উন্নয়ন ঘটেছে। যারা হাজার হাজার কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে শিক্ষা খাতে-স্বাস্থ্য খাতে, রিয়েল এস্টেটে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর শিল্পে। তাদের মুনাফার অন্ত নেই, কিন্তু তাতে না হচ্ছে শিল্পায়ন –না হচ্ছে কর্মসংস্থান। অথচ পুঁজিপতিদের বিনিয়োগের বিরাট ফিরিস্তি বছর বছর মুখ্যমন্ত্রী দেন, প্রধানমন্ত্রী কখনও ভাইব্র্যান্ট গুজরাট সম্মেলন কখনও রোজগার মেলা করেন। রাজ্যে রাজ্যে যে দলেরই সরকার থাকুক না কেন, তারা ‘শিল্প বান্ধব পরিবেশ’, ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’ অর্থাৎ ব্যবসা করার ব্যবস্থাপনার সরলীকরণ ইত্যাদি অনেক কথা বলে। শিল্প হবে বলে পুঁজিপতিদের এক টাকায় হাজার হাজার একর জমি, বিনাপয়সায় বিদ্যুৎ, জল, কর ছাড়ের ব্যবস্থা ইত্যাদি নানা সুবিধা দেয়। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার আবার শিল্পবান্ধব হওয়ার তাগিদে দেশে শ্রম আইন বদলে দিয়ে মালিকদের হাতে যথেচ্ছ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের অধিকার দিয়ে দিয়েছে। কোনও কোনও রাজ্য সরকার তো শ্রমিকদের জন্য আবশ্যিকভাবে ১২ ঘণ্টা ডিউটির আইনও চালু করছে। কিন্তু এত কিছু করেও দেখা যাচ্ছে, একটা শিল্প চালু হতে না হতে দশটা কারখানায় লালবাতি জ্বলে থাকে।
যে দল যখন বিরোধী আসনে থাকে তারা দাবি করে পরের ভোটে আমাদের সরকারি গদিতে বসাও, শিল্প ধরে আনব। এমনকি নানা সময় সরকার চালানো বামপন্থী বলে পরিচিত দলগুলোও দাবি করে, চাষিকে উচ্ছেদ করে টাটাদের মতো শিল্পপতিদের হাতে বিনা পয়সায় হাজার হাজার একর জমি, বিনা পয়সার বিদ্যুৎ-জল ইত্যাদি তুলে দিলেই শিল্পায়নের জোয়ার আসবে। কিন্তু যেটা বলে না– সেই টাটাকে এর থেকে আরও অনেক বেশি সুবিধা দেওয়া সত্ত্বেও ন্যানো গাড়ির উৎপাদন তারা বন্ধ করে দিয়েছে কেন? অর্থনীতির নিয়ম বলে, বাজারে চাহিদা না থাকলে হাজার প্রতিশ্রুতিতেও শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এই চাহিদা হল জনগণের ক্রয়ক্ষমতা। বাস্তবে আজ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার তীব্র শোষণে সমাজের বেশির ভাগ অংশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে পৌঁছেছে। মানুষের প্রয়োজন থাকলেও হাতে প্রয়োজনীয় জিনিস কোনার টাকা নেই। তাই কলকারখানায় উৎপাদিত পণ্যের বিক্রি নেই।
এ দিকে পুঁজিপতিদের চাহিদা অনুযায়ী সুপার প্রফিট রক্ষা করতে গিয়ে চলছে শ্রমিক ছাঁটাই, বেতন হ্রাস, শ্রম-সময় বৃদ্ধি ইত্যাদি নানা অমানবিক পদক্ষেপ। পুঁজিপতি শ্রেণির সেবাদাস সরকারগুলি সংসদে, বিধানসভায় আইন করে মালিকদের সেই অধিকার দিচ্ছে। আর এ সব করতে গিয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমছে। শিল্প বন্ধ হওয়ার মুখ্য কারণ এটাই। তারা আরও বলে না, আজকের দিনে বিনিয়োগের সাথে মানুষের কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদনের সম্পর্ক খুবই কম। কলকারখানায় উৎপাদিত দ্রব্যের বাজার নেই বলে বৃহৎ পুঁজিপতিরা বিনিয়োগ করে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিমা, পর্যটন, হোটেলের মতো পরিষেবা, শেয়ার বাজারের ফাটকায়, আবাসন-রিয়েলটিতে এবং রাস্তা-ঘাট-ব্রিজ নির্মাণের মতো পরিকাঠামো ক্ষেত্রে। যতটুকু কারখানা কিংবা পরিকাঠামো নির্মাণে পুঁজি খাটে সেখানেও উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করতে পুঁজিপতিরা শ্রমিকের সংখ্যা কমায়। উন্নত প্রযুক্তি আনে। ফলে বিনিয়োগ হয়, মানুষের কাজ জোটে না, বাজারে চাহিদা বাড়ে না। এই পরিস্থিতির মধ্যে শিল্প-কলকারখানা গড়তে গেলে দরকার সমাজের অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া। তার জন্য বাড়াতে হয় শ্রমনিবিড় শিল্প, বাড়াতে হয় শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি। এতে পুঁজিপতিদের লাভের অংশে সামান্য টান পড়লেও শ্রমজীবী মানুষের কেনার ক্ষমতা বাড়বে। এর সাথে দরকার সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে উন্নত মানের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সস্তায় পরিবহণ ও আবাসন, বিদ্যুতের দাম কমানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা।
কিন্তু শিল্পদ্রব্যের চাহিদা বাড়ানোর জন্য সাধারণ মানুষের এই সুবিধার ব্যবস্থা করতে গেলে পুঁজিপতিদের সর্বোচ্চ মুনাফা করার চেষ্টায় বাধা পড়ে। পুঁজিপতি শ্রেণির সর্বোচ্চ মুনাফার জন্য একমাত্র রাস্তা হল শ্রমিকের মজুরি চুরি করা। এই সত্যটা আড়াল করেই শাসকদলগুলো শিল্প সম্মেলনে গালভরা প্রতিশ্রুতির চমক দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দিতে চায়।
পুঁজিপতি শ্রেণির রাজনৈতিক ম্যানেজার হিসাবে প্রভুদের মুনাফা দেখাই সরকারি দলগুলোর কাজ। এই কাজটাই তারা করে চলে কখনও শিল্প সম্মেলনের আড়ালে, কখনও মানুষের কর্মসংস্থানের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে।