
এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর রাজ্য সম্পাদক চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য ১০ এপ্রিল এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, এ বারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন এক বেনজির আবহে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। এক দিকে, তৃণমূল শাসিত রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে জনমানসে প্রবল ক্ষোভ। অন্য দিকে, তার সুযোগ নিয়ে কেন্দে্রর শাসক দল বিজেপির আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন জনসাধারণের রক্ত জল করা ট্যাক্সের টাকায় লালিত-পালিত হয়েও জনসাধারণের বিরুদ্ধেই যেন এক নাগাড়ে যুদ্ধ করে চলেছে। স্বৈরাচার ছাড়া আর কোন নামে একে অভিহিত করা যায়? প্রথমে ৫৮ লক্ষাধিক, পরে আরও ৫ লক্ষাধিক, তারপরে ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্রেন্সি’-র নামে ২৭ লক্ষাধিক মানুষের নাম বাতিল করেছে। বাতিল হওয়া মানুষকে বলা হচ্ছে ট্রাইবুনালে যেতে। কিন্তু কোথায় সে ট্রাইবুনাল, কবে তার কাজ শেষ হবে। কোনও কিছু নিশ্চিত নয়। ফলে, এই বিরাট সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার থাকছে না। আশ্চর্যের কথা, তালিকা থেকে বাদ দেওয়া মানুষকে বলা হচ্ছে, এ বারে না থাকলেও পরে ভোটাধিকার থাকতে পারে। এ কি কোনও গণতান্ত্রিক আচরণ?
এসআইআর প্রক্রিয়ায় একের পর এক ফতোয়া জারি করে নাগরিকদের যে ভাবে হয়রানি করা হয়েছে, তা কোনও সভ্য সমাজে চলতে পারে না। এই প্রক্রিয়ায় বিএলও সহ দ্বিশতাধিক মানুষের মৃত্যুর জন্য নির্বাচন কমিশন হত্যাকারীর কাঠগড়ায়। আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছি, এসআইআর-এর এই প্রক্রিয়া নাগরিকত্বের উপর আক্রমণ, ঘুরপথে এনআরসি চালু করার ষড়যন্ত্র। এর বিভীষিকাময় পরিণাম আসামের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছেন। ইতিমধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া শেষ হয়েছে। ভোটার তালিকা ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। বাতিল করা মানুষের মধ্যে বেশিরভাগ সংখ্যালঘু, চা বাগান সহ-দরিদ্র শ্রমিক, কৃষক, মতুয়া, মহিলা, জনজাতি আদিবাসী গোষ্ঠী।
নির্বাচনের দিন ঘোষণার সময় ‘একজনও বৈধ ভোটারকে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে না’ বলে নির্বাচন কমিশন যে ঘোষণা করেছিল, আজ তা চূড়ান্ত প্রহসনে পর্যবসিত। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি, প্রখ্যাত আইনজীবীরাও এর প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু বিজেপির লেজুড় হওয়ার ফলে নির্বাচন কমিশন গণতন্ত্রের কোনও তোয়াক্কাই করছে না। তাই আমাদের সুস্পষ্ট দাবি, ২০২৫ সালের তালিকায় যারা এনুমারেশন ফর্ম পূরণ করেছেন তাদের সকলকেই ভোট দেওয়ার অধিকার দিতে হবে।
মানুষের জীবনের জ্বালা যন্ত্রণা জীবিকার প্রশ্নকে পিছনে ফেলে দিয়েছে বিজেপির প্রধান স্লোগান অনুপ্রবেশ। যে বিপুল সংখ্যক মানুষ তালিকা থেকে বাদ পড়লেন, তাঁরা সকলেই কি অনুপ্রবেশকারী? তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রাক্তন বিচারপতি, নন্দলাল বসুর নাতি, প্রাক্তন সাংসদ সহ নানা পদাধিকারী এবং এমনকি নির্বাচনের কাজে নিযুক্ত বহু ব্যক্তির নাম বাদ গেছে। তাঁরা সবাই অনুপ্রবেশকারী? এস আই আর-এর মাধ্যমে কোথায় কত অনুপ্রবেশকারী পাওয়া গেছে, বিজেপি বা নির্বাচন কমিশন কি তা বলতে পারছে? কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সহ অন্য বিজেপি নেতাদের দেওয়া পরিসংখ্যান মিলছে না। অথচ ভোটের প্রচারে মিথ্যা পরিসংখ্যান আউড়ে তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ সৃষ্টি করে উগ্র ধর্মীয় উন্মাদনার মাধ্যমে যে ভাবেই হোক ভোট পাওয়ার নেশায় মত্ত বিজেপি।
তৃণমূল কংগ্রেসও বিজেপির সঙ্গে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও ধর্ম নিয়ে রাজনীতির মধ্যেই তারা জনগণের দৃষ্টি আটকে রাখতে চাইছে। রাজ্যে বাবরি মসজিদ, জগন্নাথ ধাম, দুর্গা অঙ্গন তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে। তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি জনগণের মূল সমস্যাগুলির সমাধানের কোনও কথা না বলে দান-খয়রাতির প্রতিশ্রুতি ও পাল্টা প্রতিশ্রুতির এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা থাকুক আর না থাকুক, এ ক্ষেত্রে কংগ্রেসও পিছিয়ে নেই। দুঃখজনক ভাবে, গণআন্দোলনের পথ পরিত্যাগ করে সিপিআই(এম)-ও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি বিতরণ করছে। অবশ্য বছরের পর বছর ধরে পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে এইসব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ফলাফল কী হতে পারে তা জনগণ ভালভাবেই জানে। এগুলি যে ‘জুমলা’ বা কথার কথা, তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন। তারই সাথে এ বারের নির্বাচনে এই সব দলের প্রার্থীরা সস্তা জনপ্রিয়তা আদায়ের জন্য প্রচারের সময় এমন সব কাজ করে ভোট পাওয়ার চেষ্টা করছেন যা রাজনীতির মর্যাদাকে ধূলায় মিশিয়ে দিচ্ছে।
তৃণমূল শাসিত এ রাজ্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা সহ সর্বস্তরে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ। আর, বিজেপি গোটা দেশে এবং তাদের শাসিত রাজ্যে একই ভাবে দুর্নীতির পাঁকে নিমজ্জিত। এ রাজ্যে কাজ না পেয়ে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে যুবকরা। গিগ কর্মীদের অসহনীয় অবস্থা। বেকারি এ রাজ্যে যেমন, তেমনি এ দেশেও রেকর্ড ছুঁয়েছে। ইউক্রেনের যুদ্ধে কামানের গোলার মুখে যুবকদের তুলে দিয়েছিল বিজেপি সরকার। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতীয়দের হাতে পায়ে শেকল পরিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়েছিল, তবু ট্রাম্প নরেন্দ্র মোদির বন্ধু। ইজরায়েলের যে প্রধানমন্ত্রী প্যালেস্টাইনে, ইরানে গণহারে শিশু-নারী-বৃদ্ধদের হত্যা করছে, তার সাথে প্রধানমন্ত্রীর কোলাকুলি ভারতবাসীর লজ্জা। আমেরিকার সাথে বাণিজ্যিক চুক্তির ফলে কৃষিজাত দ্রব্য, খাদ্যশস্য, দুধ, দুগ্ধজাত দ্রব্যের বাজার দখল করবে আমেরিকা। কৃষকদের অবস্থা আরও দুর্বিষহ হবে। বর্তমানে এ দেশে প্রতিদিন ৪৮ জন কৃষক আত্মহত্যা করেন। তৃণমূলের শাসনে নারী নির্যাতন দিনের পর দিন বাড়ছে। আর বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি নারী নির্যাতনে শীর্ষে। আদানি-আম্বানিদের সম্পদ বাড়ছে। পরিবেশ ধ্বংস করে বনাঞ্চল, খনিজ সম্পদ তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে বিজেপি। আসলে, এই দলগুলি যে যখন যেখানে ক্ষমতায়, সেখানে তারা অপশাসনের প্রতিমূর্তি। এদের মধ্যেই এক দলের বদলে অন্য দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য মানুষকে নানা প্রচারে বিভ্রান্ত করে দেওয়া হচ্ছে।
দুঃখজনক হলেও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, গণআন্দোলন গড়ে তোলার পরিবর্তে শুধুমাত্র কিছু আসন বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০১৬ সাল থেকে সিপিআই(এম) দল প্রথমে কংগ্রেসের সাথে জোট করেছে, ২০২১ সালে আইএসএফ নামক মৌলবাদী শক্তির সঙ্গেও হাত মিলিয়েছে। এ বছরের নির্বাচনে কংগ্রেস চায়নি বলে ঐক্য হয়নি– কিন্তু আই এস এফ-এর সঙ্গে ঐক্য করেছে। প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে রাজ্যের সর্বত্র ‘আগে রাম পরে বাম’ আওয়াজ তুলে তাদের ভোট বিজেপির ঝুলিতে তুলে দিয়ে বিজেপির শক্তিবৃদ্ধিতে সাহায্য করেছে। তার ফলে শুধু ভোটটুকুই যায়নি, তাদের কর্মী-সমর্থকদের একটি বিরাট অংশও বিজেপির পক্ষে চলে গিয়েছে। বামপন্থী মানুষ তাঁদের এই আচরণে খুবই মর্মাহত ও বিভ্রান্ত।
এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) সংগ্রামী বামপন্থার পথে চলছে এবং এটাই জনগণের সামনে প্রকৃত বিকল্প। নির্বাচনী সংগ্রামে এস ইউ সি আই (সি)-র গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য, বিজেপির মতো যে স্বৈরাচারী শক্তি গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর আঘাত হেনে চলছে তার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই করা, নির্বাচনে পরাস্ত করা। আবার বিজেপির বিরোধিতার সঙ্গে সঙ্গেই চরম ও সর্বব্যাপক দুর্নীতিগ্রস্ত, স্বজনপোষণকারী, নারী সহ নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং শোষিত মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় ব্যর্থ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসকেও পরাস্ত করা। নির্বাচনী রাজনৈতিক লড়াইয়েও আমরা গণআন্দোলনের প্রকৃত বিকল্প পথকেই তুলে ধরছি এবং এ পথেই আমরা থাকব। অতীতে বিধানসভার অভ্যন্তরে যেমন করে কমরেডস সুবোধ ব্যানার্জী, প্রতিভা মুখার্জী, হরিপদ বাউড়ি, রবীন মণ্ডল, দেবপ্রসাদ সরকার, প্রবোধ পুরকায়েত, বিজয় বাউড়িরা এবং পরবর্তীকালে তরুণকান্তি নস্কররা এবং লোকসভায় তরুণ মণ্ডল নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদের ভেতরে ও বাইরে প্রতিবাদের কণ্ঠকে উচ্চে তুলে ধরেছিলেন, এস ইউ সি আই (সি) প্রার্থীরা জয়ী হলে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন, এটাই আমাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি।