কথায় আছে লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন। কিন্তু কে বা কারা সেই গৌরী সেন, যাঁরা প্রায় প্রতি বছর ভোটের খরচ যোগান দিচ্ছেন? ২০২২-এ পশ্চিমবঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে পৌরসভা নির্বাচন, ২০২৩-এ পঞ্চায়েত, ২০২৪-এ লোকসভা, ২০২৬-এ হতে চলেছে বিধানসভার ভোট। বলা হয় এগুলি ‘গণতন্ত্রের মহোৎসব’। কিন্তু এই মহোৎসবগুলির বিপুল খরচ জোগাচ্ছে কারা? নির্বাচন কমিশন, যারা গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনা করে, তাদের নিজস্ব আয়ের কোনও সংস্থান নেই। এই খরচ বহন করে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার। নিয়ম অনুযায়ী কোনও রাজ্যে বিধানসভা ভোট হলে যে মোট খরচ হয় তার ৩০ শতাংশ কেন্দ্র এবং ৭০ শতাংশ সেই রাজ্যের সরকার বহন করে। আবার লোকসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার ৭০ শতাংশ এবং রাজ্য সরকারগুলি ৩০ শতাংশ ব্যয়ভার বহন করে থাকে। অর্থাৎ জনসাধারণের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি সরকারি কোষাগারই গণতন্ত্রের মহোৎসবের ভিত্তি। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের মোট খরচ হয়েছিল ১০০০ কোটি টাকার কিছু বেশি। ২০২৪ লোকসভার নির্বাচনে এ রাজ্যে খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১৬০০ কোটি টাকা। এ বারের বিধানসভা নির্বাচনের খরচ নির্বাচন কমিশন ধার্য করেছে দু’হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্বাচনের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫ শতাংশ। আশঙ্কা শেষ পর্যন্ত তা আরও বাড়তে পারে। নির্বাচন কমিশনই এসআইআর প্রক্রিয়ায় মোট খরচ ধার্য করেছিল সাড়ে চারশো কোটি টাকা, যা ইতিমধ্যেই ৫০০ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ার কিছু সাধারণ খরচ যেমন ল্যাপটপ ভাড়া নেওয়া, অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার পাশাপাশি এই প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত ২৬ জন রোল অবজারভার, আট হাজার মাইক্রো অবজারভার, ৭০০ জন বিচারপতির জন্য মোটা অঙ্কের সাম্মানিক, তাঁদের বিলাসবহুল থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ইত্যাদি করতেই খরচের বহর আরও বাড়ছে। এঁদের জন্য এর বাইরেও যে সব খাতে খরচ বাড়ছে জানলে ভিরমি খেতে হয়।
কোনও কোনও পর্যবেক্ষক নিজেদের জুতো পালিশ থেকে হজমিগুলি, ব্যক্তিগত ক্ষুদ্রতম প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জন্যও বিল ধরিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি নিজের চেম্বারে ছোট ফ্রিজ কিনে দেওয়ার জন্য আবদার এসেছে। তাই খরচের শেষ অংকটা কোথায় গিয়ে যে থামবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সরকারি তহবিল থেকে দেদার অর্থ খরচ করে যাচ্ছেন যাঁরা, তাঁরা একবারও ভাবছেন না, যে মানুষ এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিচারাধীন তালিকায় চলে গেলেন, যাঁর ভোটাধিকার শেষ পর্যন্ত থাকবে কি না এ প্রশ্নের মীমাংসা এখনও হল না, যাঁরা এই প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত হয়রানির শিকার হলেন, প্রাণ হারালেন, হয়ত যাঁদের ভোটাধিকার শেষ পর্যন্ত থাকবেও না, তাঁদেরও কষ্টার্জিত অর্থ এসআইআর এবং নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত হয়েছে। তা এ ভাবে খরচ করা চলে না।
এমন বিপুল ব্যয়ে যে নির্বাচন-মহোৎসব সংগঠিত হচ্ছে জনসাধারণের জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলির উপর তা কি কোনও প্রভাব ফেলছে? মানুষের জীবন-যাপনের কিছুমাত্র উন্নতি ঘটেছে না কি এক একটি নির্বাচন গেলে তা আরও দুর্বিষহ হচ্ছে? নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে সরকারগুলি দরাজহস্ত, তারাই জনসাধারণের মৌলিক প্রয়োজনগুলি মেটানোর ক্ষেত্রে বজ্রমুষ্টি। শিক্ষাখাতে স্বাস্থ্যখাতে কৃষিক্ষেত্রে শিল্পস্থাপনে বরাদ্দ বাড়ছে না। ২০২৬-২৭ বর্ষে পেশ করা রাজ্য স্বাস্থ্য বাজেটে জিডিপির মাত্র ৬.৯ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছে, যা অন্তত ১০ শতাংশ করা দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এবং ২০১৭ জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে তার সুপারিশও ছিল।
২০২৬-২৭ এর অন্তর্বর্তী শিক্ষা বাজেটেও উল্লেখযোগ্য কোনও বৃদ্ধি ঘটেনি, যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। রাজ্যে শিশুমৃত্যুর হার বাড়ছে। মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ মাশুল বৃদ্ধি, গ্যাসের সংকট এবং দাম বৃদ্ধি, বেকার সমস্যা, শ্রমিক ছাঁটাই– সমস্ত ক্ষেত্রেই ব্যাপক দুর্নীতি সব দিক দিয়ে জনসাধারণের উপর পড়ছে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। অর্থাৎ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদলের দ্বারা মানুষের দুরবস্থার কোনও পরিবর্তন ঘটছে না। শুধু কিছু প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি খয়রাতিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করছে সরকার। জীবন যন্ত্রণায় বিদ্ধ সাধারণ মানুষকে সামান্য কিছু অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে শুধুমাত্র নির্বাচনের গণ্ডির মধ্যেই তাদের আটকে ফেলার রাজনীতি চলছে। কেবল এ রাজ্যে নয়, মহারাষ্ট্র-মধ্যপ্রদেশ-তামিলনাড়ু-কর্ণাটক-তেলেঙ্গানা ইত্যাদি রাজ্যগুলিতেও নানা নামে একই ধরনের প্রকল্প চালু করা হয়েছে।
দলের নাম যা-ই হোক, ভোটসর্বস্ব দলগুলি ভোটের দিকে তাকিয়ে কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তা জনজীবনের দুর্দশাকে স্পর্শও করতে পারছে না। এক দিকে জনগণের সমস্ত অধিকার হরণ করা হচ্ছে, অন্য দিকে জনসাধারণ যাতে এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে ব্যাপক বিক্ষোভে ফেটে না পড়তে পারে সে কারণে মহা আড়ম্বরে বিপুল ব্যয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘গণতন্ত্রের মহোৎসব’। অর্থাৎ ভোটাধিকারকে দেশবাসীর কার্যত একমাত্র অধিকার হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে। বাস্তবে মানুষের সমস্ত দুর্দশার মূলে যে শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটি তাকে না বদলে, শুধু সরকার বদলে মানুষের দুর্দশার বদল ঘটবে না। তাই ভোটে একটি দলের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে প্রশমিত করতে আর একটি দলকে সামনে আনা হচ্ছে। সুদিনের আশায়, পান্তার সাথে সামান্য নুনের বন্দোবস্ত করতে সাধারণ মানুষ প্রতিবার কষ্ট করে হলেও ভোটের লাইনে গিয়ে দাঁড়ান, তাতে কখনও সরকার হয়ত বদলাচ্ছে, মানুষের দুরবস্থার বদল ঘটছে না। নির্বাচনে গণতন্ত্রের ঠাটবাট রক্ষিত হয় ঠিকই, এর বিপুল ব্যয়ভার বহন করেন যে গৌরী সেনরা, তাঁরা সেই অন্ধকারেই থেকে যান।