
২০ বছর চাকরি-জীবন কাটানোর পর কাউকে যদি ‘বেকার’ ঘোষণা করা হয়, তার অনুভূতিটা ঠিক কী রকম হবে? বছরের পর বছর দক্ষতার সাথে চাকরি করে স্বচ্ছন্দে সংসার প্রতিপালন করে যে কর্মীটি হঠাৎ একটি ই-মেলে জানতে পারলেন, তার কাজটি আর নেই, পরের দিন থেকে তাকে আর চাকরি ক্ষেত্রে যেতে হবে না, দুঃখে-আত্মগ্লানিতে সে যদি পাগল হয়ে যায়, সে যদি আত্মহত্যা করে বসে, তখন সংবাদপত্রের এক কোণে হয়তো সেই খবর জায়গা পাবে। ভোটের বাজারে তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখানোর প্রতিযোগিতাও চলবে হয়ত শাসক দলগুলির মধ্যে। কিন্তু বাস্তবেই এরকম অসংখ্য ছাঁটাইয়ের ঘটনা আজ বহু সংসারকে ছারখার করে দিচ্ছে। ছারখার করে দিচ্ছে সন্তানকে উচ্চশিক্ষা দিয়ে বড় করে তোলার স্বপ্ন, চিকিৎসার খরচ জুগিয়ে বাবা-মাকে একটু স্বস্তিকে রাখতে পারার স্বপ্ন।
‘২০ বছরের বেশি চাকরি করার পর ১ এপ্রিল ভোরে ই-মেলে জানতে পারলাম, আমার চাকরি নেই’। বলেছেন সদ্য চাকরি হারানো মার্কিন বহুজাতিক সংস্থা ওরাকলের এক ভারতীয় কর্মী। এমন অসংখ্য কর্মী নতুন অর্থ বছরের শুরুতেই হৃদয়বিদারক এই খবরটি জানতে পেরেছেন। কোম্পানির কোনও আগাম ঘোষণা ছিল না, দেওয়া হয়নি কোনও নোটিসও। একটা মাউসের ক্লিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কয়েক হাজার কম¹র চাকরি চলে গেল। কর্মীরা হতভম্ব হয়ে হঠাৎই জানতে পারলেন যে তাঁদের চাকরি আর নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য পরিকাঠামো এবং ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগের কারণে খরচ কমাতে সংস্থার কিছু পদ লোপ করতে হচ্ছে বলে কোম্পানি কর্তাদের দাবি। গণহারে এই ছাঁটাইকে তারা সংস্কারের ‘এক ধাপ অগ্রগতি’ হিসাবেই দেখিয়েছেন। কিন্তু সংস্থার অগ্রগতি যে কর্মচারীদের জীবনে অন্ধকার নামিয়ে আনছে, তা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে শুধু একটি পরিসংখ্যানেই। ২০২৫-এর মে মাসে ওরাকলের আয় ছিল ১২.৪৪৩ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ১ লক্ষ ২৪ হাজার কোটি টাকা, আগের বছরের থেকে ১৮.৮৮ শতাংশ বেশি, সেই অতি লাভজনক সংস্থা এক লহমায় অসংখ্য কর্মীর ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিল। বিশ্বজুড়ে এই সংস্থা মোট ৩০ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে, এর মধ্যে ১২ হাজারই ভারতের। ছাঁটাইয়ের আশঙ্কায় দিন গুনছেন আরও বহু কর্মী।
ওরাকলের মতো বহু সংস্থাই ছাঁটাই করছে কর্মীদের। ২০২৫ সালে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা টিসিএস ঠিক এ ভাবেই ১২ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছিল। মার্কিন বহুজাতিক অ্যামাজন ছাঁটাই করেছিল ১০ হাজারের বেশি কর্মী। নীতি আয়োগের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০৩১-এর মধ্যে ভারতে তথ্যপ্রযুক্তিতে ২০ লক্ষ লোক কাজ হারাবে। ২০২৬ সালেই শুধু ৬৫ হাজার কর্মী ছাঁটাই হবে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে। ২০২৫-এর জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্রায় ১.১৭ মিলিয়ন চাকরি বাতিল হয়েছে, যা ২০২০-র করোনা অতিমারির ২.২ মিলিয়নের পর সর্বোচ্চ। (দ্য ওয়াল-৬ ডিসেম্বর,২০২৫) ‘সাইলেন্ট লে অফ’ বা স্বেচ্ছাকৃত পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে কর্মীদের। বেসরকারি ক্ষেত্র তো বটেই, সরকারি ক্ষেত্রেও কাজের নিরাপত্তা নেই। কারণ হিসাবে এ আই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা এবং অটোমেশনের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সেটাই কি কারণ?
পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় মুনাফাই যেহেতু একমাত্র লক্ষ্য, তাই প্রযুক্তির উন্নতি শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবনমানের কোনও উন্নয়ন ঘটায় না। বরং তা শোষণকে আরও তীব্র করে। উল্টেমালিক প্রযুক্তি ব্যবহারের নামে শ্রমিক ছাঁটাই করে ইচ্ছামতো। শ্রমিক-কর্মচারীদের উপর কাজের অতিরিক্ত বোঝা চাপায়। এ আই-ও তাই দক্ষ শ্রমিকদের জীবনে সুরাহা আনার বদলে তাদের ছেঁটে ফেলছে।
তাই আজ যে শ্রমিক-কর্মচারী তাঁর দক্ষতার জন্য মালিকের কাছে অপরিহার্য, তিনিই আগামীকাল নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পর বাতিল হয়ে যাবেন। তা হলে প্রযুক্তিই কি সর্বনাশা? না। যত দিন না উৎপাদনের উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের পরিবর্তে গোটা সমাজের তথা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে, তত দিন প্রযুক্তিও মালিকের স্বার্থই রক্ষা করবে। শ্রমিকদের শ্রম লাঘব বা তাদের কাজে সাহায্যের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে না। ফলে ছাঁটাইয়ের সংকট বাড়তেই থাকবে। তাই দরকার উৎপাদনের উদ্দেশ্যের দ্রুত বদল।