
ঘুসপেটিয়া বা অনুপ্রবেশকারী শব্দটি বিজেপি সরকারের নেতা-মন্ত্রী বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বড়ই প্রিয়। দেশের বুকে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে এই শব্দবন্ধটি তিনি বারবার উত্থাপন করে চলেছেন। এমনকি অতীতে এ কথাও বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় দু’কোটি মুসলিম অনুপ্রবেশকারী আছে। অমিত শাহের ঘোষণা, বিজেপির ‘মহৎ’ কাজ হল রাজ্য থেকে এই সব অনুপ্রবেশকারীদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সামনে তিনি আবার সেই পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটেছেন এবং বলেছেন, বিজেপি চায় বাংলাকে অনুপ্রবেশকারী মুক্ত করতে। ভেবেছেন, এতে মানুষের সমর্থন তাঁদের দিকে আসবে। ব্যালট বাক্স ভোটে পূর্ণ হয়ে যাবে।
খুব ভাল কথা। কেউ চায় না রাজ্যটা অনুপ্রবেশকারীতে ভরে যাক। সবাই চায় অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র দপ্তর এক এক করে প্রত্যেক অনুপ্রবেশকারী ধরুক, তাদের আদালতে বিচার করুক এবং তাদের সবাইকে নির্দিষ্ট দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুক। কিন্তু আমরা কী দেখছি? পুশ ব্যাক করার নামে তাঁরা বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী মানুষদের নির্বাচনে বাংলাদেশি বলে দেগে দিয়ে তাঁদের ধরে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন, আসামে বাংলাভাষীদের সীমান্ত এলাকার জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন। অসহনীয় নির্যাতন সহ্য করে বাংলাদেশের কোর্টে আবেদন করে তাঁরা যে ভারতীয় এটা প্রমাণ করে আবার তাঁদের দেশে ফিরতে হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর বিজেপির নেতৃত্বে হামলা চলছে এবং এমনকি দিল্লি এবং হরিয়ানায় বাঙালি কলোনির উপর বিজেপি সরকারের মদতে হামলা হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর যে মারাত্মক আক্রমণ চলছে সে কথা সবাই জানে। এই সব বাংলা ভাষাভাষী মানুষের উপর আক্রমণ চালিয়ে বিজেপি দেখাতে চায় দেশটা অনুপ্রবেশকারীতে ভরে গেছে– এটাই বিজেপির অ্যাজেন্ডা।
অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করার প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কতটা আন্তরিক, এ বার সেই আলোচনায় আসা যাক। গত ২০১৯ সালে অমিত শাহ হুঙ্কার ছেড়ে বলেছিলেন, বাংলায় দু’কোটি মুসলিম অনুপ্রবেশকারী আছে। কোথা থেকে এই হিসেব তিনি পেলেন, তা তিনিই বলতে পারবেন। ওঁরা সত্যের ধার ধারেন না, তথ্যসূত্র দেওয়ারও প্রয়োজনবোধ করেন না। মিথ্যা কথা বারবার বলেন, জোরের সাথে বলেন এবং এই ভাবে মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করতে চান। ঠিক যেমন ফ্যাসিস্ট জার্মানিতে হিটলারের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলস করেছিলেন।
বাংলাদেশে তখন আওয়ামি লিগের সরকার। ভারতের বিজেপি সরকারের সাথে তাদের খুবই দোস্তি। তারাও বিজেপি নেতাদের এত বড় মিথ্যা হজম করতে পারেননি। ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বললেন, ভারতে অবৈধ ভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা চেয়েছেন তাঁরা। ভারত সরকারের কাছ থেকে এই তালিকা পেলে তাঁরা ফিরিয়ে নেবেন নিজের দেশের নাগরিকদের। (এই সময়, ১৭.১২.২০১৯)
কিন্তু তালিকা কোথায়? তালিকা দেওয়া দূরস্থান, তালিকা প্রস্তুত করার কাজেই হাত দেয়নি ভারত সরকার। বাংলাদেশ সরকারের এই অবস্থানের ফলে ভারতের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এক পদস্থ আমলা জানিয়েছিলেন, মুখে বলা আর কাগজে কলমে বাস্তবায়িত করা দুটোর মধ্যে ফারাক অনেক। কেন্দ্রীয় সরকার যদি তালিকা তৈরির কাজে হাত দেয়, তা হলে তালিকা তৈরির পর সেই তালিকায় থাকা প্রত্যেক ব্যক্তি যে বাংলাদেশি নাগরিক তা প্রমাণ করার দায়িত্বও বর্তায় সরকারের কাঁধে। –কাজটা খুবই কঠিন (ওই)। অর্থাৎ, তথ্য নেই, প্রমাণ নেই, কোনও উপযুক্ত তালিকা নেই, শুধু আছে মিথ্যা ভাষণের সদম্ভ হুঙ্কার। এ হল হিটলারি ফ্যাসিস্ট রাজনীতির ঘৃণ্য উদাহরণ। আবার অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের হাতে একেবারে যে কোনও তথ্য নেই, তা নয়। কিন্তু সেই তথ্য ওরা গোপন করতে চায়, গোপন রাখতে চায়।
২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর লোকসভায় একটা প্রশ্ন রেখেছিলেন সাংসদ জগদীশ চন্দ্র বর্মা বসুনিয়া ও শর্মিলা সরকার। প্রশ্নটা ছিল, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে এই পর্যন্ত কত অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে এবং সেই ঘটনায় কত জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে? উত্তরে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের ঘটনা ও সেই সব ঘটনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা হল যথাক্রমে এই রকম–
| সাল | অনুপ্রবেশের ঘটনা | গ্রেফতার |
| ২০২১ | ৭০৩ | ১২০৮ |
| ২০২২ | ৮৫৭ | ২০৭৬ |
| ২০২৩ | ৭৪৬ | ২৬১৭ |
| ২০২৪ | ৯৭৭ | ২৫২৫ |
| ২০২৫ (নভেম্বর) | ১১০৪ | ২৫৫৬ |
তথ্যে দেখা যাচ্ছে অনুপ্রবেশের সংখ্যাটা উল্লেখযোগ্য নয়। বলতে গেলে অতি নগণ্য। আর এই যারা ঢুকছে তারা সবাই বাংলায় ঢুকছে তাও নয়, বিজেপি শাসিত ত্রিপুরা, আসাম ইত্যাদি রাজ্যেও ঢুকছে। এই সরকারি পরিসংখ্যান তো বিরোধীদের তৈরি নয়– এ তো খোদ অমিত শাহের দপ্তরের হিসাব। এই হিসাবকেই তো তাঁর গ্রহণ করা উচিত। তা না করে ক্রমাগত মিথ্যা কথা বলেছেন কেন? বাংলার মানুষকে এই সত্যটা বলতে তিনি ভয় পাচ্ছেন কেন? তা হলে তিনি বলুন, নিজের দপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যানের উপর তাঁর কোনও আস্থা নেই। অর্থাৎ ১২ বছর ধরে তাঁর পরিচালনাধীন স্বরাষ্ট্র দপ্তর অযোগ্য। এর উদ্দেশ্য একটাই হতে পারে, মানুষকে ভুল বুঝিয়ে ভোট হাসিল করা।
বাংলায় ভোট চাইতে এসে তৃণমূল কংগ্রেসের দুন¹তি-অপশাসনের বিরুদ্ধে তাঁরা বলতে গেলেই মানুষ বলছে– ১৫টা রাজ্যে তোমরা আলাদা কী করেছ বলো! কিছু বলার নেই বলেই এখন অনুপ্রবেশকারীর ভূত দেখিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি ছাড়া তাঁদের করার কিছু নেই। কিন্তু একটা কথা তিনি ভুলে গেছেন। মানুষকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ভুল বোঝানো যায় না। তাঁরা সত্য ধরতে পারবেই এবং তারপর অমিত শাহজিদের মতো ফ্যাসিস্টদের কাছ থেকে জবাবদিহি চাইবেই। অমিত শাহজি ঘুসপেটিয়া বলে যতই চিৎকার করবেন, ততই তিনি প্রমাণ করবেন– স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো দায়িত্বশীল পদের তিনি যোগ্য নন। আর, এক অযোগ্য ব্যক্তির মুখের কথা মানুষ বিশ্বাস করবেন কেন?