
আমাদের সমাজ– আমরা চাই বা না চাই– শ্রেণিবিভক্ত সমাজ, শোষক ও শোষিতে বিভক্ত সমাজ। এটা একটা সাদামাটা কথা। এর একদিকে কোটি কোটি শোষিত জনসাধারণ যারা শ্রমের বিনিময়ে কোনওমতে তাদের দিন গুজরান করছে, অপর দিকে মুষ্টিমেয় শোষক শ্রেণি যারা দেশের ধনসম্পদ যতটুকু রয়েছে তার মালিক এবং তার কর্তৃত্ব করছে– মানুষের পরিশ্রম দিয়ে দেশে ধনসম্পদ যতটা বাড়ছে মুনাফার মাধ্যমে তাকে তারা আত্মসাৎ করছে। তার ফলে দেশে শিল্পোন্নতি যতটুকু হচ্ছে, শিল্পবিকাশ যতটুকু হচ্ছে, যে সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে তা গিয়ে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে মুষ্টিমেয় লোকের হাতে। সাধারণ মানুষের জীবনে তার ফল বর্তাচ্ছে না। দারিদ্র্য চরম আকার নিচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, বেকার সমস্যা বাড়ছে, সংস্কৃতির চূড়ান্ত অবক্ষয় ঘটছে, নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
এই যে সমাজ মূলত শোষক ও শোষিত এই দুই ভাগে বিভক্ত, এটা কেউ চেয়েছে বলে হয়নি। আমাদের ভাল লাগুক আর নাই লাগুক, আমরা পছন্দ করি আর নাই করি, ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই সমাজ দুটো ভাগে বিভক্ত হয়েছে। একে অস্বীকার করার আমাদের উপায় নেই। আর যখন থেকে উৎপাদন ও বণ্টনের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সমাজ দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে তার পর থেকেই মানুষ হিসাবে, স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, জেনেই হোক বা না জেনে, আমরা কোনও না কোনও শ্রেণির স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি, জড়িয়েই বাস করি। কারণ উৎপাদনের সঙ্গে কোনও না কোনও প্রকারে সম্পর্ক স্থাপনা ব্যতিরেকে আমরা সামাজিক জীব হিসাবে সমাজে বসবাস করতে পারি না। খাওয়া, পরা, জীবনধারণ প্রভৃতি সমস্ত ব্যাপারেই আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে একটা সম্পর্ক স্থাপনা করতে হয় এবং এই সম্পর্ক স্থাপনার মধ্য দিয়ে আমরা স্ব-ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কোনও না কোনও শ্রেণির স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। এখন এই যে সমাজে পরস্পরবিরোধী দুটো শ্রেণি রয়েছে তাদের পরস্পরবিরোধী দুটো স্বার্থবোধও রয়েছে। শোষক শ্রেণি প্রচলিত সমাজব্যবস্থা থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় বলে সব সময়ই সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চায়। প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য ধর্ম, অনুশাসন, যুক্তি, আদর্শবাদ, ন্যায়নীতি, আইনকানুন, অর্থনীতিশাস্ত্র– সমস্ত কিছুকে তারা গড়ে তোলে, তার সপক্ষে তারা প্রচার করে, যুক্তিজাল বিস্তার করে। অবশ্যই এগুলি তারা সমস্ত মানুষের স্বার্থের নামেই করে, ‘সমস্ত মানুষের কল্যাণের জন্য করছি’ বলেই করে। কিন্তু আসলে এ সমস্তই তারা তাদের শ্রেণিশাসন এবং শোষণটিকে বজায় রাখার জন্যই করে। প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখাই শোষক শ্রেণির স্বার্থ। আর এর থেকেই তার শ্রেণিস্বার্থবোধের জন্ম। ঠিক তেমনই একটা শোষণমূলক সমাজব্যবস্থায় যারা শোষিত হচ্ছে সেই মানুষগুলো, অর্থাৎ শোষিত শ্রেণিগুলো, শোষণমুক্তির জন্যই শোষণমূলক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থাটাকে পাল্টাতে চায় যাতে সমাজের বেশিরভাগ মানুষ যারা শোষণে জর্জরিত হচ্ছে তারা শোষণ থেকে মুক্তিলাভ করে সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে পারে, অর্থনৈতিক জীবনের বিকাশসাধন করতে পারে এবং সাংস্কৃতিক জীবনের বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়। তাই দেখা যায় শ্রেণিবিভক্ত সমাজে ইতিহাসের সমস্ত স্তরে শোষণমূলক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা ভেঙে ফেলে বেশিরভাগ মানুষের অগ্রগতি ও উন্নতির সাথে সঙ্গতি রেখে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটাতে সক্ষম– এরূপ একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা সবসময়েই শোষিত শ্রেণিগুলি গড়ে তুলতে চেয়েছে। সুতরাং যুগে যুগে শোষণমূলক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলাই শোষিত মানুষের স্বার্থ। আর এর থেকেই তার শ্রেণিস্বার্থবোধের জন্ম।
তাই শোষক ও শোষিতে ভাগ হওয়ার পর থেকেই একটা দ্বন্দ্ব নিয়ত সমাজের অভ্যন্তরে শোষক শ্রেণি ও শোষিত শ্রেণির মধ্যে চলছে। অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে, রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি সমস্ত কিছুকে কেন্দ্র করে সমস্ত ক্ষেত্রে এই দুই পরস্পরবিরোধী শক্তির দ্বন্দ্ব নিয়তই চলছে। এই দ্বন্দ্ব চলতে চলতে সংগ্রাম যখন একটা চরম রূপ নেয় তখন তা সরাসরি ‘কনফ্লিক্ট’ (সংঘর্ষ) বা বিপ্লবে পর্যবসিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত পুরনো রাষ্ট্রব্যবস্থা পাল্টে যায় এবং তার পরিবর্তে আর একটা নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থার স্থাপনা হয়।
শ্রেণিবিভক্ত হওয়ার পর সমাজ যে বারে বারে পাল্টেছে, সমাজ পাল্টাবার সেই প্রতিটি ক্ষেত্রেই মৌলিক নিয়মটি হচ্ছে– সমাজ অভ্যন্তরে শোষক এবং শোষিতের যে দ্বন্দ্ব সেই দ্বন্দ্ব চলতে চলতে যখন একটা চরম পরিণতিতে পৌঁছায়, যখন আর কোনও মতেই একই সমাজের অভ্যন্তরে শোষক এবং শোষিত আপস করেও চলতে পারে না, জীবনযাপন করতে পারে না– তখন একটা চূড়ান্ত মোকাবিলার সময় আসে এবং এই চূড়ান্ত মোকাবিলার মধ্য দিয়ে শোষিত শ্রেণি শোষক শ্রেণিকে উৎখাত করে দিয়ে একটা নতুন সমাজ, নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, নতুন নিয়ম, আইন-কানুন, রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রবর্তন করে। এই সামাজিক নিয়মনীতি, আইন-কানুন, শিক্ষাব্যবস্থা, সংস্কৃতি– যা কিছু আমরা দেখছি– এ সবই একটি বিশেষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে তার উপরিকাঠামো হিসাবে গড়ে ওঠে। এই সমস্ত কিছুকেই দেখভাল করবার ও রক্ষা করবার যন্ত্র হচ্ছে রাষ্ট্র।
তাই রাষ্ট্র হচ্ছে শ্রেণির হাতে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার যার দ্বারা শাসক শ্রেণি তাদের সমস্ত ‘ইনস্টিটিউশনস’ (প্রতিষ্ঠানগুলি), সমস্ত কার্যকলাপ, অর্থনীতি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তাদের যত আন্দোলন এবং কর্মপ্রচেষ্টা– সমস্ত কিছুকে রক্ষা করে। তাই রাষ্ট্র হচ্ছে, এক কথায়, শ্রেণিবিভক্ত সমাজে কোনও না কোনও শ্রেণির হাতে শ্রেণিশাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। ইতিহাসের ছাত্র হলে এ কথা অস্বীকার করার উপায় কারও নেই। কেবলমাত্র অনৈতিহাসিক মনগড়া কথার দ্বারা গায়ের জোরেই এ কথা অস্বীকার করা যেতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র গড়ে ওঠার ইতিহাস, রাষ্ট্রবিপ্লবের ও রাষ্ট্রের ক্রমবিকাশের ইতিহাস, সমাজ গড়ে ওঠা ও সমাজের অগ্রগতির ইতিহাস যদি আমরা অনুসন্ধান করি এবং জানতে পারি তা হলে যে কথাগুলি আমি বললাম তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই আমাদের দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি বর্তমানে কী, সেটা যথার্থ ভাবে নিরূপণ করতে হলে এই শোষক এবং শোষিতের মধ্যে কার দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা আমরা সমস্যাগুলোকে বিচার করব– প্রথমে সেটাই ঠিক করে নেওয়া প্রয়োজন। আমরা যখন বলব দেশের বর্তমান পরিস্থিতি– তখন এই ‘দেশ’ কথাটাকে আমরা কাদের অর্থে ভাবব? দেশের পঞ্চান্ন কোটি মানুষের মধ্যে যারা তিপ্পান্ন কোটি মানুষ, যারা খেটে খায়, যারা অক্লান্ত শ্রমের দ্বারা দেশের সম্পদ তৈরি করছে, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে গ্রামের অজ্ঞ চাষি এবং খেতমজুর পর্যন্ত তাদের নিয়ে ভাবব– তাদের নিয়েই তো দেশ, তাদের স্বার্থ, তাদের কল্যাণের কথা, তাদের ভবিষ্যতের কথা এই অর্থে দেশের ভবিষ্যতের কথা ভাবব এবং দেশের পরিস্থিতির কথা চিন্তা করব? নাকি এই পঞ্চান্ন কোটি মানুষের মধ্যে যারা নিতান্তই মুষ্টিমেয় দু’এক কোটি লোক, যারা দেশের যা সম্পদ রয়েছে তার মালিক হয়ে বসেছে এবং যারা শোষণের রাস্তায় দেশের শ্রমশক্তিকে এবং মানুষের পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে মুনাফা লুটছে সেই অত্যাচারী শোষক শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গিতে, তাদের স্বার্থে আমরা দেশের কথা ভাবব? শ্রেণিবিভক্ত সমাজে মালিক-মজুর, শোষক-শোষিত– উভয়ের স্বার্থ বলতে, উভয়ের দেশ বলতে এক এবং অভিন্ন স্বার্থবোধ নেই। হয় মালিকের স্বার্থে দেশাত্মবোধ, না হয় শোষিত জনসাধারণের স্বার্থে দেশাত্মবোধ। ‘জাতীয় উন্নতি’, ‘জাতীয় অগ্রগতির সমস্যা’– এই সমস্ত কথা শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিয়ে এবং শ্রেণিস্বার্থের কথা উল্লেখ না করে, গোল গোল করে, ভাসাভাসা ভাবে যারা বলে তারা হয় ধাপ্পাবাজ, না হয় আকাট মূর্খ, হয় হাড় শয়তান, না হয় রাম মূর্খ। এ দুটোর যে কোনও একটা তারা বেছে নিতে পারে, কোনও আপত্তি নেই। ‘সকলের স্বার্থ’– এ রকম কোনও জাতীয় স্বার্থবোধের কথা জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করতে একমাত্র শয়তানেরাই বলতে পারে, না হয় অজ্ঞতার জন্য আকাট মূর্খের দল বলতে পারে। যারা সত্য কথা বলতে চায়, যারা ইতিহাস, জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা করে, যারা জনসাধারণের কথা বলবে, যারা শ্রমিক-চাষি-খেতমজুর ও অন্যান্য শোষিত মানুষের কথা বলবে তারা এ রকম ভাসাভাসা ভাবে বলতে পারে না। তাদের বলতে হবে কোন শ্রেণির স্বার্থে, কার অর্থে দেশের স্বার্থবোধ?
‘সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ও বেকার সমস্যার সমাধান কোন পথে’ বই থেকে