
সম্প্রতি বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে নানা প্রসঙ্গে এমনকি অযোধ্যায় রামমন্দিরের ধ্বজা ওড়াতে গিয়ে ‘মেকলের চিন্তার ফলে সৃষ্ট সামাজিক ক্ষত’ এবং ‘ঔপনিবেশক দাসত্ব থেকে মুক্তি’র কথা মনে পড়েছে কেন নরেন্দ্র মোদিজির? গত ১৭ নভেম্বর ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা রামনাথ গোয়েঙ্কা স্মারক বক্তৃতাতেও মোদিজি বলেছেন, মেকলেই আমাদের প্রাচীন সভ্যতার ভিত উপড়ে ফেলেছেন, এর সামাজিক প্রভাব এক দশকের মধ্যে দেশ থেকে মুছে ফেলতে হবে। যদিও, ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের তাড়ায় তড়িঘড়ি অসমাপ্ত রামমন্দির উদ্বোধন করার সময় তিনি এবং আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতজি ৫০০ বছরের ‘ক্ষত নিরাময় হয়ে গেল’ বলেছিলেন! তা হলে ‘ক্ষত নিরাময়ের’ এই প্রশ্নটিতে ঠিক কী চাইছেন নরেন্দ্র মোদি তথা আরএসএস-বিজেপি!
মেকলে সাহেবের বহু আলোচিত শিক্ষা সুপারিশের ১৯০ বছর পর তাকে নিয়েই এত কথা কেন, তা একটু তলিয়ে ভাবা দরকার। ভাবা দরকার লক্ষ্যটা কি মেকলে, নাকি অন্য কিছু!
মেকলে কী করেছিলেন
টমাস বাবিংটন মেকলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনাধীন ভারতে গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের উপদেষ্টা হিসাবে ১৮৩৪ থেকে ১৮৩৯ পর্যন্ত শিক্ষা এবং আইনি সংস্কারের কাজে পরামর্শ দিয়েছিলেন। ১৮৩৫-এর ফেব্রুয়ারিতে জেনারেল কমিটি অফ পাবলিক ইনস্ট্রাকশনের সভাপতি হিসাবে শিক্ষা সংস্কার সংক্রান্ত বিষয়ে ‘মেকলে মিনিটস’-এ তিনি ভারতীয়দের জন্য সংস্কৃত এবং আরবি মাধ্যমে শিক্ষার বিরোধিতা করে ইংরেজিতে শিক্ষা দানের কথা বলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রয়োজনে কিছু ইংরেজি শিক্ষিত কেরানি তৈরি ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। তাই মেকলে তাঁর সুপারিশ ‘মেকলে মিনিটস’-এ লিখেছেন দরকার, ইংরেজি শিক্ষিত একদল লোক তৈরি করা, যারা ‘রক্তে-বর্ণে ভারতীয়’ কিন্তু ‘রুচিতে, মতবাদে, নীতি বিষয়ে, ভাবনা-ধারণায় ইংরেজ’। কিন্তু, যাঁরাই সে দিন ইংরেজি শিখেছেন তাঁরা সবাই কি মেকলে বর্ণিত এই রকম মানুষ তৈরি হয়েছেন? একই সাথে ভাবা দরকার, আজকের দিনে যাঁরা ইংরেজি ভাষা শিক্ষার পক্ষে বলছেন, জ্ঞান চর্চায় তথাকথিত ‘স্বদেশি-বিদেশি’ তকমা ঝেড়ে ফেলে বিশ্বের সমস্ত উন্নত জ্ঞানের সাধানায় যাঁরা প্রবৃত্ত, যাঁরা ইতিহাসের বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি এবং বৈজ্ঞানিক-গণতান্ত্রিক শিক্ষা চান, যাঁরা স্বদেশিয়ানার অজুহাতে বিশ্বের থেকে পাওয়া উন্নত আদর্শকে ত্যাগ করতে নারাজ, তাঁরা কি সব আরএসএস-বিজেপি কথিত ‘ভারতীয় ঐতিহ্য বিরোধী’ ‘মেকলে সন্তান’!
যদিও ইতিহাস বলে, ব্রিটিশ বরং ভারতীয়দের ইংরেজি শেখাতে দ্বিধান্বিত ছিল। ১৮৩১-এ ব্রিটেনের হাউস অফ কমন্সে মেজর জেনারেল লিও স্মিথ ভারতে শিক্ষা বিস্তার প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘শিক্ষার বিস্তার আমাদের সে দেশ থেকে উৎখাত করবে’ (লাইফ অ্যান্ড লেটার্স অফ লর্ড মেকলে)। মেকলেও লিখেছিলেন, গ্রিক এবং ল্যাটিনের স্পর্শ না পেলে ইংরেজি ভাষার উন্নতিহতে পারত না। একই ভাবে ইংরেজিও ভারতীয় ভাষাগুলিকে উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে (ওই)। যে হেতু উন্নত ভাষা হল উন্নত চিন্তার ভিত্তি, সে কারণে এর ফলে ভারতে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রসার ঘটেছে, ধর্মীয় কূপমণ্ডুকতা, বর্ণজাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে মনন তৈরি হতে তা সাহায্য করেছে। বাস্তবে দেখা গেছে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের দরজা ভারতীয়দের সামনে খুলে দিয়েছে, ভারতীয় নবজাগরণের উন্মেষ ঘটার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে জন্ম হয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম।
ইংরেজি শেখার দাবি ছিল ভারতীয়দেরই
বাস্তবে, তখন ভারতীয়দের কাছে ইংরেজি শিক্ষার দরজা খুলে দেওয়া ছাড়া ব্রিটিশের উপায়ও ছিল না। এটা ছিল তখন ভারতীয়দের মধ্যে থেকে উঠে আসা একটি জোরালো দাবি। অনেক ভারতীয় যে তখনই ইংরেজি ভাষা এবং দর্শন-বিজ্ঞানের বহু বিষয়ে ইউরোপীয়দের সমকক্ষ হয়ে উঠেছেন তা মেকলেরও দৃষ্টি এড়ায়নি (ওই)। লর্ড কার্জনের সময় ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র সম্পাদক লোভাট ফ্রেজার লিখেছিলেন, ‘আমরা যদি ভারতের জনসাধারণের জন্য পাশ্চাত্য জ্ঞান ভাণ্ডারের দ্বার উন্মুক্ত না করতাম, তারা নিজেরাই তা খুলে নিত। সংস্কৃত সাহিত্যের ছায়াচ্ছন্ন প্রাচীন বনবিতানে বিচরণ করে তারা আর সন্তুষ্ট থাকতে পারত না। পাশ্চাত্য সব সময়েই তার অনুপ্রবেশের সামনে সব বাধাকে চুরমার করে এগিয়েছে। …আমাদের বিরুদ্ধতা করবার সিংহদুয়ার তারা যে চাবিকাঠিতে খুলে ফেলেছে, তা আমরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারতাম। কিন্তু আমাদের আর কিছুই করার ছিল না। ৩০ কোটি মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তির দাসত্বে বেঁধে রাখা যায় না’ (ইন্ডিয়া আন্ডার কার্জন অ্যান্ড আফটার, লোভাট ফ্রেজার, ১৯১১, পৃঃ ১৮৮)। ফলে মেকলে তো নিমিত্ত মাত্র, সমগ্র ব্রিটিশ শক্তি চেষ্টা করলেও ভারতীয়দের ইংরেজি শিক্ষা থেকে আর বঞ্চিত রাখতে পারত না। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সহ ভারতীয় নবজাগরণের মনীষীদের প্রচেষ্টায় কেরানি তৈরির শিক্ষার বদলে আধুনিক মানুষ গড়ার শিক্ষার জন্য লড়াই শুরু হয়।
আধুনিক মানুষ কারা
রাজা রামমোহন রায় ১৮২২-এ তাঁর প্রতিষ্ঠিত অ্যাংলো হিন্দু স্কুল এবং ১৮২৬-এ বেদান্ত কলেজে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রণালীর পক্ষে সওয়াল করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সংস্কৃত শিক্ষা ব্যবস্থা দেশকে অন্ধকারে নিমগ্ন রাখার একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ’ (লর্ড আমহার্স্টকে লেখা চিঠি)। তিনি সংস্কৃত, আরবি, ফারসির বদলে ইংরেজি, আধুনিক বিজ্ঞান, কেমিস্ট্রি ইত্যাদি পড়ানোর কথা বলেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৫২-তে তাঁর ‘নোটস অন সাংস্ক্রিট কলেজ’-এ লিখেছেন, ‘সংস্কৃত কলেজের ছাত্রদের যদি ইংরেজি সাহিত্য ভালভাবে শিক্ষা দেওয়া যায়, তা হলেই একমাত্র তারা সুসমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্যের দক্ষ ও শক্তিশালী রচয়িতা হয়ে উঠতে পারে’। তিনি সংস্কৃত গণিতের বদলে ইংরেজিতে আধুনিক গণিত শেখাতে বলেছেন। তিনি বঙ্গদেশের শিক্ষকদের হতে বলেছিলেন, কুসংস্কারমুক্ত এবং ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় দক্ষ। বিদ্যাসাগর চেয়েছিলেন, সমাজের সাতপুরু মাটি উপড়ে ফেলে মধ্যযুগীয় ভাবধারা, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ধর্মীয় কূপমণ্ডুক মানুষের চাষ বন্ধ করে আধুনিক মনন সম্পন্ন আধুনিক মানুষের চাষ করতে। এ জন্যই তিনি ইংরেজি ভাষা শিক্ষা ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। মেকলে বর্ণিত ‘ইংরেজ ছাঁচের’ মানুষ তৈরির বদলে আধুনিক ভারতীয় গড়ে তোলার জন্য এই দুই মনীষী সহ আরও অনেকেই লড়াই করেছেন। আধুনিকতা মানে যে ইউরোপের নকল করা নয়, বিশ্বের সমস্ত উন্নত চিন্তার যুক্তিসঙ্গত আত্মীকরণ, তা তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই পথেই গড়ে উঠেছে উগ্রতামুক্ত স্বজাত্যবোধ। যা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথে আলোকবর্তিকা হিসাবে কাজ করেছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, শিল্পী ইত্যাদি যাঁরাই ব্রিটিশের বিরুদ্ধে মাথা তুলেছেন কেউই প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠত্বের দোহাই পেড়ে আধুনিক আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকেননি। জ্যোতিবা ফুলে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, মহাত্মা গান্ধী, চিত্তরঞ্জন দাশ, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ভগৎ সিং, সুভাষচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা ইত্যাদি যাদের নিয়ে ভারতবাসী গর্বিত, তাঁদের সকলের ক্ষেত্রেই কথাটা সত্য।
অথচ, মধ্যপ্রদেশের বিজেপি নেতা ও শিক্ষামন্ত্রী বলে দিলেন–‘ব্রিটিশের দালাল’ হিসাবে রামমোহন হিন্দুদের ধর্মান্তরণের জন্য ব্রিটিশকে সাহায্য করেছেন। এর আগে ২০১৯-এ সতীদাহের সমর্থনে দাঁড়িয়ে বিজেপি ঘনিষ্ঠ অভিনেত্রী পায়েল রোহতগি এবং রাজস্থানের বিজেপি নেত্রী বিজয় রাজে সিন্ধিয়াও রামমোহনকে ব্রিটিশের ‘চামচা’ বলেছিলেন। আরএসএস-বিজেপির সুনির্দিষ্ট অবস্থানই এটা। না হলে কি কথায় এই মিল থাকত? এমনকি এই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বর্তমান রাজ্য সভাপতি রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের চর্চা থেকে বাঙালিকে বেরিয়ে আসতে বলেছেন। এ রাজ্যে বিজেপির মুখ তথা বিরোধী দলনেতা চান নজরুলের ‘একই বৃন্তে দুটি কুসুম’ গানটিকে বাতিল করতে। তাহলে কোন জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বিজেপি কথিত স্বদেশি চিন্তা প্রতিষ্ঠিত হবে?
কেমন স্বদেশিয়ানা চাইছে বিজেপি
ভারতীয় ঐতিহ্য এবং জাতীয়তাবোধ বলতে কী বোঝাতে চায় বিজেপি? তারা ২০১৪-তে কেন্দ্রীয় সরকারে বসার পর থেকে আরএসএস কথিত ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের’ কর্মসূচিকে শিক্ষাক্ষেত্রে চালু করার চেষ্টা করেছে। তাদের ধারণায় এই জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হল, ‘শুচিতা’, ‘সুরক্ষা’, ‘স্বদেশি’, ‘সামাজিক সম রাস্তা’ এবং ‘হিন্দুত্ব’। এই অ্যাজেন্ডাকে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনুুপ্রবেশ করাতে প্রথমে গুজরাটের বিজেপি সরকার ‘প্রেরণা দীপ’ নামে একটি বই সহ ন’টি বই স্কুল স্তরের পাঠ্যক্রমে এনেছিল। যাতে মহাভারতে স্টেম সেল গবেষণা, টেলিভিশন আবিষ্কার, বৈদিক যুগে মোটর গাড়ি আবিষ্কার ইত্যাদি যেমন ছিল, একই সাথে ছিল স্বদেশিয়ানার নামে আফ্রিকার কালো মানুষ নিগ্রোদের ভারতীয়দের তুলনায় খাটো বুদ্ধির দেখানো, বিবেকানন্দ নাকি বিদেশিদের পায়ের জুতো মনে করতেন ইত্যাদি গালগল্প। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বৈদিক বিমান ও মঙ্গল গ্রহে ভারতীয় বৈদিক ঋষিদের ‘হেলমেট’ পড়ে থাকার অলীক কল্পনাপ্রসূত পেপার বিজ্ঞান কংগ্রেসে পড়া হয়েছে। এই কি ভারতীয় ঐতিহ্যের সত্যিকারের নমুনা? তারা বিজ্ঞান শিক্ষাতেও ডারউইনের বিবর্তনবাদের বিরুদ্ধে জিগির তুলছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই গণেশের মাথার সাথে প্লাস্টিক সার্জারির তুলনা করে অবৈজ্ঞানিক হাস্যকর কথাবার্তা বলেছেন। রামায়ণের প্রকৃত ইতিহাসকে ভুলিয়ে দিয়ে ভারত ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটিকে তারা সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন। জাতীয় শিক্ষানীতিতেও বিজেপি এনেছে বৈদিক গণিত, জ্যোতিষ চর্চা। আইআইটি-র মতো বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে অবৈজ্ঞানিক এবং ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন চিন্তা প্রসারের চেষ্টা করছে তারা। সাহিত্যের সিলেবাসেও আরএসএস মনোনীত কিছু লেখকের রচনা ছাড়া নবজাগরণের চিন্তা সম্বলিত মানবতাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনীষীদের রচনা বাদ দিচ্ছে। মনে রাখা দরকার, বিজেপি ‘ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম’ বলতে প্রাচীন ভারতের গৌরবগাথার নামে যা প্রচার করতে চাইছে, বহুদিন আগেই এই ধরনের প্রচেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করেছেন অক্ষয় কুমার দত্ত, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহার মতো চিন্তাবিদ-বিজ্ঞানীরা। রবীন্দ্রনাথ ‘প্রত্নতত্ব’ নামে রচনা সহ নানা লেখায় তীব্র কষাঘাত করেছেন এই সমস্ত মিথ্যার বিরুদ্ধে। এঁদের কি আধুনিক মানুষ বলে বিজেপি মানবে? তাঁরা কিন্তু বেদ-পুরাণ-বেদান্তের যুগের শিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে ইংরেজি ভাষা, মাতৃভাষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার কথা বলেছেন। তাঁদেরও কি তবে মেকলের অনুগামী বলে বিজেপি মনে করে?
সাম্প্রদায়িক ধর্মধ্বজরাই ব্রিটিশের দাসত্ব করেছে বেশি
ব্রিটিশ ভজনা কারা সবচেয়ে বেশি করেছে? যারা ধর্মীয় গোঁড়ামি নিয়ে চলেছেন এবং তথাকথিত প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যের পূজারি হিসাবে যারা টোল-মাদ্রাসা শিক্ষার পক্ষে দাঁড়িয়ে ইংরেজি শিক্ষার বিরোধিতা করেছেন তাঁরাই ছিলেন এই দলে। যেমন, ১৯১৯ সালে ‘পাঞ্জাব হিন্দু সভা’ জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সরকারের চালানো গণহত্যার পর ব্রিটিশের বদলে সত্যাগ্রহীদের নিন্দা করেছিল এবং ব্রিটিশের প্রতি ‘গভীর আনুগত্যের’ শপথ নিয়েছিল। (কে এল তুতেজা- ‘দ্য পাঞ্জাব হিন্দু সভা অ্যান্ড কমিউনাল পলিটি’, ১৯০৬-১৯২৩’, ফ্রন্টলাইন ১৪ মার্চ ২০০৩-নিউ ব্র্যান্ড অফ হিস্ট্রি, বিশ্বমোহন ঝা-এর প্রবন্ধে উদ্ধৃত)। হিন্দু মুসলিম উভয় ধর্মের প্রভাবশালী ধনী ও অভিজাতরা একেবারে শুরু থেকেই নবজাগরণ ও তার থেকে উদ্ভূত ভারতীয় স্বদেশচেতনার বিরোধী ছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের ইংরেজি শিক্ষার উদ্যোগের বিরোধিতা করেন ১৮৭০-এ ভিঙ্গার রাজা শিবপ্রসাদ, বেনারসের রাজা ইত্যাদি হিন্দু সামন্ত। একই ভাবে ১৮৮৮-তে সৈয়দ আহমেদ খান ইংরেজি পড়ানোর বিরোধিতা করেন (আধুনিক ভারত ও সাম্প্রদায়িকতা, বিপান চন্দ)। এই ধনী অভিজাতরাই পরবর্তীকালে মুসলিম লিগ, হিন্দু মহাসভা, আরএসএস ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়েছেন। উল্লেখ্য, নাগপুর সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় মহান মানবতাবাদী জ্যোতিবা ফুলে জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে ও শিক্ষা বিস্তারের জন্য যে ‘সত্যশোধক’ আন্দোলন গড়ে তোলেন, তার প্রভাবে সামাজিক ক্ষেত্রে তথাকথিত দলিত, অস্পৃশ্যদের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার শক্তি হিসাবে উচ্চবর্ণের প্রাধান্য রক্ষা এবং মুসলিম বিরোধী জিগির তুলে ১৯২৫-এ গঠিত হয় আরএসএস। তারা প্রথম থেকেই সংস্কৃত শিক্ষার মাধ্যমে ‘ভারতীয়ত্ব’ রক্ষার কথা বলে ‘বিদেশি’ ইংরেজি ভাষা শিক্ষার বিরোধিতা করেছে। যদিও আরএসএস-এর আদর্শটাই আসলে ইতালি-জার্মানির ফ্যাস্টিদের থেকে ধার করা। যে আরএসএস এখন ‘ঔপনিবেশিক দাসত্ব দূর’ করতে ও ‘মেকলে সন্তান’ খুঁজতে নেমেছে, তাদের ইতিহাস হল অগাগোড়া ব্রিটিশের চাটুকারিতার ইতিহাস। তাদের গুরু গোলওয়ালকর ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামকে প্রতিক্রিয়াশীল বলেছেন (গোলওয়ালকর, চিন্তাচয়ন)। তাদের পূজ্য বি ডি সাভারকরের ব্রিটিশের কাছে দেওয়া মুচলেকা ও পরে ব্রিটিশের তাঁবেদারির ইতিহাস তো ভোলার নয়।
স্বদেশিয়ানার ভেক
আরএসএস-বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার তথাকথিত ‘ঔপনিবেশিক দাসত্ব’ থেকে মুক্তির কী উপায় করেছে? ২০১৪ থেকে আরএসএস পরিচালিত ‘বিদ্যাভারতী’, ‘অখিল ভারতীয় বিদ্যাসংস্থান’ পরিচালিত স্কুলের পাঠ্যবইয়ে ভারতের মানচিত্রে নেপাল, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, তিব্বত সবই ভারতের অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে। ভারত মহাসাগর, আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরের নাম দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে হিন্দু মহাসাগর, সিন্ধুসাগর ও গঙ্গাসাগর হিসাবে। এমনও বলা হয়েছে, গ্রিক কবি হোমার মহাকাব্য রচনা করেছিলেন রামায়ণ ও মহাভারত পড়ে ও তা অনুসরণ করে! এমনকি বুদ্ধ নাকি গীতা থেকেই তাঁর ধর্মমত সূত্রবদ্ধ করেন এবং জিশু হিমালয়ে এসে হিন্দু সাধুদের কাছে ধর্মশিক্ষা করে খ্রিষ্ট হয়েছিলেন (আনন্দবাজার পত্রিকা ১১.১১.১৯৯৮)। এই শিক্ষা কি সঠিক শিক্ষা? এতে যে ধরনের ‘স্বদেশিয়ানা’ জাগবে তা কি যথার্থ স্বদেশ চেতনা? ভারতীয় ঐতিহ্যের নামে বিজেপি সংস্কৃত শিক্ষার জন্য দশ বছরে ২ হাজার ৫৩২ কোটি ৫৯ লক্ষ টাকা খরচ করেছে। কিন্তু বাকি পাঁচটি ধ্রুপদি ভাষা মিলিয়ে মাত্র ১৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ। একই সাথে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব সাধারণ সরকারি স্কুলগুলিতে কমাতে চেয়েছে বিজেপি প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতি। অথচ রামমোহন-বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে এ দেশের অধিকাংশ মনীষী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী ইংরেজির গুরুত্ব কমানো এবং সংস্কৃত শিক্ষার ওপর অতিরিক্তজোর দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। এমনকি হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রবক্তা স্বামী বিবেকানন্দও বলছেন, ‘…আমাদের ভাষা–সংস্কৃতের গদাই লস্করী চাল–ওই এক চাল নকল করে অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে’ (ভাববার কথা, স্বামী বিবেকানন্দ)। গবেষণার জন্য কেউ সংস্কৃতের চর্চা করতেই পারেন, কিন্তু ‘হিন্দুত্বের’ নামে সংস্কৃতকে আধুনিক ভাষার ঘাড়ে চাপিয়ে মাতৃভাষা ও ইংরেজি শিক্ষার পথ রুদ্ধ করার বিরোধিতা আজ মানুষ করবেই। এ দিকে, আরএসএস-এর ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’ অ্যাজেন্ডা অনুসারে মধ্যপ্রদেশের বিজেপি সরকার হিন্দিতে এমবিবিএস পড়াতে ১০ কোটি টাকা খরচ করে বই ছেপেছে। কিন্তু তা সম্পূর্ণ পড়ে আছে, কারণ জাতীয়তার নামে বিশ্বের চলমান চর্চার থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে আধুনিক শিক্ষা যে সম্ভব নয়, ছাত্র-শিক্ষকরা মর্মে মর্মে বুঝেছেন। আজ আফগানিস্তানের তালিবানরা কিংবা ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের গোঁড়া মুসলিম মৌলবাদীরা ধর্ম রক্ষা, ঐতিহ্য, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে যে সব জিগির তোলে, তার সাথে আরএসএস-বিজেপির এই প্রচেষ্টার পার্থক্য কোথায়?
তিরটা আসলে কার দিকে
মেকলের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশি হওয়ার সওয়াল করা মোদিজির ব্যবহৃত কলম, চশমা, ঘড়ি থেকে শুরু করে অধিকাংশ দ্রব্যই বিদেশি বলে শোনা যায়। তিনি ‘ভোকাল ফর লোকাল’ বলে বিদেশি প্লেনে চড়েন। তাঁর দলের নেতাদের সন্তানরা বেশিরভাগই পড়াশোনা করেন বিদেশে। ‘স্বদেশি’ যুদ্ধ বিমান ‘তেজস’ সরকারি কোম্পানি ‘হ্যাল’ তৈরি করে আমেরিকান ইঞ্জিন দিয়ে। স্বদেশি ‘ব্রহ্মস’ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি রাশিয়ার ইঞ্জিনে। ওষুধ থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক যন্ত্র সবই তৈরি হয় আমদানি করা দ্রব্যে। অথচ তিনি বলে চলেন, ‘বিদেশ থেকে আমদানি করা শাসন প্রণালী তিনি স্বদেশি মডেলে’ বদলে দেবেন! তিনি কি বিদেশের অনুকরণ মনে করে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থাটাকে বিসর্জন দিয়ে রাজার শাসনে ফিরতে চাইবেন?
আরএসএস সেবক হিসাবে মোদিজির আসল স্বদেশিয়ানাটা তবে কী? তাঁদের শিক্ষানীতিতে দেখা যাচ্ছে, তাঁরা চাইছেন শিক্ষাকে মহার্ঘ পণ্যে পরিণত করতে। তাতে দেশের অধিকাংশ দরিদ্র মানুষের কাছে বিজ্ঞানসম্মত উন্নত মানের শিক্ষা পাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠবে। এটা একটি দিক, কিন্তু এটাই পুরো নয়। রামমন্দিরে দাঁড়িয়ে মেকলের প্রসঙ্গ তোলার মধ্যে ইঙ্গিত হচ্ছে– যে কাজ তাঁরা বাবরি মসজিদ ভাঙার মধ্য দিয়ে শুরু করেছেন সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, ২০১৪ থেকে গুজরাটে শুরু করেছেন শিক্ষা ক্ষেত্রে– সেই কাজটিকেই তাঁরা এগিয়ে দিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। কাজটি হল দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক বৈজ্ঞানিক মনন গড়ে ওঠার রাস্তাটাকে সম্পূর্ণ বন্ধ করা। খেয়াল করা দরকার, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’-র ধারণা গোটা বিশ্বেই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি বলে স্বীকৃত হলেও বেশ কিছুদিন ধরে বিজেপি তাকে ‘বিদেশি আইডিয়া’ বলে প্রচার করে চলেছে। কারণ, তাঁদের লক্ষ্য ‘হিন্দু ভারত’, যেখানে মুসলিম সহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকতে হবে। রামমন্দিরে দাঁড়িয়ে মেকলের নাম করে সেই রাস্তাটাকেই খুলতে চেয়েছেন নরেন্দ্র মোদি, মোহন ভাগবতরা। এই রাস্তাতেই তাঁরা জাতীয়তাবাদের নামে উগ্র মেকি দেশপ্রেম আমদানি করতে চান। ভারতীয় জাতীয়তা গড়েই উঠেছে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ বেয়ে। কিন্তু আরএসএস ছিল তার থেকে দূরে। একই ভৌগোলিক ভূখণ্ডে বসবাসকারী সমস্ত ধর্ম-বর্ণ-জাতপাত নির্বিশেষে মানুষ মিলে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে গড়ে উঠেছে এই ভারতীয় জাতীয়তাবোধ। এই জাতীয়তাবোধের ঘোর বিরোধী আরএসএস-এর দর্শন। তারা চায় হিন্দু ধর্ম ভিত্তিক ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’। আরএসএস যে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করে, মুসলিম বিরোধী আন্দোলন চেয়েছে তার কারণও ছিল এটাই। তাদের নেতা সাভারকর বলতেন, একটি জাতি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় নিয়েই তৈরি হতে পারে। তাই জার্মানিতে ইহুদি নিধনের সমর্থক ছিলেন তাঁরা।
সংকটগ্রস্ত একচেটিয়া পুঁজিবাদ যে ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে আজকের ভারতে আরএসএস-বিজেপি তার অন্যতম শক্তিশালী বাহক। এই ফ্যাসিবাদের জন্মই হয়েছে মানব সমাজের অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করতে। সংকটগ্রস্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে হটিয়ে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হওয়া এবং তার প্রয়োজনে সমাজে যে বৈপ্লবিক চিন্তার জন্ম অবশ্যম্ভাবী, তাকে ঠেকিয়ে রাখতেই পুঁজিপতি শ্রেণি আনে ফ্যাসিবাদ। এর প্রয়োজনে তারা উন্নত বৈজ্ঞানিক চিন্তাশীল মনন, রাষ্ট্র ও সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ চর্চা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অনুশীলন এগুলিকে রুখতে চায়। ফ্যাসিস্টরা যুক্তিকে মারতে চায়। অন্ধতাকে বাড়াতে চায়। মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক শিবদাস ঘোষ গভীর উদ্বেগে বলেছিলেন, ফ্যাসিবাদ গড়ে উঠলে দেশে আর মানুষ বলে কেউ থাকবে না – কারণ ফ্যাসিবাদ মানুষ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। যে চিন্তা দিয়ে মানুষের বিকাশ, অগ্রগতি সমাজের সর্বাত্মক প্রগতির পথ সূচিত হতে পারে– তার উপর আক্রমণ শাণিত করে ফ্যাসিবাদ। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, সুভাষচন্দ্র, ভগৎ সিংদের পথ বেয়ে এ দেশের মানুষ এগোলে পরিণতির পথে তা মানুষকে নিয়ে যাবে বৈজ্ঞনিক সমাজতন্ত্র অর্থাৎ মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের দেখানো রাস্তায়। এই মানুষ ফ্যাসিবাদের মোকাবিলা করতে সক্ষম সব দিক থেকে। এটাই আরএসএস-বিজেপির ভয়। কিন্তু নরেন্দ্র মোদিরা জানেন, তাঁরা এখনই যদি এই সমস্ত মনীষীর নাম করে আক্রমণ করেন, তার ফল হবে বিপরীত। তাই তিনি বেছেছেন মেকলেকে। যেন মেকলেই ‘আধুনিক’ শিক্ষার জনক! আসলে ‘বিদেশি’ ‘বিদেশি’ জিগির তুলে প্রথমে ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর আক্রমণ, তারপর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বৈজ্ঞানিক মননের ওপর আক্রমণ এবং অবশেষে আজকের যুগের সর্বোন্নত চিন্তা হিসাবে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের মতো বিশ্বজনীন বিজ্ঞান ও দর্শনকে বিদেশি সাজিয়ে তার ওপর আক্রমণই তাঁদের মূল লক্ষ্য। এখন এরই একটা মুখবন্ধ করে রাখছেন আরএসএস-সেবক নরেন্দ্র মোদি।