
অভয়া কাণ্ডের পর প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে অথচ বিচার আজও অধরা। তারই মাঝে ঘটে চলেছে একের পর এক ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা। শাসন এবং বিচারের দৈন্যে এ রাজ্য এখন ধর্ষকদের মুক্তাঞ্চল। তবে আশার আলো এখনও পুরো নিভে যায়নি। ১৬ ডিসেম্বর দেখলাম বিশাল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমেছে, পায়ে পা মিলিয়ে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে পথ হাঁটছে। ‘অঙ্গীকার যাত্রা’র সেই মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে কিছু বিষয় বিশেষ ভাবে আমার নজর কেড়েছে। যেমন নারীদের সঙ্গে পুরুষদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক মা তাঁদের সন্তানদেরও নিয়ে এসেছেন। আমাদের সাথে ছিল কিছু তরুণ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রী। তাদের উন্মাদনা দেখার মতো। যে ভাবে জোরালো গলায় তারা স্লোগান দিচ্ছিল তাতে আমার ভেতরের ঘুমিয়ে পড়া আগুনটাও যেন তাজা হয়ে উঠছিল। বার বার মন বলছিল, কে বলে আজকের যুবসমাজ কায়েমি স্বার্থ আর ভাতার কাছে বিকিয়ে গেছে? এই তো আগুন আছে– শুধু একটু খুঁচিয়ে জাগিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা। আট-নয় মাসের এক ছোট্ট শিশু তার দিদার কোলে চড়ে এই মহামিছিলের সাক্ষী হল। এমন অনেক মানুষ হেঁটেছেন যাঁদের পায়ে নানা সমস্যা আছে, আবার কারও বা একটা পা-ই নেই।
সাধারণ মানুষ যাঁরা মিছিলে হাঁটতে পারেননি, তাঁদের মধ্যেও উত্তেজনা কিছু কম ছিল না। হাতিবাগান দিয়ে যখন হেঁটে যাচ্ছি তখন পথের ধারের হকার বন্ধুরা দেখলাম মোবাইল ক্যামেরায় ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন। পথচলতি মানুষও দাঁড়িয়ে পড়ে ব্যস্ত ছবি তুলতে। একটা আশ্চর্য ব্যাপার চোখে পড়ল– রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পড়েছে প্রাইভেট কার, ট্যাক্সি, বাইক। কিন্তু কারও মুখে বিরক্তির ছাপ নেই। সবাই ছবি তুলছে, ভিডিও করছে, কেউ কেউ আবার গলা মিলিয়ে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান তুলছে। বেশ কয়েকটা অ্যাম্বুলেন্স পাস করল। সেগুলিকে যথাযথ ভাবে রাস্তা করে দিল ভলান্টিয়ার ভাই-বোনেরা।
সবচাইতে বেশি মন কেড়ে নিল দুটো ঘটনা। মিছিল তখন রূপবাণী স্টপেজ পেরিয়েছে, একটা স্কুলের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির ভেতরের বেশ কয়েকটা খুদে জানালা দিয়ে আমাদের দেখছে আর হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করতে চাইছে। আমরা হাত মেলাতেই কী খুশি! মনে হল ওরাই আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ। আরও একটা ঘটনা। কলেজ স্ট্রিট মোড়ের কাছে একটা গাড়ির ভেতরে বসে আছেন এক বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা, হাত বাড়িয়ে কিছু যেন বলতে চাইছেন। আমি ভাবলাম হাত মেলাবেন, এগিয়ে যেতেই ঝান্ডাটা একবার ধরতে চাইলেন। গাড়ির ভেতর থেকেই হাত বাড়িয়ে ঝান্ডাটা ধরলেন। আহা, গত শতকের বিপ্লবের স্বপ্ন আজও যেন অমলিন ওঁর চোখে!
আর আমার অন্তরের অন্তঃস্থলের নিজস্ব অনুভূতিগুলি? মিছিলে হাঁটি না বহু বছর হয়ে গিয়েছে। সরকারের চাকর হওয়ার পর থেকে প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে বিরতি নিতে হয়েছে। কোন যুক্তিতে জানি না, কিন্তু সরকারি কলেজের শিক্ষকরা রাজনীতি করতে পারেন না। গত বছর অভয়া কাণ্ডের পরে অনেকগুলো মিছিলে হেঁটেছিলাম। এ দিন অনেকটা রাস্তা হাঁটা হলেও শারীরিক কষ্ট হয়নি এমন বললে ভুল বলা হবে। কিন্তু কিছুটা এগোবার পরে পায়ের জড়তাটা কেটে গেল। হাতিবাগানের কাছাকাছি অঞ্চলে গণদাবী পত্রিকার এক সাংবাদিক এসে বাইট নিলেন, ভাল লাগল নিজের মনের কথাগুলো বলতে পেরে। হঠাৎ পা জানান দিল। সর্বনাশ! পায়ের পেশিতে টান ধরেছে, প্রত্যেকটা পদক্ষেপ ফেলতে পা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। হাঁটার গতি অর্ধেক হয়ে গেল। পিছিয়ে গেলাম অনেকটাই। পরক্ষণেই উল্টো দিকে চোখ পড়তে দেখতে পেলাম আমার কলেজ স্কটিশ চার্চ কলেজের বিল্ডিং, যেখানে দাঁড়িয়ে একদিন গুরুর কাছে শিক্ষা পেয়েছিলাম অন্যায় দেখে কখনও চুপ করে না থাকতে। আজ যখন পশ্চিমবঙ্গের বুকে এত বড় একটা অন্যায় ঘটে চলেছে, তখন তার প্রতিবাদে নেমে ফিরে যাওয়াটা সাজে না। ভাবনাটা আসতেই পায়ের জড়তা অতিক্রম করল মন। আগের থেকেও দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। কলেজ স্ট্রিটের আগে এক বার গলা শুকিয়ে আবার একটু কষ্ট হচ্ছিল। মনকে বোঝালাম, ওই তো সামনেই আমার ঈশ্বর– ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর! হ্যাঁ, তাঁর মূর্তির পাদদেশেই তো আমরা মিলিত হব!
প্রতিবাদের এ মশাল তো নিভতে দেওয়া যাবে না, দিয়ে যেতে হবে কারও হাতে। যোগ্য উত্তরসূরী তৈরি করতে না পারলে চলবে কেমন করে? একজন শিক্ষকের কাজ তো কেবল সিলেবাস শেষ করে, ছাত্রদের পরীক্ষা বৈতরণী পার করানো নয়। যে শিক্ষক জীবনের পাঠ দিতে পারেন না, আমার কাছে তিনি শিক্ষক হিসেবে ব্যর্থ। এ দিনের সমাবেশে যোগ দিয়েছিল আমার কয়েকজন ছাত্রীও। যারা দূরত্বের কারণে আসতে পারেনি, তারাও নিজেদের প্রতিবাদ নিজেদের মতো করে ব্যক্ত করেছে। কেউ বা মন্তব্য করেছে, কেউ বা জন্ম দিয়েছে জলজ্যান্ত কবিতার। এই বহ্নিশিখা জ্বলুক, জ্বলতে থাকুক। এইটুকুই তো চাওয়া।
মৌমিতা দে
বরানগর, কলকাতা