
সুন্দরবনে এসেছিলেন অভিনেতা ও বিজেপি নেতা মিঠুন চক্রবর্তী। তিনি ৮-১০টি জনবসতিহীন দ্বীপ চিহ্নিত করে সেখানে ‘টাইগার টুরিজম’-এর নামে পাঁচতারা মানের ট্রি-হাউস বা পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তাতে দ্বীপগুলি ৯৯ বছরের জন্য বেসরকারি সংস্থাকে লিজ দেওয়া হবে এবং ৭০-৮০ শতাংশ কর্মী স্থানীয় মানুষদের থেকে নেওয়ার শর্ত থাকবে। ডলফিন দর্শন ও ধর্মীয় পর্যটনের কথাও এ প্রসঙ্গে এসেছে।
এ বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত পরিকল্পনা এখনও আসেনি। কিন্তু এই ঘোষণাই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।
সুন্দরবন কার? উন্নয়ন কার জন্য? আর সেই উন্নয়নের লাভ কার হাতে যাবে? তার মূল্য কে দেবে? কে হবে উন্নয়নের বলি? কে চাপা পড়বে উন্নয়নের রথের চাকায়?
কারও ঘর ভাঙে, কেউ পাঁচতারা হোটেলের স্বপ্ন দেখে
একদিকে সুন্দরবনের ভাঙা বাঁধ। অন্য দিকে পাঁচতারা পর্যটনের স্বপ্ন। একদিকে নদীর নোনা জল ঢুকিয়ে কৃষকের জমি নষ্ট করবে। অন্য দিকে সেই নদীতেই ডলফিন দেখানোর জন্য পর্যটকের জলযান ছুটবে। একদিকে মাছ ধরতে গিয়ে বিপদে পড়েন জেলে। অন্য দিকে পর্যটকের জন্য নদী হবে ‘অ্যাডভেঞ্চার’। এই বৈপরীত্য ভাবায়।
সুন্দরবনে পর্যটন থাকবে না, কেউ বলে না। পর্যটন মানুষের আয়ের এবং আনন্দের একটি ক্ষেত্র। কিন্তু কী ধরনের পর্যটন, কার নিয়ন্ত্রণে, কার স্বার্থে এবং তার পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য কত? এ সব ভাবা কি জরুরি নয়?
২০২৬-’২৭ অর্থবর্ষে রাজ্যের পর্যটন দফতরের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৫২৫.৯২ কোটি টাকা। এই টাকায় কী উন্নয়ন হবে? এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে কোন বিষয়গুলি?
জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিলে প্রথমে বাঁধ, হাসপাতাল, পানীয় জল, শিক্ষা, যোগাযোগ ও জীবিকা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা জরুরি। এই নূ্যনতম প্রাথমিক প্রয়োজনগুলি, নাকি পাঁচতারা পর্যটন– সরকারের অগ্রাধিকার কোনটা?
পশু সংরক্ষণ চাই, কিন্তু মানুষকে বাদ দিয়ে কি?
সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা নিয়ে কোনও আপস হতে পারে না। বাঘ বাঁচাতে হবে, ম্যানগ্রোভ বাঁচাতে হবে, নদী-খাঁড়ি বাঁচাতে হবে। কারণ এর সঙ্গে সামগ্রিক ভাবে পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন জড়িত। সুন্দরবন শুধু পশ্চিমবঙ্গের নয়, সমগ্র পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সম্পদ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের কোর এলাকা প্রায় ১৭০০ বর্গ কিলোমিটার এবং বাফার এলাকা ৮৮৫ বর্গকিলোমিটারের বেশি।
সম্প্রতি সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের পরিসর আরও বাড়ানোর উদ্যোগও হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই ‘প্রায় ১,৫০০ বর্গকিলোমিটার নতুন কোর এলাকা’ নিয়ে যে আলোচনা ছড়িয়েছে, তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য সরকারি বিজ্ঞপ্তি এখনও সামনে নেই। তাই নানা গুজব চলছে। সঠিক তথ্য চাই। কিন্তু আরও বেশি করে চাই একটি নীতিগত উত্তর।
সংরক্ষণ কি মানুষের বিরুদ্ধে হবে, নাকি মানুষকে সঙ্গে নিয়েই হবে? সুন্দরবনের মানুষ পরিবেশ প্রকৃতি রক্ষার গুরুত্ব বোঝেন। তাঁরাই এই প্রকৃতির সঙ্গে শতাব্দীর সম্পর্ক বহন করে চলেছেন। ফলে প্রকৃতিধ্বংসী প্রকল্প তারা মানবেন কেন?
পর্যটন প্রকল্পের পক্ষে সবচেয়ে আকর্ষণীয় যুক্তি, স্থানীয় কর্মসংস্থান। এটিও গভীরে ঢুকে পর্যালোচনা জরুরি। ধরা যাক, সত্যিই কিছু স্থানীয় মানুষকে চাকরি দেওয়া হল। কিন্তু একজন জেলে যে নিজের নৌকা নিয়ে নদীতে যান, তাঁর জীবিকা যদি পর্যটনের নিয়মে সংকুচিত হয়, তা হলে? একজন মৌয়াল যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বন থেকে মধু সংগ্রহ করেছেন, তাঁর বন-প্রবেশে যদি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়? একজন কৃষককে যদি নোনা জল ঢোকানোর পরিণামে জমির বন্ধ্যাত্বের কারণে জমি হারাতে বাধ্য করা হয়? হোটেলের চাকরি কি সেই ক্ষতির সম্পূর্ণ বিকল্প হতে পারে? তা ছাড়া উচ্ছিন্ন এই মানুষগুলিই যে চাকরি পাবে তার গ্যারান্টি কী?
স্বাধীন জীবিকা হারিয়ে মজুরে রূপান্তর, এ নিয়েও নানা আশঙ্কা
বড় পুঁজি এলে শুধু কত টাকা বিনিয়োগ হবে, কত চাকরি হবে, এই হিসাব যথেষ্ট নয়। কার জমি যাবে, কার জীবিকা যাবে, কার হাতে মালিকানা থাকবে, আর লাভের কতটা কার কাছে থাকবে। সেই হিসাবও করতে হয়। সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও তাই প্রশ্নটি কেবল কর্মসংস্থানের নয়। কর্মসংস্থানের মালিকানা কার? জমির নিয়ন্ত্রণ কার? পর্যটনের মুনাফা কার? বন, নদী ও মানুষের সম্পর্ককে শুধু ‘বিকল্প জীবিকা’ দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।
মৌ-চাষ বা বাক্সে মধু উৎপাদনের মতো নতুন উদ্যোগ অবশ্যই থাকতে পারে। কিন্তু সেটি যেন এমন ভাবে চাপিয়ে দেওয়া না হয় যাতে বননির্ভর ঐতিহ্যবাহী মৌয়াল ধীরে ধীরে নিজের অধিকার হারান। কারণ প্রশ্নটি মধু উৎপাদনের পদ্ধতি নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হল, মানুষের নিজের জীবিকা বেছে নেওয়ার অধিকার থাকবে কি না।
সুন্দরবন কি মুনাফার নতুন মানচিত্র?
সুন্দরবনকে বড় পর্যটন বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে দেখার ইতিহাস নতুন নয়। ২০০১ সালে সাহারা ইন্ডিয়া সুন্দরবনের দ্বীপে পর্যটন রিসর্ট তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে লড়াই করে দ্বীপবাসী সরকারি সিদ্ধান্তের বদল ঘটিয়েছিল। আজ আবার ৯৯ বছরের লিজ, বেসরকারি বিনিয়োগ, পাঁচতারা রিসর্ট, ডলফিন পর্যটন, ধর্মীয় পর্যটন– সব মিলিয়ে নতুন এক পর্যটন অর্থনীতির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হচ্ছে। এখানে সতর্ক হওয়ার কারণ আছে।
পুঁজির চোখে নদী হতে পারে মুনাফার জলপথ, বন হতে পারে পর্যটন সম্পদ, দ্বীপ হতে পারে বিনিয়োগের জমি, আর বাঘ হতে পারে পর্যটকের আকর্ষণ। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের কাছে নদী বেঁচে থাকার অন্ন। বন তাদের জীবিকা। জমি তাদের জীবন। সুন্দরবন আবাসস্থল। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতটা বিপরীত শ্রেণি স্বার্থের।
বনবিবির দেশে বিভেদের রাজনীতি নয়
সুন্দরবনের মানুষের সংস্কৃতির গভীরে বনবিবি ও দক্ষিণ রায়কে ঘিরে হিন্দু-মুসলমানের দীর্ঘ সহাবস্থান রয়েছে। জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালির কাছে বনের বিপদ ধর্মের দেওয়াল মানে না। তাই ধর্মীয় পর্যটনের নামে যদি এই ঐতিহ্যকে বাণিজ্যিক প্রদর্শনীতে পরিণত করা হয় কিংবা ধর্মীয় মেরুকরণের ক্ষেত্র তৈরি হয়, তা হলে তার ক্ষতি সংস্কৃতির, ক্ষতি মানুষের ঐক্যের। যে ঐক্য নিয়ে জেলে নদীতে যায়, যে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় মানুষ বাঁধ রক্ষা করে, যে ঐক্য নিয়ে বিপদের দিনে একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়, সেই ঐক্যই সুন্দরবনের শ্রমজীবী মানুষের শক্তি। সেই ঐক্য ভাঙতে দেওয়া চলে না। উন্নয়নটা এমন হোক যেখানে বাঘও বাঁচবে, মানুষও বাঁচবে। ‘বাঘ বনাম মানুষ’-এর মিথ্যা দ্বন্দ্ব কাঙিক্ষত নয়। উন্নয়নের ধারণা যথাযথ হওয়া দরকার।
উন্নয়ন মানে শুধু পাঁচতারা হোটেল নয়। উন্নয়ন মানে ভাঙা বাঁধ মেরামত। দ্বীপে হাসপাতাল নির্মাণ। নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহ। কৃষকের জমি রক্ষা করা। জেলে-মৌয়ালের জীবিকার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা।
সুন্দরবনের বিপন্নতায় পরিবেশ সচেতন মানুষের দাবি– সুন্দরবনে কোনও বড় পর্যটন প্রকল্পের আগে পূর্ণ পরিবেশগত ও সামাজিক সমীক্ষা করতে হবে, স্থানীয় জেলে, মৌয়াল, কৃষক, শ্রমিক, পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত ছাড়া কোনও প্রকল্প নয়, সংরক্ষণের নামে ঐতিহ্যবাহী জীবিকা ধ্বংস করা চলবে না, মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের ভিত্তিতে উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে, পাঁচতারা পর্যটনের আগে সুন্দরবনের বাঁধ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানীয় জল, যোগাযোগ ও জীবিকার নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, ৯৯ বছরের লিজ বা বেসরকারি বিনিয়োগের কোনও প্রস্তাব থাকলে তার সমস্ত শর্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদের উপর মানুষের অধিকার খর্ব করা চলবে না।
সুন্দরবন কোনও ‘প্রকল্প এলাকা’ নয়। কোনও ‘বিনিয়োগের সুযোগ’ নয়। কোনও পাঁচতারা হোটেলের পেছনের দৃশ্যও নয়। সুন্দরবন মানে, নদীর সঙ্গে লড়াই করা মানুষ, বাঘের ভয়কে সঙ্গে নিয়ে বনে যাওয়া মৌয়াল, ঝড়ের রাতে বাঁধ আঁকড়ে থাকা পরিবার, নোনা মাটিতে ফসল ফলানোর চেষ্টা, আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক কঠিন সহাবস্থান।
তাই আজ প্রশ্ন তুলতেই হবে, সুন্দরবন কার? যে মানুষের ঘাম এই মাটিতে মিশে আছে, যে মানুষের চোখের জলে এই নদী নোনা হয়েছে, যে মানুষের জীবন এই বন-নদীর সঙ্গে বাঁধা সুন্দরবনের উন্নয়নে প্রথম অধিকার তাঁদের। মুনাফার জন্য সুন্দরবন নয়। মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের সুন্দরবন চাই। বাঘ বাঁচুক, বন বাঁচুক, নদী বাঁচুক, সুন্দরবনের মানুষও বাঁচুক। নিজের অধিকার নিয়ে, নিজের মাটিতে, মাথা উঁচু করে। কারণ সুন্দরবনের লড়াই শুধু পরিবেশের লড়াই নয়। এ লড়াই জীবন-জীবিকার লড়াই।