Breaking News

জাতীয় শিক্ষানীতির ছয় বছরঃ স্কুলশিক্ষায় প্রাপ্তির ভাণ্ডার শূন্য

 ফাইল ফটোঃ তুফানগঞ্জ ২০২০

ছ’বছর আগে ২৯ জুলাই জাতীয় শিক্ষানীতি-২০২০ কার্যকর হয়েছিল। স্কুল শিক্ষার আমূল পরিবর্তন ঘটানোর কথা বলে। ১০+২-র পরিবর্তে ৫+৩+৩+৪ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। অনেক গালভরা যুক্তি সাজিয়ে বলা হয়েছিল, ‘শিশুদের মস্তিষ্কের ক্রমবিকাশের ৮৫ শতাংশই ঘটে ৬ বছরের আগে’ (জাতীয় শিক্ষানীতি, প্যারা ১.১)। তাই ৩-৬ বছর সময়ে ‘মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ও সুস্থ বিকাশের জন্য প্রাক শৈশব যত্ন ও শিক্ষা’-র পক্ষে জোরালো সওয়াল করা হয়েছিল। প্রথম ৫ বছর ‘ভিত্তিস্তর’– যার প্রথম ৩ বছর হল প্রাক-প্রাথমিক ও পরের ২ বছর প্রাথমিক স্কুলের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি। প্রাক-প্রাথমিকের পরিকল্পনা বহুবিধ– ‘বর্ণ, ভাষা, যোগ, বিয়োগ, বিভিন্ন রঙ, আকারের ধারণা, ইনডোর ও আউটডোর খেলা, যুক্তিগ্রাহ্য চিন্তা, সমস্যা সমাধান, অঙ্কন, চিত্র এবং অন্যান্য ভিসুয়াল আর্ট, নাটক, পুতুল নাচ, গান প্রভৃতি উপাদান থাকবে এই শিক্ষায়’ (ওই, প্যারা ১.২)।

৬ বছর বয়সের আগে শিশুকে বাধ্যতামূলক ভাবে স্কুলে ভর্তির প্রস্তাব বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। তার ভাল বা খারাপ দিক নিয়ে আলোচনা চলতে পারে। কিন্তু গোল বেধেছে অন্য জায়গায়। প্রাক-শৈশবের জন্য সরকারি কোনও স্কুল নেই। বিকল্প হিসাবে সুপারিশ করা হয়েছে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র। কিন্তু এই কেন্দ্রগুলি স্কুল নয় এবং শিক্ষা দফতরের অধীনেও নয়। এগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের নারী ও শিশুকল্যাণ দফতরের পরিচালনায় ৬ বছরের নিচের শিশু, প্রসূতি মায়েদের সুষম খাদ্য প্রদানের কেন্দ্র। এর কর্মী ও সহায়িকাদের শিক্ষাদানের কোনও প্রশিক্ষণ নেই। কেন্দ্রগুলির দুরবস্থার কথা অবিদিত নয়– কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রধানত ভাঙা বাডি, ফুটো ছাদ ও অস্বাস্থ্যকর খাবার। এমন দুর্বল পরিকাঠামোয় কর্মী ও সহায়িকারা ইনডোর ও আউটডোর খেলা, অঙ্কন, চিত্র, ভিসুয়াল আর্ট, নাটক, পুতুল নাচ ইত্যাদির ব্যবস্থা করবেন কী করে?

শিক্ষানীতির বয়ানে আছে, ‘‘(ক) স্বতন্ত্র অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, (খ) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, (গ) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় (অন্তত ৫-৬ বছর বয়সের শিশুদের জন্য), (ঘ) স্বতন্ত্র প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়’’ প্রভৃতি গড়ে তোলা হবে (ওই, প্যারা ১.৪)। গত ৬ বছরে এমন একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সারা দেশের কোথাও কি গড়ে উঠেছে? প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে কী বলা হয়েছে? ‘এই সমস্ত বিদ্যালয়ে নিযুক্ত কর্মী ও সহায়িকারা প্রাক শৈশব যত্ন ও শিক্ষার শিখন পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রমের উপর বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হবেন’’ (ওই, প্যারা ১.৪)। তাঁদের জন্য দুই স্তরের অনলাইন প্রশিক্ষণের সুপারিশ ছিল। কিন্তু এই প্রশিক্ষণ গত ছয় বছরে হল কোথায়? তা হলে তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী ‘শিশু মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ও সুস্থ বিকাশের’ কারিগর কারা হবেন? অপুষ্টিতে ভুগলে শিশু ‘‘সন্তোষজনক শিক্ষা লাভ করতে পারে না’’– শিক্ষানীতিতে এমন কথা উল্লেখ করে ‘‘মিড ডে মিলের পাশাপাশি পুষ্টিবর্ধক প্রাতরাশের’’ প্রস্তাব ছিল, লোভনীয় খাদ্যতালিকারও বিধান ছিল। কী নিষ্ঠুর পরিহাস! প্রাতরাশ দূর অস্ত, স্কুলের মিড ডে মিলে ডিম জুটবে কি না তা নিয়েও এই রাজ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ায় প্রতিবাদ হয় এবং অনেক গড়িমসির পর বাধ্য হয়ে সরকার ডিমের আলাদা ব্যবস্থা করেছে।

স্কুলছুট এ দেশে একটি জটিল সমস্যা। উদ্বিগ্ন শিক্ষানীতি প্রণেতারা সমাধানের উপায় বাতলেছিলেন– যারা ‘ড্রপআউট হয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে ড্রপআউট হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাদের জন্য দু’ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। প্রথমটি হচ্ছে প্রাথমিক স্তর থেকে দ্বাদশ মান পর্যন্ত প্রতিটি বিদ্যালয়ের সঠিক পরিকাঠামোর ব্যবস্থা করা, যেখানে প্রতিটি শিশু সুরক্ষিত ও আকর্ষণীয় পরিবেশ পায়’। ‘সুরক্ষিত ও আকর্ষণীয়’ পরিকাঠামোর উদাহরণ কেমন? কিছু দিন আগে বিজেপি শাসিত রাজস্থানে একটি স্কুলের ছাদ ভেঙে ৭ ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছে ২৮ জন। ওই ঘটনার পর সরকার নড়েচড়ে বসে ৬৩ হাজার স্কুলের পরিকাঠামোর উপর একটা সমীক্ষা করে যে রিপোর্ট দেয় তাতে চক্ষু চড়কগাছ– ৮৬ হাজার ৯৩৪টি শ্রেণিকক্ষ বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। একটি বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যম গত বর্ষায় দেখিয়েছিল বিহারের বহু স্কুলের ঠিকানা ‘পেড় কে নিচে’। এই বর্ষায় হরিণঘাটার একটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুল জল থৈ থৈ অবস্থার জন্য কয়েকদিন বন্ধ রয়েছে।

কিন্তু স্কুল-ছুট বন্ধের এত পরিকল্পনা সত্ত্বেও ছবিটা কি পাল্টেছে? সংসদের গত শীতকালীন অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে ভয়ানক তথ্য উঠে এসেছে। নারী ও শিশু উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রীর উত্তর থেকে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে দেশে ৬৫.৭ লক্ষ শিশু স্কুল ছেড়েছে, যার প্রায় অর্ধেক ২৯.৮ লক্ষ হল কিশোরী। রাজ্যভিত্তিক তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে গুজরাটে প্রায় ২.৪ লক্ষ শিশু স্কুলছুট হয়েছে যা দেশে সর্বাধিক। এর মধ্যে ১.১ লক্ষ কন্যা শিশু। ২০২৪ সালে সেখানে স্কুলছুট শিশুর সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৪,৫৪১ জন, অর্থাৎ এক বছরে এই বৃদ্ধি ৩৪০ শতাংশেরও বেশি। গুজরাটের মতো ‘হাই প্রোফাইল’ রাজ্যে হঠাৎ করে এই বিপুল বৃদ্ধি সকলকে বিস্মিত করেছে। এর পরেই রয়েছে আসাম, যেখানে মোট দেড় লক্ষাধিক শিশু শিক্ষাঙ্গনের বাইরে চলে গেছে, যার মধ্যে ৫৭,৪০৯ জন মেয়ে। উত্তরপ্রদেশে স্কুলছুট শিশুর সংখ্যা ৯৯,২১৮, যার মধ্যে ৫৬,৪৬২ জন কিশোরী। অথচ শিক্ষানীতিতে লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়েছিল– ‘‘মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে বেশি নজর দিতে হবে যাতে তারা বিদ্যালয়ের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে না ফেলে’’। নীতি আয়োগের সাম্প্রতিকতম রিপোর্ট বলছে– ‘প্রাথমিকে স্কুলছুটের হার ০.৩ শতাংশ হলেও, মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছতেই এক লাফে তা ১১.৫ শতাংশে ছুঁয়েছে’। পরিসংখ্যানগুলি কি যথেষ্ট উদ্বেগজনক নয়?

শিক্ষানীতিতে প্রতিশ্রুতি ছিল– ‘সরকারি বিদ্যালয়গুলির গ্রহণযোগ্যতা পুনরুজ্জীবিত করা হবে বর্তমান বিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামোর মানোন্নয়ন ও আপগ্রেডেশনের মাধ্যমে’। বাস্তব কিন্তু উল্টো কথা বলছে। একটা ধারণা সুপরিকল্পিত ভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে– সরকারি স্কুলের পরিকাঠামোর হাঁড়ির হাল, পঠন-পাঠনের পরিবেশের অভাব এবং সর্বোপরি শিক্ষক নেই। আসাম বিধানসভায় রাজ্য সরকার জানিয়েছে, ‘স্কুলগুলোতে ৬০,০৩২টি শিক্ষকপদ শূন্য এবং ৭,৯৪৮টি স্কুলে নির্ধারিত ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত নেই’। পশ্চিমবঙ্গের অবস্থাটা কী? ২০২৩ সালে পূর্বতন শিক্ষামন্ত্রী বিধানভায় বলেছিলেন, প্রাথমিকে শূন্যপদের সংখ্যা ১ লক্ষ ৮৯ হাজার, যার পরে বাস্তবে কোনও নিয়োগ হয়নি। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এই সংখ্যা ৬০ হাজারেরও বেশি। শূন্য শিক্ষক পদ সম্পর্কিত অবস্থাটি সব রাজ্যেই সমান। অথচ ছয় বছর আগে জাতীয় শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছিল– ‘‘অতি সত্বর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শিক্ষক শূন্যতা বা স্বল্পতা দূর করা হবে’’ (প্যারা ২.৩)। কিন্তু হায়! ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও ‘অতি সত্বর’ সময়টি আজও এল না! ফলে নিম্নবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরাও পকেট খালি করে ছুটছেন বেসরকারি স্কুলের দরজায়। ফলে সরকারি স্কুলে ছাত্র কমছে, কিছু দিন পর স্কুলগুলিই বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, অথবা দূরের কোনও স্কুলের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ রাজ্যে ৮,২০৭টি সরকারি স্কুল বন্ধ হয়েছে। নীতি আয়োগ বলছে, ‘গত এক দশকে দৈনিক গড়ে ২৫টি করে স্কুল বন্ধ হয়েছে’। ‘২০১৪-১৫ সালে দেশের ১১.০৭ লক্ষ সরকারি স্কুল ২০২৪-২৫ সালে কমে হয়েছে ১০.১৩ লক্ষ। সরকারি স্কুলে ছাত্র ভর্তির সংখ্যা প্রায় ২.২৬ কোটি কমেছে’। উল্টো দিকে বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা ‘‘২.৮৮ লক্ষ থেকে বেড়ে ৩.৩৯ লক্ষ হয়েছে’’। ফলে অভিভাবকদের শিক্ষার জন্য চড়া মূল্য গুনতে হচ্ছে। এ সবই কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের শিক্ষানীতির পরিণাম।

অথচ শিক্ষানীতির ছত্রে-ছত্রে ‘মিশন’, ‘গোল’, ‘টার্গেট’ শব্দগুলো ব্যবহার হয়েছিল। জাতীয় শিক্ষানীতিকে গ্রহণীয় করার জন্য যে ওই শব্দবন্ধগুলি প্রয়োগ হয়েছিল তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ওই শিক্ষানীতি যে সরকার পোষিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে শিক্ষার বেসরকারিকরণের রাস্তাকে মসৃণ করেছে তা আজ আমাদের কাছে জলের মতো পরিষ্কার। ছয় বছরের মাথায় এটাও পরিষ্কার, জাতীয় শিক্ষানীতির বয়ানটি ছিল মানুষকে বিভ্রান্ত করার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।