
এক সময়ে মন্দির উদ্বোধন করতেন, মসজিদের শিলান্যাস করতেন ধর্মীয় গুরুরা। এখন তাঁদের জায়গা দখল করে নিয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। রাজ্যে এ কাজ শুরু করেছিল বিজেপি, এখন এই বৃত্তে ঢুকে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক দখল-পুনর্দখলের লড়াইয়ে মন্দির-মসজিদ এখন তুরুপের তাস। ভোট যত এগিয়ে আসছে ততই রাজনৈতিক নেতাদের মন্দির-মসজিদের শিলান্যাসে চাপা পড়ে যাচ্ছে মানুষের জীবনের প্রকৃত সমস্যাগুলো। রামমোহন বিদ্যাসাগরের সুমহান সংগ্রাম নবজাগরণের যে আলোকবর্তিকা জ্বালিয়েছিল, তা নির্বাপিত হতে চলেছে। শিলিগুড়ির উপকণ্ঠে মাটিগাড়ায় লক্ষ্মী টাউনশিপে গত ১৬ জানুয়ারি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী সতেরো একর জমির উপর শিলান্যাস করলেন মহাকাল মন্দিরের। ‘হর হর মহাদেব, রক্ষা করো মহাদেব’ স্লোগান তুলে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন। সেখানে শিবের যে মূর্তিটি গড়া হবে তা হবে ২১৬ ফুট উঁচু। আরও নানা মূর্তি, মন্দির, ধর্মীয় মিউজিয়াম হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দশ হাজার পুণ্যার্থী সমাগমের ব্যবস্থা থাকবে। ধর্ম পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে এই মন্দির বিশ্বের পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা হবে, একে ভিত্তি করে নতুন কর্মসংস্থান ঘটবে, অর্থনীতি চাঙ্গা হবে।
ঠিক এই ধরনের কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কয়েক বছর আগে অযোধ্যায় রাম মন্দির প্রতিষ্ঠা করার সময় বলেছিলেন। তাতে বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ অর্থনীতি কতটুকু চাঙ্গা হয়েছে, কত কর্মসংস্থান হয়েছে সেটা সমীক্ষার বিষয়। কিছুদিন আগে দিঘাতেও পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের আদলে মুখ্যমন্ত্রী সরকারি টাকা খরচ করে জগন্নাথ মন্দির করেছেন। সেখান থেকে প্রসাদের প্যাকেট দলীয় কর্মীদের দিয়ে গোটা রাজ্য জুড়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি পৌঁছনোও হয়েছে। মন্দিরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় স্তরে ধর্মকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যও কিছু হতে পারে। কিন্তু এটাকে কর্মসংস্থানের তকমা দেওয়া কি মানুষকে ধোঁকা দেওয়া নয়?
মন্দির নির্মাণের এই প্রতিযোগিতার মধ্যেই মুর্শিদাবাদে কয়েক মাস আগে শিলান্যাস হল বাবরি মসজিদের। ধর্মীয় ধারণা অনুযায়ী ৩৩ কোটি দেবদেবীর দেশে মন্দিরের কোনও অভাব সাধারণ মানুষ কখনও অনুভব করেননি। এলাকায় এলাকায় অজস্র মসজিদ। তারও অভাব জনসাধারণের মধ্যে খুব একটা লক্ষ করা যায়নি। অথচ দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক নেতারা ধর্মকে রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যম করে ফেলছেন। একদা বিজেপি করা, সাসপেন্ড হওয়া তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীর মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে বাবরি মসজিদের শিলান্যাস করলেন। এই মসজিদ নির্মাণের দাবি জনসাধারণের থেকে আসেনি, মন্দির নির্মাণের দাবিও জনসাধারণের থেকে ওঠেনি। এই প্রতিযোগিতার সিকি ভাগ আয়োজন যদি হত উত্তরবঙ্গে চিকিৎসা পরিষেবার উন্নতিতে, মানুষ খুশি হত।
উত্তরবঙ্গে জরুরি এইমস-এর মতো উন্নত মানের হাসপাতাল। কিন্তু সেটা হয়নি। উত্তরবঙ্গের সাতটি জেলার প্রান্ত-প্রত্যন্ত থেকে চিকিৎসার প্রয়োজনে সাধারণ মানুষকে কলকাতায় ছুটে আসতে হয়। চিকিৎসার এই যে দুর্ভোগ, তার অবসানের জন্য জরুরি ছিল উত্তরবঙ্গের প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালগুলির সার্বিক উন্নতি। কিন্তু তার কোনও তৎপরতা উত্তরবঙ্গ থেকে বহু আসনে বিজয়ী বিজেপির সাংসদ, বিধায়কদের যেমন দেখা যাচ্ছে না, তেমনি অদৃশ্য মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও। কেন্দ্রের বিজেপি, রাজ্যের তৃণমূল প্রতিযোগিতা করে উন্নয়নের দিকে নজর দিলে কোনও প্রশ্নই উঠত না। কিন্তু প্রতিযোগিতা করে কে কত বড় হিন্দু, তা দেখাতে যে ভাবে মন্দির রাজনীতির আগল খুলে দেওয়া হচ্ছে, তাতে ভক্তি না ভোট, কোনটা প্রধান, এ প্রশ্ন মুখ্য হয়ে উঠছে।
কারণ শিলান্যাসের সময় নির্বাচনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর কিছুদিনের মধ্যেই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে। তারপরে বিধানসভা ভোট। এই প্রেক্ষাপটে মন্দির, মসজিদ নির্মাণের শিলান্যাস বিশেষ অর্থবহ। মন্দির নির্মাণের লক্ষ্য যেমন হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক সংহত করা, তেমনি রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ইমাম ভাতা, মোয়াজ্জেম ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করার লক্ষ্য মুসলিম ভোট সংহত করা। তৃণমূলের এই মুসলিম ভোটব্যাঙ্কে ভাঙন ধরাতেই যে মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদের শিলান্যাস, তা বোঝা কঠিন নয়।