Breaking News

গ্রেট নিকোবর প্রকল্পে বিপন্ন জনজাতি মানুষের জীবন ও পরিবেশ

নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ভারত মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কতকগুলি ক্ষুদ্র দ্বীপের সমষ্টি। ভারত সরকার এই দ্বীপপুঞ্জে গড়ে তুলছে ৯০ হাজার কোটি টাকার গ্রেট নিকোবর প্রকল্প, যাতে ধ্বংস হবে একটি বিস্তৃত অঞ্চলের অরণ্য ও বাস্তুতন্ত্র, বিপন্ন হবে জনজাতি মানুষের জীবন। প্রশ্ন উঠছে, উন্নয়নের নামে প্রকৃতির এই নির্বিচার ধ্বংস কি সত্যিই উন্নয়ন? এর ফলে আদতে লাভ হবে কাদের, ক্ষতিগ্রস্তই বা হবে কারা?

১৬৬ বর্গ কিলোমিটার অর্থাৎ মোট জমির প্রায় ১৮ শতাংশ অঞ্চল জুড়ে তৈরি হতে চলা গ্রেট নিকোবর প্রকল্পের উদ্দেশ্য একটি সুবিশাল অত্যাধুনিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর তৈরি করা। সেখানে পণ্য স্থানান্তরের পাশাপাশি গড়ে উঠবে প্রতিরক্ষা আউটপোস্ট। সেই সঙ্গে তৈরি হবে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, উপনগরী, বিলাসবহুল শহর, পর্যটন কেন্দ্র এবং গ্যাস ও সৌরশক্তি চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র।

অরণ্যবাসী কিছু সংরক্ষিত উপজাতি সহ বহু বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বাস এই নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই ধরনের প্রকল্প ঘোষণা করায় আতঙ্কিত হয়েছেন নিকোবরের জনগণ থেকে পরিবেশবিদ– সকলেই। উন্নয়নের ঝকমকে বিজ্ঞাপনের আড়ালে পরিবেশ ধ্বংসের কালো ছায়া লক্ষ করছেন তাঁরা। সাধারণ মানুষও বারবার এ বিষয়ে সরব হয়েছেন। অভিযোগ উঠছে, এই দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল প্রকল্পটি ঘোষণার আগে পরিবেশবিদ, অর্থনীতিবিদ বা প্রযুক্তি-বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হয়নি। এমনকি আলোচনা করা হয়নি নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীদের সঙ্গেও। প্রশাসনের তরফে নিকোবরের জনগণকে পুনর্বাসন দেওয়ার একটি পরিকল্পনার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা তাদের আশঙ্কা আরও বৃদ্ধি করেছে।

হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলে বাস করছেন ‘শম্পেন’ নামক একটি সংরক্ষিত উপজাতি। রয়েছেন নিকোবরিরাও। সরকার উপজাতিদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে বললেও আন্তর্জাতিক জনজাতি-বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই প্রকল্পের ফলে শম্পেন উপজাতি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে বহু যুগ ধরে তেমন যোগাযোগ না থাকায়, এই উপজাতির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। এই বিপুল নির্মাণকাজ উপলক্ষে বাইরে থেকে তিন লক্ষেরও বেশি মানুষের আগমনের ফলে তাদের থেকে সংক্রমিত নানা রোগব্যাধিতে বিপন্নতার মুখে পড়বে এই উপজাতির মানুষজন।

২০০৪ সালের সুনামি-পরবর্তী সময়ে নিকোবরি উপজাতিকে পশ্চিম উপকূল থেকে পূর্ব উপকূলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কথা দেওয়া হলেও পরে আর তাদের পুরনো জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। এখন তাদের পশ্চিম উপকূলের বাসভূমির ওপরই গড়ে উঠতে চলেছে বিশালাকার প্রকল্প। কাজেই নিকোবরি জনজাতির ভবিষ্যত নিয়েও সংশয় থেকে যাচ্ছে।

শুধু কি জনজাতি! নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রকৃতির উপরেও নেমে আসতে চলেছে ভারসাম্যহীন উন্নয়নের কুফল। জিওলজিক্যাল সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ২০ হাজারের বেশি কোরাল কলোনি রয়েছে ওই উপকূলবর্তী অঞ্চলে। রয়েছে লেদারব্যাক প্রজাতির কচ্ছপের ডিমপাড়ার সংরক্ষিত অঞ্চল। এই বিরল প্রজাতির কচ্ছপ জন্মের পর যেখানেই যাক না কেন, ডিম পাড়তে ফিরে আসে সেই জায়গায়, যেখানে তাদের জন্ম হয়েছিল। ভারতে ওদের সবচেয়ে বড় প্রজননস্থল এখানকার গালাথিয়া সমুদ্রতট। নিকোবরে এই প্রকল্প হলে হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে প্রবাল প্রাচীরগুলি, ধ্বংস হয়ে যাবে ম্যানগ্রোভ অরণ্য সহ বহু দুষ্প্রাপ্য বৃক্ষ। প্রায় দশ লক্ষ গাছ কাটা হতে পারে বলে প্রাথমিক অনুমান।

২০২৩ সালে উচ্চ পর্যাযের একটি কমিটি এই প্রকল্পটিকে ছাড়পত্র দেয়। প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাবের মূল্যায়ন করা হয়েছে কেন্দে্রর বিজেপি সরকারের তরফ থেকেও। তাতে বাতিল করা হয়েছে বহু বছর ধরে চালু থাকা ইউনেস্কোর সুরক্ষা কবচ। যদিও ভারতের পরিবেশ সুরক্ষা আইন, ১৯৮৬-র ৩ নং ধারা অনুযায়ী কোস্টাল রেগুলেশন জোন-১-এর অন্তর্ভুক্ত এলাকায় অর্থাৎ পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল এলাকায়, যেখানে ম্যানগ্রোভ, প্রবাল প্রাচীর এবং কচ্ছপের ডিম পাড়ার স্থান প্রভৃতি রয়েছে সেখানে কোনও রকম নির্মাণ কাজ চালানো সম্ভব নয়। তবুও এমনই তালিকার অন্তর্ভুক্ত গ্যালাথিয়া উপকূলে বেআইনিভাবে চলবে এই নির্মাণকার্য।

প্রশ্ন উঠছে, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এলাকায় প্রকৃতি ও উপজাতি গোষ্ঠীর মানুষের বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা সত্তে্বও এই প্রকল্প সরকার অনুমোদন করল কার স্বার্থে! দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের উন্নয়নের স্বার্থে, না কি উন্নয়নের নামে বিশেষ একটি পুঁজিগোষ্ঠীর মুনাফা-লুটের স্বার্থে? কারণ, গ্রেট নিকোবর প্রকল্পটি রূপায়ণের মূল দায়িত্ব একটি সরকারি কর্পোরেশনের হলেও শোনা যাচ্ছে, নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠএকচেটিয়া শিল্পপতি আদানি গোষ্ঠী এই প্রকল্পের বেশ কয়েকটি পরিকাঠামো নির্মাণের বরাত পেতে চলেছে। ফলে ‘দেশের স্বার্থ’ যে আসলে কাদের স্বার্থ তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে প্রকৃতির রূদ্ররূপে মাঝে মাঝেই অসংখ্য মানুষ মৃত্যুর মুখে পড়ছে, তাদের জীবনে বিপর্যয় নামছে। ফলে গ্রেট নিকোবর প্রকল্পের জন্য লক্ষ লক্ষ গাছ কাটার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক কারণেই প্রতিবাদ জানিয়েছেন পরিবেশবিদ, সহ শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। নিকোবরের মতো সংবেদনশীল ও ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে যে কোনও ধরনের ভারী নির্মাণকাজই অত্যন্ত বিপজ্জনক। সেই বিপদ অগ্রাহ্য করে, আদি বাসিন্দা জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষের জীবন বিপন্ন করে এবং বিপুল অরণ্যসম্পদ ধ্বংস করে ঘনিষ্ঠ পুঁজিগোষ্ঠীর মুনাফা-লুটের যে ব্যবস্থা কেন্দে্রর বিজেপি সরকার করছে, তা শুধু ভারতবাসীর প্রতিই নয়, গোটা মানবসভ্যতার প্রতিই গুরুতর অপরাধ।