
একের পর এক অগ্নিকাণ্ড– মৃত্যু, হাহাকার! আজ তারাপীঠ, তো দু’দিন পর কলকাতা! সে হতে পারে হাসপাতাল কিংবা হোটেল বা বাজার। যেখানে বহু মানুষ একসঙ্গে থাকেন, সময় কাটান, সেখানে অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনা বারবার ঘটে চলেছে। মানুষের সুরক্ষা বা নিরাপত্তার করুণ চিত্র বার বার এই সব ঘটনায় ফুটে উঠছে। সময় গড়িয়ে যায়, সুরাহা মেলে না। তাই বলে কিছুই কি হয় না? কমিটির পর কমিটি গঠিত হয়। উচ্চ পর্যায়, তারও উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন হয়। সেগুলো দু’দিন নামমাত্র সক্রিয় থাকে। তারপর যেখানের জল সেখানেই থাকে, গড়ায় না। আবার একটা ঘটনা ঘটে। আবারও বেশ কিছু দুর্মূল্য প্রাণ অকালে ঝরে যায়। সে বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা করাতে আসা ছোট শিশু সহ সাংবাদিকের পরিবার হতে পারে কিংবা বিহার থেকে আসা তরুণ, যে অন্য চাকরি না পেয়ে হোটেলে কাজ নিয়েছিল এবং এই পেশাতেই কঠোর পরিশ্রম দিয়ে, সততা দিয়ে জীবনে দাঁড়াতে চেয়েছিল– তাদের স্বপ্ন, জীবন পুড়ে ছারখার হয়ে গেল।
২০১১ সালে ৯ ডিসেম্বর ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতালে এ ভাবেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯৩ জনের মৃত্যু ঘটেছিল। পাশের বস্তির সেই ছন্নছাড়া মানুষগুলো, যাদের এই রাষ্ট্র সমাজের ময়লা বা জঞ্জাল মনে করে, তারাই নিজেদের জীবন বিপন্ন করে উদ্ধার কাজে হাত লাগিয়েছিল। বড় অগ্নিকাণ্ডের পর সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে ফায়ার অডিট করবার কথা ফলাও করে ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকরী হয় ঘোষণাকারী সরকারি মন্ত্রী-নেতারাই জানেন। জানা যাচ্ছে ফায়ার অডিট করবার মতো লোকই নাকি দপ্তরে নেই। স্বয়ং দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী এ কথা স্বীকার করে বলছেন, এরপর অন্তত যাতে নিয়মিত অডিট হয় তা তাঁরা দেখবেন। কিন্তু তাঁরা কি ভরসার সাথে এ কথা বলতে পারবেন যে, এরপর এই মর্মান্তিক ঘটনা আর ঘটবে না কিংবা যাতে না ঘটে তার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ নেওয়া হবে? নাগরিকদের সুরক্ষা গ্রহণে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করতে তাঁরা কি আন্তরিক ভাবে তৎপর হবেন? সে ভরসা অবশ্য রাখা মুশকিল। কারণ বিভিন্ন মহল থেকে একটা কথা ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, সরকারের লোক না থাকলে আউটসোর্সিং করে বেসরকারি কোম্পানিকে দায়িত্ব দিক সরকার। অর্থাৎ দমকল দপ্তরের শূন্যপদ পূরণ না করে জনস্বার্থকে বাজি রাখা হবে বেসরকারি মালিকদের কাছে! এ ক্ষেত্রে টাকা যে আসল কথা বলেবে তা জানাই আছে।
ফলে সরকার এবং তাঁর মন্ত্রী পারিষদরা নিরাপত্তার গ্যারান্টি কি সাধারণ নাগরিকদের দিতে আদৌ আন্তরিক? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, না। এর কোনওটাই সম্ভব হবে না, যদি না এর পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের আন্তরিক প্রচেষ্টা নেওয়া না হয়। ঘটনায় জানা যাচ্ছে, দুর্ঘটনাস্থলে বিপদজনক বৈদ্যুতিক তার ও সংযোগ, অপরিসর যাতায়াতের রাস্তা, উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকা এবং সময়মতো দমকল না পৌঁছনো। বেআইনি ভাবে, প্রোমোটার বা নেতাদের টাকা খাইয়ে ঝুঁকি নিয়েই দিনের পর দিন রমরমিয়ে চলছে নানা ব্যবসা। সেই ব্যবসাদারদের থেকে শাসক দলগুলির তহবিলে মোটা অঙ্কের চাঁদা চলে আসে। বেআইনি জেনেও ছোট বড় নেতারা পারমিশন দিয়ে দেয়। এই চক্করে মানুষের জীবন বিপন্ন জেনেও তা চলতে দেওয়া হচ্ছে। কোনও কমিটিতে তাই কোনও সুরাহা হয় না। দুর্ঘটনায় বারবার উঠে আসে দমকল বাহিনীর দুরবস্থার কথাও। দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ। জল আছে, পাইপ লাইন আছে কিন্তু গাড়ির চালক নেই, কর্মী নেই। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার এই ছিদ্রগুলো না সারালে কমিটি গঠনই সার হবে। সরকারি নেতারা কুম্ভীরাশ্রু ঝরাবেন, নানা প্রতিশ্রুতি দেবেন। কিন্তু কাজের কাজ হবে না। সাধারণ মানুষের জীবনে হঠাৎ করেই এ ভাবে নেমে আসবে অন্ধকার। কোথায় কোন মারণফাঁদ পাতা আছে কেউ টের পাওয়ার আগেই স্বজন হারিয়ে যাবে আমার আপনার। নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বিপর্যস্ত হবে, যদি দুর্নীতি, তোলাবাজি, কাটমানি খাওয়া চিরতরে বন্ধ না হয়।