আমিষ-নিরামিষ বিতর্ক ছেড়ে সরকার বরং দেখুক মানুষ ভাত পাচ্ছে কি না

কথায় আছে আপ রুচি খানা। অর্থাৎ আপনার রুচিমতো আপনি খাবেন। এর পর অনিবার্য ভাবে খাদ্য সম্পর্কিত যে বিষয়টা প্রয়োজনমতো মানতে হয়, তা হল ডাক্তারি পরামর্শ, পুষ্টিবিদের মতামত। গায়ের জোরে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, কোনও সুস্থ চিন্তার মানুষ মেনে নেবে না। কারণ এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে শুধু তার শরীরের ভালোমন্দ নয়, মানসিক তৃপ্তি-অতৃপ্তিও।

বাংলার রাজনীতিতে পট পরিবর্তন হয়েছে মাত্র মাস চারেক আগে। ক্ষমতায় আসার প্রায় সাথে সাথেই নতুন সরকার গায়ের জোরে উচ্ছেদ, তোলাবাজি, দখলদারি, আইন পরিবর্তন, শিক্ষাঙ্গনের মাথায় দলীয় লোকদের বসানো ইত্যাদি দলতান্ত্রিক তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝেই বিজেপি নেতৃত্বাধীন বঙ্গে প্রথম দুর্গোৎসব আসতে চলেছে এবং বিজেপি-ঘনিষ্ঠ কোনও এক ‘বাগেশ্বর বাবা’র কতকগুলো মন্তব্যে তুমুল আসর গরম হয়েছে। হাওড়ায় সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী এবং বেশ কয়েকজন বিজেপি এমএলএ সহ ভক্ত-পরিবৃত বাবাজি জোর গলায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, যাঁরা দুর্গাপুজোর সময় আমিষ খান, তাঁরা আসলে ভণ্ড। এই সব আমিষভোজীদের সমাজচ্যুত করার ডাকও সে দিন দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর এ হেন জ্ঞানবাণীতে সাধারণ বাঙালির সেন্টিমেন্টে সরাসরি কতখানি আঘাত লাগবে, তিনি যে চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্ব করছেন সেই আরএসএস-বিজেপির নেতারা জানেন না, এমন নয়। তাঁরা ভাল করেই জানেন, ঢিল ছুঁড়লে তরঙ্গ উঠবেই। এই তরঙ্গ তোলাটাই ছিল তাঁদের আসল উদ্দেশ্য। এর মধ্যে দিয়ে মার্কামারা উগ্র হিন্দুত্বের উত্তরভারতীয় সংস্কৃতিটি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী উদারবাদী সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাতে চাইছেন তাঁরা।

ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। মানুষের সংস্কৃতি ও আবেগের সাথে এ সব গভীরভাবে যুক্ত। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিবাদ করেছেন মানুষ। বাগেশ্বর বাবার গ্রেফতারির দাবিও উঠেছে। পাল্টা কেউ কেউ বলেছেন– পুজোয় ফিশফ্রাই, মাটন বিরিয়ানি খাব ইত্যাদি, ইত্যাদি।

কিন্তু আমিষ-নিরামিষের এই তরজায় অন্য একটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে, যাদের দু’বেলা পেটভরা ভাতের জোগাড় করতে পারাটাই ভীষণ কঠিন। যে হকার পরিবারগুলোর জীবিকা কেড়ে নেওয়া হল, ঝুপড়িবাসী যেসব মানুষ মাথার উপরের ছাউনিটুকুও হারাল, তারা কি এই উৎসবে আমিষ-নিরামিষ নিয়ে মাথা ঘামানোর পরিস্থিতির মধ্যে আদৌ আছে, নাকি বেঁচে থাকার, কোনওক্রমে টিকে থাকার লড়াই লড়তে জীবনপাত করে চলেছে?

জিনিসপত্রের দাম আগুন। তেল, চিনি, ডাল, রান্নার গ্যাস ইত্যাদির দাম লাগামছাড়া বাড়ছে। হেঁসেল সামলাতে, মধ্যবিত্তের পকেটেই টান। এই অবস্থায় বন্ধ কারখানার শ্রমিক, মুটে-মজুর, রিকশাচালক-ঠেলাওয়ালা, উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া ছোট দোকানদার কিংবা ফুটপাতবাসী অসংখ্য মানুষ মাছ-মাংস দূরের কথা– দু’মুঠো ভাত জোগাড় করছে কী উপায়ে! এই সমস্ত বিষয়ে প্রশ্ন ওঠা চাপা দিতেই আমিষ-নিরামিষ বিতর্ক খুঁচিয়ে তুলেছে বিজেপি।

‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ কোনও এক বাবাজির অর্বাচীন মন্তব্যের প্রতিবাদের পাশাপাশি আরএসএস-বিজেপি নেতাদের এই কৌশলকে মাথায় রাখা দরকার।

ভারত নাকি বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ, অথচ আজও এ দেশে প্রতি ৩ জন শিশুর মধ্যে ১ জন কোনও না কোনও ভাবে অপুষ্টিতে ভোগে। অপুষ্টির কারণে শিশুমৃত্যুর হার এ দেশে ৬৮-৬৯ শতাংশ। মেয়েরা, বিশেষত গর্ভবতী মহিলাদের ৫২.২ শতাংশই রক্তাল্পতার শিকার। এখনও বহু এলাকা আছে যেখানে মানুষ জঙ্গলের শাকপাতা, মাটির তলা থেকে তুলে আনা কন্দ খেয়ে বেঁচে থাকে। এই সব মানুষের কাছে আমিষ-নিরামিষ বিতর্কের কোনও মূল্য আছে কি? কিন্তু এদের নিয়ে সরকারের বিন্দুমাত্র উদ্বেগ দেখা যায় না।

 মানুষের জীবনের আসল সমস্যাগুলি সমাধানে সরকার যখন ব্যর্থ হয়, তখন তারা ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপের আশ্রয় নেয়, গায়ের জোর ফলায়। নানা কৌশলে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষকে অহরহ সেই ঘূর্ণিতে পাক খেতে বাধ্য করে, যাতে মানুষ নিজের অধিকার বুঝে নিতে প্রতিবাদী স্বর জোরালো করতে না পারে। রাজ্য সরকারের় নানা ধরনের অবাঞ্ছিত কার্যকলাপ ও হুঙ্কারে তার ছাপই দেখা যাচ্ছে।