Breaking News

পাঠকের মতামতঃ রাষ্ট্রের ব্যর্থতা হকারদের ঘাড়ে

জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, প্রত্যেকটি মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা, ন্যায্য কাজের পরিবেশ, বিশ্রাম এবং একটি উপযুক্ত জীবনযাত্রার মান (যার মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসা সেবা অন্তর্ভুক্ত) পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র যদি এগুলি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নিজের দায়িত্ব স্বীকার ও পালন না করে, তবে এটি কী ভাবে সম্ভব? স্বাধীনতার পর থেকে সরকারগুলো জনগণের কাছ থেকে কর আদায় করেছে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মিথ্যা আশা দেখিয়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতিতে তা ব্যয় করেছে। তবুও, স্বাধীনতার ৮০ বছর পরও কেন এত মানুষকে ফুটপাতে কেনাবেচা ‘স্ট্রিট ভেন্ডিং’ করতে বসতে বাধ্য হতে হচ্ছে? এর জন্য কাকে দোষ দেওয়া উচিত? সেই রাষ্ট্রকে, যা তার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, নাকি সেই সাধারণ মানুষকে, যাদের কাছে উন্নয়নের কোনও আলোই পৌঁছয়নি?

আজকে দরিদ্র মানুষ যখন কেনাবেচার জন্য সামান্য একটু সরকারি জায়গা দখল করে বসে, তখন দেখতে তা দৃষ্টিকটু লাগে। এটি যদি বেআইনিই হয়, তবে মানুষের পকেট থেকে বছরের পর বছর ট্যা’ আদায় করেও রাষ্ট্র কেন তার দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি পূরণ করার দায়িত্ব নিতে পারে না? রাষ্ট্র যদি কাজের সুযোগ তৈরি না করে, তবে তারা চাকরি পাবে কোথায়? রাষ্ট্র যদি শিক্ষা ও দক্ষতাকে সবার হাতের নাগালের মধ্যে না এনে দেয়, তবে আরও ভাল চাকরির জন্য তারা কীভাবে সেই শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করবে? স্ট্রিট ভেন্ডিং বা হকারি করাকে যদি বেআইনি মনে করা হয়, তবে রাষ্ট্রকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে এটি তার নিজের ব্যর্থতারই ফল। সেই প্রতিশ্রুতির ব্যর্থতা, যার জন্য জনগণ টাকা দিয়েছে। একই ভাবে, রাষ্ট্র সময়মতো ট্রেন এবং সরকারি বাস চালাতেও ব্যর্থ হয়েছে। যার কারণে মানুষকে তাদের উপার্জনের একটি বড় অংশ হারাতে হয়। এটা কি বেআইনি নয়?

প্রতিটি রেলওয়ে স্টেশন, বাস স্টেশন এবং প্রধান বাজারগুলোতে বহুজাতিক ব্র্যান্ডের স্যান্ডউইচ, চা, কফি, ভুজিয়া ইত্যাদি বিক্রি করা অত্যন্ত সাবলীল ও প্রভাবশালী একদল মানুষের নির্দিষ্ট কিছু দোকান দেখতে পাওয়া যায়। সেগুলো কিন্তু ভেঙে ফেলা হয় না। সেগুলো কি সব বৈধ? সরকারি জায়গা দখল করার অনুমতি তাদের কে দিয়েছে? বরং, তারা সরকারি জায়গার একটি বড় অংশ দখল করে রাখে এবং পথচারীদের প্রচুর অসুবিধা সৃষ্টি করে। দরিদ্র ও ‘আন-স্মার্ট’ হকারদের উচ্ছেদ করে বড় বড় বেসরকারি ও কর্পোরেট সংস্থাকে জায়গা করে দেওয়ার কি এটি একটি সুষ্পষ্ট পরিকল্পনা নয়?

যদি এই হকারদের বিকল্প কোনও জীবিকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হত, তবে তারা নিশ্চিতভাবেই ধীরে ধীরে এই পেশা ছেড়ে দিত। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, ভারত এখনও এমন একটি দেশ যেখানে বিপুল সংখ্যক ক্ষুধার্ত ও দরিদ্র মানুষ বাস করে, যাদের বেঁচে থাকার জন্য নূ্যনতম আয়টুকুও নেই। তাদের অনেকেই হকার। যখন তারা অন্য কোনও উপায় খুঁজে পায় না, তখন বেঁচে থাকার তাগিদে সরকারি জায়গায় দাঁড়াতে বাধ্য হয়। এটি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই দরিদ্র লোকটির লজ্জা নয়, বরং এটি রাষ্টে্রর লজ্জা, যা স্বাধীনতার ৮০ বছর পরেও একটি বিকল্প ব্যবস্থা করে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কোনও বিকল্প ব্যবস্থা না করে তাদেরকে এই পেশা থেকে জোর করে সরিয়ে দেওয়াও এক ধরনের বেআইনি কাজ।

দিব্যেন্দু মাইতি, অধ্যাপক, দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিক্স