Breaking News

তেলের দাম বিশ্বে কমলেও ভারতের মানুষের ঘাড়ে বাড়তি দামের বোঝাই

তৈলাক্ত বাঁশে ওঠা–নামা নিয়ে কে সি নাগের অঙ্ক অনেকেই জানেন৷ কিন্তু তেলের দামের ওঠা–নামা নিয়ে লাভ–লোকসানের অঙ্ক অনেকেই মিলিয়ে দেখেন না৷ তেল কোম্পানিগুলির কত ক্ষতি হচ্ছে– তা নিয়ে যখন–তখন সাফাই গেয়ে চলেছে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক৷ ইরান ও ইজরায়েল–আমেরিকার যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির সময় থেকে তেল কোম্পানিগুলির বিশাল ক্ষতির তথ্য দাখিল করছেন পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী৷ তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার থেকে কমে ৭০ ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার পরও তাদের লোকসানের কাঁদুনি অব্যাহত থেকেছে৷ এখন আবার নতুন করে যুদ্ধ শুরু ও তেলের দাম ৮৫ ডলারে ওঠায় তাদের গলার জোর আরও বেড়েছে৷ তেল কোম্পানিগুলিকে স্বস্তি দিতে কেন্দ্রীয় সরকার তেলের উৎপাদন শুল্ক্ কমিয়েছে৷ অথচ তেলের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সব জিনিসের দামবৃদ্ধিতে তাদের কী বিপুল সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, তা নিয়ে সরকারের কোনও মন্ত্রীকে উচ্চবাচ্য করতে দেখা যাচ্ছে না৷ এখানেই বিচার্য, সরকার কার স্বার্থ রক্ষা করছে–জনসাধারণের, নাকি একচেটিয়া মালিকদের?

ফেব্রুয়ারিতে ইরান–আমেরিকা যুদ্ধ লাগার পর থেকে অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে চার বারের বৃদ্ধিতে এক ধাক্কায় গ্যাসের দাম হয়েছে ৯৬৮ টাকা, কার্যত গ্রাহককে বহন খরচ ধরে ১০০০ টাকা গুনে দিতে হচ্ছে৷ পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়ে হয়েছে যথাক্রমে ১১৩.৫১ টাকা ও ৯৯.৮২ টাকা৷

যুদ্ধের প্রথম ধাপে হরমুজ প্রণালী বন্ধ ছিল, তাই তেল–গ্যাসের দাম বৃদ্ধি হয়েছিল বলে প্রচার৷ সরকারের এই যুক্তি যদি সঠিক বলে ধরে নিতে হলেও প্রশ্ণ ওঠে হরমুজ যখন খোলা ছিল, তেলের দাম অনেক কমলেও সেই সুরাহাটা সাধারণ মানুষকে সরকার দিল না কেন? সদিচ্ছা থাকলে সেই সময়টুকুতেও তো সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে দাম কমানোর জন্য তেল কোম্পানিগুলিকে নির্দেশ সরকার দিতে পারত৷ উল্টেতারা তখন যুক্তি দিয়েছে, এখন তেল–গ্যাসের দাম কমানো যাবে না৷ কারণ, তেল কোম্পানিগুলির মজুত তেল–গ্যাস দু’মাস আগে বাড়তি দামে কেনা৷ অথচ ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধের আবহে ভারতীয় তেল কোম্পানিগুলি রাশিয়া থেকে সস্তায় ব্যারেল ব্যারেল তেল কিনে কয়েক বছর যে বিপুল মুনাফা করেছে, তখনও তারা দেশের মানুষকে এতটুকু সুরাহা দেয়নি৷ উল্লেখ্য যে, তেল কোম্পানিগুলির ব্যালেন্স শিট কিন্তু লোকসানের কথা বলে না৷ সেখানে লেখা হয় ‘আন্ডার রিকভারি’ অর্থাৎ যতটা লাভ করার পরিকল্পনা ছিল ততটা করা যায়নি৷

ক্ষতির গল্প শোনানো তেল কোম্পানিগুলির ব্যালেন্স শিটের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ইন্ডিয়ান অয়েলের নিট মুনাফা ৩৬ হাজার ৮০২ কোটি টাকা৷ এই সংস্থা ও আরও দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ভারত পেট্রোলিয়াম ও হিন্দুস্থান পেট্রোলিয়াম মিলে মোট মুনাফা করেছে ৭৭ হাজার ২৮০ কোটি টাকা৷ সংস্থাগুলি গত অর্থবর্ষ থেকে দ্বিগুণেরও বেশি মুনাফা করেছে৷ বাকি সব বেসরকারি কোম্পানিও মুনাফা করেছে বিপুল৷

রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়ে মার্কিন ছাড়পত্রের জন্য তাকিয়ে বসে থাকছে কেন ভারত সরকার? আসলে এখানেও রয়েছে বৃহৎ মালিকদের স্বার্থ৷ মার্কিন দোসর হিসাবে অস্ত্র ব্যবসায় আদানি, রিলায়েন্স, টাটাদের মতো একচেটিয়া মালিকদের বাজার নিশ্চিত করতে তেলের ক্ষেত্রে ভারত সরকারকে মার্কিন চাপ কিছুটা মানতে হচ্ছে৷ এ ছাড়া ভেনেজুয়েলায় ভারতীয় তেল কোম্পানিগুলির লগ্ণির কথাও সরকারের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ৷

গ্যাস–তেল সঙ্কটের অজুহাতে গ্যাস কোম্পানিগুলি সম্প্রতি জানিয়েছে, তারা এ বার থেকে ১০ কেজির বাণিজ্যিক সিলিন্ডার বিক্রি করবে এর জন্য ১৬০০ টাকার বেশি দিতে হবে গ্রাহককে৷ এখন গৃহস্থের সিলিন্ডারে ১৪.২ কেজি গ্যাস থাকে, যার দাম ৯৬৮ টাকা৷ ধীরে ধীরে এর সরবরাহ কমিয়ে গ্যাস কোম্পানিগুলি প্রায় দ্বিগুণ দামে ১০ কেজি সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকদের বাধ্য করবে, এটাই আসল লক্ষ্য৷ যদিও ঘরে–বাইরে চাপে পড়ে আপাতত ১০ কেজির সিলিন্ডার সংযোগ বন্ধ থাকার ঘোষণা করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি৷

পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ সরকারগুলির কাছে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে৷ সম্প্রতি তিনি হুমকি দিয়েছেন, রাশিয়া থেকে ভারত তেল আমদানি করলে আমেরিকা ভারতের উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপাবে৷ এ জন্য মার্কিন কংগ্রেসে একটা বিলও পাশ করানো হচ্ছে৷ এর আগেও যে তিনি শুল্ক্যুদ্ধের খড়গ চাপিয়েছিলেন ভারত সহ নানা দেশের উপর, তা যে মার্কিন ধনকুবের একচেটিয়া তেল কোম্পানিগুলির মুনাফা–বৃদ্ধির দিকে তাকিয়ে, বলার অপেক্ষা রাখে না৷

দেশে–বিদেশে জনসাধারণের উপর শোষণের খড়গ নিয়ে নেমেছে যে একচেটিয়া পুঁজিমালিক ও তাদের স্বার্থরক্ষাকারী সরকারগুলি, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে জনসাধারণকেই৷ এ ছাড়া বাঁচার আর কোনও সহজ পথ নেই৷