
আমেরিকার কবি ল্যাংস্টন হিউজ লিখেছিলেন–
‘‘Lenin walks around the world
Frontiers cannot bar him. Neither
barracks nor barricades impede
nor does birbed wire scar him.’’
(বিশ্বব্যাপী ছুটছে লেনিন
এ-দিক থেকে সে প্রান্তে
লেনিন যাবে আটকে পথে
কোথায় তেমন সীমান্ত?)
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যর ভাবনায় লেনিন উঠে এসেছিলেন এই ভাবে–
‘লেনিন ভূমিষ্ঠ রক্তে,
ক্লীবতার কাছে নেই ঋণ
বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয়
আমিই লেনিন।’
এই ছিল বিশ্ব জুড়ে লেনিন নামের আবেদন, যা ধরা আছে এই বাংলার তথা বিশ্বের অসংখ্য কবিতা-গল্প নাটকে, বড় মানুষদের স্মৃতিচারণায়। কাজেই, দেশের সীমান্ত বা কাঁটাতার লেনিনের আবেদনকে কোথাও আটকে রাখতে পারে না। দেশে দেশে মেহনতি মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে জীবন্ত প্রেরণা হয়ে কাজ করেছে লেনিনের নাম, তাঁর শিক্ষা ও সংগ্রাম। তাঁর হাতে গড়া সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন গোটা বিশ্বের কাছে হয়ে উঠেছে বাস্তবের মাটিতে শোষণমুক্তির স্বর্গরাজ্য। আজ যখন বিজেপি এবং সংঘ পরিবার কলকাতার যাদবপুরে লেনিন মূর্তিকে আক্রমণ করে, রাজ্যের নানা জায়গায় তাণ্ডব ও গুন্ডামি চালায়, তখন প্রমাণ হয়ে যায়, আজ এই একবিংশ শতকেও লেনিনের মূর্তি ভয়ানক কাঁপন ধরাচ্ছে শাসকের বুকে। রাজ্যে রাজ্যে, দেশ জুড়ে বিজেপির অপশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ যত দানা বাঁধছে, চতুর্দিকে ফেটে পড়ছে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ-আন্দোলন, তাতে নতুন করে মেহনতি মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছে মার্ক্সবাদের প্রতি, মার্ক্সের সুযোগ্য ছাত্র রুশ বিপ্লবের রূপকার মহান লেনিনের প্রতি। সেই আকর্ষণকেই মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে মানবতার শত্রু ফ্যাসিস্টরা। আসলে সেই মার্ক্স-এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ইস্তাহারের প্রথম লাইনের মতোই, পুঁজিবাদ একমাত্র ভয় পায়, ভয় পাচ্ছে কমিউনিজমকে। তাই ওরা যত মূর্তি ভাঙবে, তত রুখে দাঁড়ানো এবং ভারত তথা বিশ্বের মানবমুক্তির ইতিহাসে লেনিন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অবদান স্মরণ করিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন প্রতিটি মানুষের কর্তব্য।
উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সঙ্কীর্ণ রাজনীতির স্বার্থে বিজেপি এবং সংঘ পরিবার আজ দেশের প্রকৃত ইতিহাস মুছে ফেলার এক ন্যক্কারজনক চক্রান্ত চালাচ্ছে। নবজাগরণের মনীষী থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামী– একের পর এক মহামানবের অবমাননা আজ গেরুয়া শিবিরের দৈনন্দিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি যাদবপুরে বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের মহান নেতা লেনিনের মূর্তিকে কেন্দ্র করে তারা যে নগ্ন গুন্ডামি ও তাণ্ডব চালাল, তা নিছক কোনও ভাস্কর্য অবমাননা নয়, এ হল এক অমোঘ আদর্শকে ভয় পাওয়ার বহিঃপ্রকাশ। এর মধ্য দিয়ে এক ধরনের মতাদর্শগত অসহিষ্ণুতা এবং সংকীর্ণতা প্রকাশ পায়। ‘লেনিন বিদেশি, ভারত গঠনে তাঁর কোনও অবদান নেই’ মূর্তি ভাঙার সপক্ষে তাদের তুলে ধরা এই যুক্তিটি যেমন হাস্যকর, তেমনই তা ইতিহাস সম্পর্কে তাদের চরম অজ্ঞতার পরিচায়ক।
আদর্শের কোনও কাঁটাতার হয় না
মূর্তি স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য সমাজ ও সভ্যতার কল্যাণে মহাপুরুষদের অবদান ও জীবন সংগ্রামকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁদের আদর্শে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা। যাঁদের চিন্তাভাবনা মানবজাতির কল্যাণে নিবেদিত, তাঁদের অবদান কোনও নির্দিষ্ট দেশের মানচিত্রে আটকে থাকে না। তা ভৌগোলিক গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র মানবজাতির সম্পদে পরিণত হয়।
তাই বিদেশের মাটিতে যেমন রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধীর মতো বিশিষ্ট ভারতীয়দের ভাস্কর্য আছে। ঠিক একই ভাবে আমাদের দেশেও শে’পিয়র, ডেভিড হেয়ার বা টলস্টয়ের মূর্তি আছে। বিদেশি হয়েও নেলসন ম্যান্ডেলা ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ভারতরত্ন’-এ (১৯৯০) ভূষিত হয়েছেন। মানবাধিকার বা সাহিত্যের প্রতীক হিসেবে বিদেশে যেমন ভারতীয়দের সম্মান জানানো হয়, ঠিক একই ভাবে সমাজতন্ত্র ও শোষিত মানুষের অধিকারের বিশ্বজোড়া প্রতীক হিসেবে মহান লেনিনকে এ দেশে সম্মান জানানো হয়। মহৎ আদর্শের এই আন্তর্জাতিক আদান-প্রদানই সভ্যতার শ্রেষ্ঠ অলংকার।
পরাধীন ভারতের মুক্তিসংগ্রাম ও লেনিন বিপ্লবীদের ধ্রুবতারা
‘ভারতের ইতিহাসে লেনিনের কোনও স্থান নেই’– এ কথা তাঁরাই বলছেন যাদের ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কোনও অবদান নেই। ১৯০৮ সালে বাল গঙ্গাধর তিলকের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে মুম্বাইয়ের শ্রমিক আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন লেনিন। লেনিনের নেতৃত্বে রুশ বিপ্লব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে গভীর প্রেরণা জুগিয়েছিল, যার উল্লেখ ব্রিটিশ দলিলেও রয়েছে। ভারতের স্বাধীনতাকামী নেতারা লেনিন ও সোভিয়েত রাষ্ট্রকে নিজেদের স্বাভাবিক মিত্র হিসেবে বিবেচনা করতেন। ১৯১৭ সালে হোমরুল কমিটির ‘রাশিয়ার উদাহরণ’ পত্রিকা এবং কংগ্রেস অধিবেশনে অ্যানি বেসান্তের বক্তব্যে ভারতে এই বিপ্লবের যুগান্তকারী প্রভাব ও তাৎপর্যের কথা তুলে ধরা হয়। অ্যানি বেসান্ত বলেছিলেন, ‘রুশ বিপ্লব এবং ইউরোপ ও এশিয়ায় রুশ প্রজাতন্তে্রর সম্ভাব্য উন্মেষ ভারতে আগেকার পরিস্থিতিগুলিকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে।’ ১৯১৮ এবং ১৯১৯ সালে মৌলভি বরকতুল্লা ও রাজা মহেন্দ্র প্রতাপের নেতৃত্বে ভারতীয় প্রতিনিধিদল ব্রিটিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মস্কোয় লেনিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে, ১৯২০ সালের ২০ মে কাবুলের ভারতীয় বিপ্লবী সম্মিলনীর এক বার্তার জবাবে লেনিন মুসলিম ও অমুসলিমদের মৈত্রীকে স্বাগত জানিয়ে তা প্রাচ্যের সকল মেহনতি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশা প্রকাশ করেন। এই সময়েই হিন্দি, উর্দু, বাংলা, মারাঠি, ইংরেজি সহ ভারতের নানা ভাষায় লেনিনের জীবনী ও অক্টোবর বিপ্লব নিয়ে প্রচুর বই প্রকাশিত হতে শুরু করে।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি শহিদ-ই-আজম ভগৎ সিং ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার ঠিক আগে লেনিনের জীবনী পড়ছিলেন। বইয়ের পাতা থেকে মুখ না তুলেই জেলারকে তিনি বলেছিলেন, ‘থামো! একজন বিপ্লবী এখন আর একজন বিপ্লবীর সঙ্গে কথা বলছে।’ লেনিনের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি সংগঠনের নাম রেখেছিলেন ‘হিন্দুস্তান সোশালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’। আন্দামানের সেলুলার জেলে বন্দি বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী লেনিনের তত্ত্বচর্চা করতেন এবং মুক্তি লাভের পর তাদের অনেকেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শে ব্রতী হয়েছিলেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আদর্শ বলে মনে করতেন এবং কংগ্রেসের সভাপতির ভাষণে বলেছিলেন– তাঁর প্রথম লক্ষ্য ভারতের স্বাধীনতা, দ্বিতীয় লক্ষ্য শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক ভারত। ১৯৩৩ সালের মে মাসে লন্ডনে পলিটিক্যাল প্ল্যানিং ফর ইন্ডিয়া ভাষণে বলেন ‘আমি সমাজতন্ত্রের পক্ষে’ কারণ আমি মনে করি এটিই ভারতের দারিদ্র, অশিক্ষা এবং শ্রেণি বৈষম্যের মতো প্রধান সমস্যাগুলো দূর করার একমাত্র পথ।’ এমনকি জহরলাল নেহেরুর মতো বুর্জোয়া নেতারাও সমাজতান্ত্রিক চিন্তার প্রভাব এড়াতে পারেননি। সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের সাফল্যে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।
শুধু সশস্ত্র বিপ্লবী বা স্বাধীনতা সংগ্রামীরাই নন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩০ সালে রাশিয়া ভ্রমণের পর তাঁর ‘রাশিয়ার চিঠি’-তে লিখেছিলেন, ‘এখানে না এলে আমার এ জন্মের তীর্থদর্শন অসমাপ্ত থাকত।’ তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘যা দেখছি আশ্চর্য ঠেকছে। অন্য কোনও দেশের মতোই নয়। একেবারে মূলে প্রভেদ। আগাগোড়া সকল মানুষকেই এরা সমান করে তুলেছে।’ মনে পড়ে, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘পিতৃস্মৃতি’তে … সেই গরিব চাষির কথা, যে বলেছিল– এ দেশে লেনিনের মতো একটা নেতা জন্মালে সব ঠিক হয়ে যেত।
রুশ বিপ্লবের বিশ্বব্যাপী প্রভাব এবং কল্যাণকামী রাষ্ট্রের উদ্ভব
রুশ বিপ্লব এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাজিত করার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার উত্থান গোটা বিশ্বের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিয়েছিল। রুশ বিপ্লবের পর থেকেই সোভিয়েত রাশিয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান এবং শ্রমিকদের অধিকারকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর ফলে পশ্চিমী পুঁজিবাদী দেশগুলো তো বটেই এমনকি ভারতের মতো সদ্য স্বাধীন পুঁজিবাদী দেশগুলোও বুঝতে পারে যে, শ্রমিক শ্রেণিকে যদি ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা, কাজের নির্দিষ্ট সময় এবং স্বাস্থ্যপরিষেবা, ন্যূনতম শিক্ষা না দেওয়া হয়, তবে তাদের দেশেও পুঁজিবাদবিরোধী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটে যেতে পারে। এই বিপ্লব ভীতি থেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্ব জুড়ে ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’ বা কল্যাণকামী রাষ্টে্রর উদ্ভব ঘটে এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পর ভারতও পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আড়ালে একটি ‘কল্যাণকামী রাষ্ট্র’ গড়ার মোড়ক নেয়। বিশ্ব জুড়ে সাধারণ মেহনতি মানুষের সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের প্রতি আকর্ষণ দেখে ভীত পুঁজিপতি শ্রেণির এ ছাড়া উপায় ছিল না। তাই না চাইলেও ভারতের শ্রমিক, কৃষক সহ সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা গণতান্ত্রিক পরিসর, কিছু অধিকার দিতে রাষ্ট্রকর্তারা বাধ্য হয়েছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যে ‘পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা’ গ্রহণ করা হয়েছিল, সেখানেও সোভিয়েত রাশিয়ার মডেল অনুকরণের চেষ্টা হয়েছিল।
সদ্য স্বাধীন ভারতের সংকট এবং নিঃশর্ত সোভিয়েত মিত্রতা
মেহনতি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং শোষিত জাতির অধিকার রক্ষার লেনিনীয় নীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভারতের পাশে নিঃশর্ত ভাবে এসে দাঁড়ায় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়া। ভারতের ভূ-রাজনৈতিক সুরক্ষায় তারা পরম মিত্রের ভূমিকা নেয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে আমেরিকার সপ্তম নৌবহরের হুমকির মুখে রাশিয়া যেমন ভারতের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তেমনি কাশ্মীর ইস্যুতেও রাষ্ট্রসংঘে একাধিকবার ‘ভিটো’ প্রয়োগ করে সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র বানচাল করে দেয়।
সদ্য স্বাধীন খাদ্যসংকটে ভোগা ভারতের কৃষিব্যবস্থাকে আধুনিক করার ক্ষেত্রেও তারা সাহায্য করেছিল। ১৯৫৬ সালে রাজস্থানের সুরাটগড়ে এশিয়ার বৃহত্তম উন্নত যন্ত্রসমৃদ্ধ কৃষি খামার গড়ে তোলার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন বিপুল পরিমাণ ট্রাক্টর ও আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম ভারতকে উপহার দিয়েছিল। সেই সময় ভারতের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য ভারি শিল্পের প্রয়োজন ছিল। লেনিনের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় ভিলাই ও বোকারোর মতো বৃহৎ ইস্পাত কারখানা তৈরি হয়। তাদেরই কারিগরি সহায়তা, অত্যাধুনিক ড্রিলিং রিগ সরবরাহ এবং বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনায় গুজরাট (অঙ্কলেশ্বর, ক্যাম্বে) এবং আসামে তেল আবিষ্কৃত হয়। মূলত সোভিয়েত বিশেষজ্ঞদের হাত ধরেই ১৯৫৬ ওএনজিসি তার শক্ত ভিত পায়। লেনিনের দেশের সহায়তায় ভারতে ১১টি বিদ্যুৎ স্টেশন (পুরো বা আংশিক) তৈরি হয়েছিল। এ ছাড়া যন্ত্র নির্মাণ, ওষুধ প্রস্তুত, কয়লা শিল্প, মৎস্য শিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রভূত সাহায্য পেয়েছিল।
কেবল অর্থনীতি বা রাজনীতি নয়, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি জগতেও দু’দেশের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়। দাবা, জিমন্যাস্টিকস এবং ফুটবলের মতো ক্রীড়াক্ষেত্রে সোভিয়েত দলগুলোর ভারত সফর এবং প্রশিক্ষণ স্বাধীন ভারতের ক্রীড়াজগতে এক নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। ষাট দশক থেকে ভারতের ক্রীড়াক্ষেত্রে আধুনিকতার ছোঁয়াও আসে রাশিয়ার হাত ধরে। বায়োমেকানিক্স ও স্পোর্টস মেডিসিনের সূচনা হয় তাদেরই সাহায্যে। পশ্চিমী দেশগুলোর দামি সরঞ্জামের বিকল্প হিসেবে সস্তায় ক্রীড়া সরঞ্জাম সরবরাহ এবং মস্কো বা কিয়েভে ভারতীয় দলগুলোকে উন্নত ট্রেনিং ক্যাম্পের সুযোগ দিয়েছিল তারা।
মূর্তি ভেঙে ফেললেও আদর্শ বেঁচে থাকে
আজ মহান লেনিনের মূর্তির ওপর আরএসএস ও বিজেপি-র এই নগ্ন আস্ফালন আসলে মেহনতি মানুষের অধিকারের ওপর এক সুপরিকল্পিত আক্রমণ। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ শ্রমিক মেহনতি মানুষের কাছে বোমা-বন্দুকের চেয়েও শক্তিশালী হাতিয়ার যাকে সব দেশের শোষক শ্রেণি অত্যন্ত ভয় পায়। এই ভীতি থেকেই তাদের এই আক্রমণ। লেনিন-মূর্তি ভেঙে তারা বামপন্থী ও কমিউনিস্টদের ভীত সন্ত্রস্ত করতে চায়। একচেটিয়া পুঁজির তোষণ, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণে রাজনীতি এবং নিজেদের মতাদর্শগত দেউলিয়াপনা ঢাকতেই তারা আজ উগ্র জাতীয়তাবাদের আড়ালে ইতিহাস বিকৃত করার এই বৃহত্তর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আশ্চর্যের বিষয় হল, যারা এক সময় ব্রিটিশদের কাছে মুচলেকা দিয়ে ভারতের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস থেকে নিজেদের সযত্নে সরিয়ে রেখেছিল, ব্রিটিশের সহযোগী হিসাবে কাজ করেছিল, আজ তারাই মেকি দেশপ্রেমের ধ্বজাধারী সেজে লেনিনকে ‘বিদেশি’ তকমা দিচ্ছে। যে সাম্যবাদী আদর্শকে তারা যুক্তির ময়দানে মোকাবিলা করতে পারছে না, তাকেই আজ পেশিশক্তি আর হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে বিরোধী স্বরকে ভয় দেখাতে চাইছে।
কিন্তু এরা ভুলে গেছে, ইতিহাসকে বুলডোজার দিয়ে মুছে ফেলা যায় না। লেনিন কেবল মাটির বা ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য নন। তিনি মিশে আছেন এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের আপসহীন ধারার বিপ্লবীদের দেখা শোষণমুক্ত যথার্থ গণতান্ত্রিক ভারত গড়ে তোলার স্বপ্নে। স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ভারী শিল্প থেকে আধুনিক ভারত নির্মাণের বুনিয়াদে, শহিদ-ই-আজম ভগৎ সিং ও নেতাজির শেষ ইচ্ছায় এবং এ দেশের মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিটি স্লোগানে। সাময়িক বাহুবল আর রাষ্ট্রীয় মদতে হয়তো রাস্তার ধারের মূর্তি ভাঙা যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে এবং শোষিত মানুষের লড়াইয়ের ময়দানে প্রোথিত আদর্শের যে মূর্তি, তাকে মুছে ফেলার ক্ষমতা কোনও স্বৈরাচারের নেই।