
ফুটবল মানেই এক অদ্ভুত জাদু৷ জাত–পাত, ধর্ম বা ভাষার কোনও ভেদাভেদ এখানে থাকে না৷ লাতিন আমেরিকার কোনও বস্তির ছেলে, আফ্রিকার ধূলি–ধূসরিত মাঠের কিশোর কিংবা বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামের ফুটবলপ্রেমী– সবাই একটা বলের পেছনে ছুটে একই আনন্দে মেতে ওঠে৷ তাই ফুটবলকে বলা হয়, ‘গরিব মানুষের খেলা’, শ্রমজীবী মানুষের ঘাম আর কান্নায় ভেজা এক গভীর আবেগ৷ কিন্তু, মানুষের এই আবেগকেই আজ ব্যবসার হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে বহুজাতিক সংস্থাগুলি৷ আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে আয়োজিত ২০২৬–এর ফুটবল বিশ্বকাপে সর্বত্র পুঁজির দাপট, কর্পোরেটের নিয়ন্ত্রণ, সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি৷
খেলার আনন্দ গ্রাস করেছে বহুজাতিক পুঁজি
ফুটবল বিশ্বকাপের নির্মল আনন্দকে আজ গ্রাস করেছে ফিফা ও বহুজাতিক কর্পোরেটগুলোর আগ্রাসী মুনাফার হিসেবনিকেশ৷ ফিফার লক্ষ্য এ বারে বিশ্বকাপ থেকে ১১ বিলিয়ন (১,১০০ কোটি) মার্কিন ডলার আয় করা, যা ফুটবল ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড৷ এর মধ্যে শুধু টিকিট বিক্রি থেকেই প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার আসবে, বাকিটা আসবে স্পনসরশিপ এবং টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করে৷ টিকিটের বিপুল দাম, চাহিদা বাড়লে ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ ব্যবস্থায় টিকিটের দাম ভারতীয় মুদ্রায় ৩১ লাখ টাকার বেশি৷ এর সঙ্গে আছে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’–এর নামে অতিরিক্ত সময় দেওয়া৷ মূল উদ্দেশ্য, ওই সময় বিজ্ঞাপন দেখিয়ে টাকা রোজগার৷ বেশিরভাগ দেশের ফুটবলাররা এই ব্রেকের বিরোধিতা করলেও ফিফা শোনেনি৷
বিশ্বজোড়া ফুটবলপ্রেমীদের আপত্তিটা ফিফা প্রচুর টাকা আয় করবে তার জন্য নয়, বরং মুনাফার লোভের কাছে ফুটবলের আবেগ, ঐতিহ্য এবং সাধারণ দর্শকদের অধিকারকে বলি দেওয়া হচ্ছে বলে৷
সবার জন্য উন্মুক্ত নয় এই বিশ্বমঞ্চ
ফিফা বলছে, ‘ফুটবল ইউনাইটস দ্য ওয়ার্ল্ড’– ফুটবল বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করে৷ কিন্তু বাস্তবে আমেরিকার কঠোর ভিসা নীতি এবং রাজনৈতিক দাদাগিরি এই ক্রীড়া ডৎসবকে একটি চরম বৈষম্যমূলক ও বিতর্কিত আসরে রূপান্তরিত করেছে৷ মুক্ত ফুটবলের স্লোগানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমেরিকার এই নীতি বিশ্বকাপকে কেবল পশ্চিমী ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত কিছু দেশের ‘একচেটিয়া সম্পত্তিতে’ পরিণত করেছে৷ রাজনীতি ও কূটনীতির নোংরা মারপ্যাঁচে খোদ খেলোয়াড় এবং ম্যাচ অফিশিয়ালদের পেশাদারিত্বের ক্ষতি করা হয়েছে৷ ইরান দলের অনেকের ভিসা বাতিল করেছে আমেরিকা৷ ইরানের লড়াইটা শুধু মাঠের এগারো জন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধেও৷ ইরানি দলকে আমেরিকায় ৪৮ ঘণ্ঢার বেশি থাকার অনুমতি দেওয়া হয়নি৷ বাধ্য হয়েই ইরান দলকে থাকতে হয়েছে মেক্সিকোর তিজুয়ানায়৷ সেখান থেকে তাদের যাতায়াত করে খেলতে হয়েছে৷ ইরানের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা এবং সাপোর্ট স্টাফকে দলের সঙ্গে আসতেই দেয়নি মার্কিন কর্তারা৷ ইরাকের তারকা আইমেন হুসেইনকে বিমানবন্দরে ঘণ্ঢার পর ঘণ্ঢা অপরাধীর মতো জেরা করা হয়েছে৷ ২০২৫ সালের আফ্রিকার সেরা রেফারি সোমালিয়ার তারকা ওমর আরতানকে মায়ামি বিমানবন্দর থেকে অপমানজনক ভাবে দেশে ফেরত পাঠানো হয়৷ সেনেগাল বা ডজবেকিস্তানের খেলোয়াড়দের ওপর চালানো ‘অতিরিক্ত তল্লাশি’ বিশ্ব জুড়ে জাতিগত বৈষম্যের বিতর্ককে তীব্র করেছে৷ মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার ৩৯টি দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে ওই অঞ্চলের ফুটবলপ্রেমীদের স্টেডিয়াম থেকে কার্যত নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল৷ টিকিট কেনার পরেও স্ক্টল্যান্ডের দর্শকদের ট্রাভেল পারমিট বাতিল করা হয়েছে৷ এমনকি সহ আয়োজক দেশ কানাডার প্রায় ৭০ শতাংশ সমর্থকের ভিসা বাতিল করেছে আমেরিকা৷
লাগামহীন বর্ণবাদও মাথা চাড়া দিয়েছে৷ মাঠে ও মাঠের বাইরে ফুটবলারদের লক্ষ্য করে সামাজিক মাধ্যমে ঘৃণ্য বর্ণবাদী আক্রমণের প্রাবল্য এ বার সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে৷
খেলার মাঠে আধিপত্যবাদের নোংরা খেলা
২০২৬ বিশ্বকাপে আমেরিকার ভূ–রাজনৈতিক স্বার্থ ও পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যবাদী নীতি স্পষ্ট হয়ে ডঠেছে৷ কঙ্গোর ফরাসি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতীক কিংবা আয়ারল্যান্ডের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী ‘সেল্টিক ক্রস’ দেশদুটির কোটি কোটি মানুষের আত্মত্যাগ ও সার্বভৌমত্বের গৌরবময় ঐতিহ্যের স্মারক৷ ফিফা এই দুই দেশের জার্সিতে এগুলো নিষিদ্ধ করে তাদের জাতীয় আবেগ ও সংগ্রামের ঐতিহ্যমণ্ডিত ইতিহাসকেই অপমান করেছে৷ কঙ্গো ও আয়ারল্যান্ডের জার্সিতে এই প্রতীকগুলো থাকলে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের অতীত ঔপনিবেশিক নির্যাতন ও শোষণের কালো ইতিহাস বিশ্বমঞ্চে নতুন করে আলোচনায় আসত৷ পশ্চিমী প্রভাবশালী দেশগুলোর এই অস্বস্তি আর অপরাধ ঢাকতেই তাদের চাপে ফিফা এগুলোকে নিষিদ্ধ করেছে বলেই অনেকের মত৷ ফিফার এই নীতিটি আসলে সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের চাপের কাছে নতিস্বীকার৷ পশ্চিমী বিশ্ব যখন রাজনৈতিক বার্তা তুলে ধরতে বিশেষ আর্মব্যান্ড পরে, ফিফা তখন নীরব সমর্থন দেয়৷ অথচ আফ্রিকা বা অন্য অঞ্চলের দেশগুলি নিজেদের স্বাধীনতার ইতিহাস তুলে ধরলেই ফিফা ‘রাজনীতি’র অজুহাতে তা আটকে দেয়৷ ফুটবল তথাকথিত ‘রাজনীতিমুক্ত’ রাখার ফিফার নিয়মটি আসলে চরম বৈষম্যমূলক৷
ক্ষমতার কাছে ফিফার আত্মসমর্পণ কলঙ্কিত ফুটবলের নিরপেক্ষতা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তোষামোদ করে বাড়তি রোজগারের আশায় ফিফা তাঁকে ‘শান্তি’ পুরস্কার দিয়েছে শুধু নয়, তাঁর চাপে মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা মকুব করে নজিরবিহীন ভাবে বেলজিয়ামের সঙ্গে খেলার অনুমতিও দেয়৷ আয়োজক দেশ আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে ফিফার এই নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ সারা বিশ্ব জুড়ে প্রবল সমালোচিত হয়েছে৷ ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা এই সিদ্ধান্তকে ফিফার লাল রেখা বা রেডলাইন ক্রস বলে অভিহিত করেছে৷
ফুটবল হোক মানুষের
এ বারের বিশ্বকাপ ফুটবল আমাদের এক গভীর প্রশ্ণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে৷ ফিফা কি আর ক্রীড়া সংস্থা আছে নাকি এটি পুরোদস্তুর এক মুনাফালোভী বহুজাতিক কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে? পুঁজির আগ্রাসন ফিফার মাধ্যমে ফুটবলকে একটি বিপুল মুনাফার পণ্য বানিয়ে ফেলেছে৷
কিন্তু আমরা ভুলে যেতে পারি না, ফুটবলের আসল প্রাণ কোনও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট বক্সে থাকে না৷ তার প্রাণ লুকিয়ে আছে পাড়ার গলিতে, কাদার মাঠে আর কোটি কোটি মানুষের নিঃস্বার্থ ভালবাসায়৷ বহুজাতিক পুঁজির এই শৃঙ্খল থেকে ফুটবলকে মুক্ত করার সময় এসেছে৷ খেলাকে তার আসল মালিক, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য এবং মাঠের ভেতরের সত্য ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিশ্ব জুড়ে আওয়াজ তোলা আজ ভীষণ জরুরি৷
ফুটবল মানুষের খেলা, তাকে পুঁজির দখলদারি থেকে মুক্ত না করতে পারলে তার প্রাণ এ ভাবেই লুণ্ঠিত হবে৷ তাই গ্যালারিতেও আওয়াজ উঠুক– খেলাকে পুঁজির দখলমুক্ত করতে নতুন সমাজ গড়ো৷