Breaking News

পাঠকের মতামতঃ যে মূর্তি ভাঙা যায় না

এ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে মূর্তির গায়ে রঙ লাগানো থেকে শুরু করে জিয়াগঞ্জে লেনিন মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলা এবং এ দেশে লেনিনের কী ভূমিকা, কেন তাঁর নামে রাস্তা থাকবে, এমন প্রশ্ন শাসক মহল থেকে তোলা হচ্ছে।

যারা সমাজবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করে তাদের কাছে না হলেও, যারা পড়াশুনার বাইরে আছে তাদের প্রশ্ন– লেনিন কে এবং কেন? সারা বিশ্বের মানুষই জানে, লেনিন একজন শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী, একজন তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক তত্তে্বর আবিষ্কারক। এটাও জানা কথা, যে কোনও আবিষ্কার মানবজাতির সর্বজনীন সম্পদ। মানবসভ্যতার ইতিহাসে যে কোনও আবিষ্কার এক অনন্য শক্তি, যা যুগে যুগে মানুষের জীবনযাত্রাকে বদলে দিয়েছে এবং অগ্রগতির পথকে সুগম করেছে। এ বার প্রশ্ন, কোনও আবিষ্কার কি একটি নির্দিষ্ট দেশ বা জাতির সম্পত্তি? না কি তা সমগ্র মানবজাতির জন্য উন্মুক্ত এক অমূল্য সম্পদ? উত্তর হল, আবিষ্কার কখনওই সীমান্ত রেখায় আবদ্ধ নয়, এটি বিশ্বমানবের যৌথ সম্পদ।

প্রথমত, একটি আবিষ্কার কোনও নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে জন্ম নিতে পারে, কিন্তু তার প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। যেমন বিদ্যুৎ, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কিংবা যোগাযোগ প্রযুক্তি এ সব আবিষ্কার কোনও এক দেশে শুরু হলেও আজ তা সারা পৃথিবীর মানুষের জীবনকে সহজ ও উন্নত করেছে। তাই আবিষ্কারের প্রকৃত স্বরূপই হল সর্বজনীনতা।

দ্বিতীয়ত, একজন আবিষ্কারক কেবল তাঁর দেশের প্রতিনিধি নন, তিনি মানবতার প্রতিনিধি। তাঁর মেধা, শ্রম ও সৃষ্টিশীলতা জাতি, ধর্ম, ভাষা কিংবা রাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করে। তিনি যে জ্ঞান সৃষ্টি করেন, তা গোটা পৃথিবীর মানুষকে উপকৃত করে। এই কারণেই একজন আবিষ্কারককে বিশ্বনাগরিক বলা যায়।

তৃতীয়ত, আবিষ্কার মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার পথ খুলে দেয়। এক দেশের আবিষ্কার অন্য দেশের উন্নয়নে সহায়ক হয়, ফলে বৈশ্বিক ঐক্য ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়।

তাই আবিষ্কার কোনও একটি দেশের সম্পদ নয়, এটি মানবজাতির সম্মিলিত অর্জন। আবিষ্কারকও কোনও সীমার মধ্যে আবদ্ধ নন। তিনি সমগ্র বিশ্বের কল্যাণের জন্য কাজ করেন।  এ বার আসি মূল প্রসঙ্গে– লেনিনের মূর্তি ভাঙা নিকৃষ্টতম অপরাধ কেন?

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। মানুষের সামাজিক জীবন, সম্পর্ক, প্রতিষ্ঠান এবং পরিবর্তনকে বৈজ্ঞানিক ভাবে বিশ্লেষণ করে সমাজবিদ্যা। বর্তমান যুগে সমাজের জটিলতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে সমাজবিজ্ঞান অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি প্রয়োজন। পরিবার, ধর্ম, শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতির মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যপ্রণালী সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে আমরা সমাজের গঠন ও প্রকৃতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাই। সমাজবদ্ধ মানুষের মধ্যে যে জটিল সমস্যাগুলি প্রকট, যেমন দারিদ্র, বেকারত্ব, লিঙ্গ বৈষম্য, অপরাধ, পারস্পরিক হিংসা-দ্বেষ প্রভৃতি সমস্যার কারণ বিশ্লেষণ করতে সমাজবিজ্ঞান আমাদের সচেতন করে তোলে। আর ‘সমাজ বিজ্ঞান’-এ সমস্যাগুলোর বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণই ‘মার্ক্স-এঙ্গেলস-লেনিন’-এর শ্রেষ্ঠ অবদান।

লেনিন কার্ল মার্ক্সের তত্ত্বকে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে নতুন বিজ্ঞানসম্মত মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অগ্রগতি ঘটান। তিনি দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদের চূড়ান্ত পর্যায় হল সাম্রাজ্যবাদ, যেখানে পুঁজিপতি শ্রেণি নিজেদের মুনাফা বৃদ্ধির জন্য দুর্বল দেশগুলিকে শোষণ করে। এ ছাড়া, তিনি শ্রেণি সংগ্রামের ধারণাকে আরও সুসংগঠিত করেন এবং দেখান কী ভাবে শ্রমিক শ্রেণি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিপ্লব ঘটাতে পারে। লেনিন অগ্রণী (সাম্যবাদী) দলের ধারণা প্রদান করেন, যা বিপ্লব পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবে। রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি রাষ্ট্রকে শাসক শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা দেন। সমাজ সম্পর্কে সচেতন ও বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করে সমাজ পরিবর্তনের একটি কার্যকর পথ নির্দেশ করেছেন লেনিন এবং তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সমাজতান্ত্রিক একটি সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে প্রতিটি মানুষের সমমর্যাদা, প্রতিটি মানুষের জন্য কাজ, নারীমুক্তি, প্রত্যেকের জন্য শিক্ষা-স্বাস্থ্য ইত্যাদির নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। তাই পৃথিবীর মানবজাতি আজ সমাজবিজ্ঞান পাঠে তাঁর তত্ত্বকে অতি আবশ্যিক মনে করে। তিনি বিশ্বের অন্যান্য মহান মনীষীদের মধ্যে একজন। পৃথিবীর সর্বত্রই জ্ঞানী-গুণীজন তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের বিপ্লবীরা তাঁকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার প্রতীক হিসেবে গণ্য করতেন, যেহেতু তিনি আমাদের স্বাধীনতার দাবিকে আন্তর্জাতিক স্তরে সমর্থন করেছিলেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ প্রমুখ বিপ্লবীরা লেনিনের লেখা পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ‘রাশিয়ার চিঠি’-তে তাঁর নেতৃত্বে সে দেশের সামাজিক উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

যারা মানুষের দ্বারা মানুষকে শোষণ-অত্যাচার-নিপীড়ন, দারিদ্র-বেকারত্ব, জাতিতে-জাতিতে বৈরিতা, দেশে দেশে যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ড সমর্থন করে, তাদের কাছে ‘বিশ্ববরেণ্য মনীষী লেনিন’ পর হতে পারে, কিন্তু যারা ইতিহাস-সংস্কৃতি-গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সর্বোপরি মানুষের অধিকারে বিশ্বাস করে তাদের কাছে লেনিন অত্যন্ত আপনজন। সুতরাং এমন মনীষীর মূর্তি ভেঙে ফেলা নিকৃষ্টতম অপরাধই বটে।

দ্বিজেন্দ্রনাথ সরকার, মুর্শিদাবাদ