Breaking News

বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি থেকে ইন্ডিয়া নাম বাদ কী উদ্দেশ্যে

মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তিশগড়ে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীর ডিগ্রি বা মার্কশিটে ‘ইন্ডিয়া’ শব্দটিকে বাদ দিয়ে ‘ভারত’ করছে বা করতে যাচ্ছে। ইন্ডিয়া এবং ভারত যে একই দেশ তা সকলেই জানে। তাহলে এই পাল্টানোর বিশেষ কি কোনও প্রয়োজন ছিল?

মধ্যপ্রদেশের রানি দুর্গাবতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রাজেশ কুমার ভার্মা সংবাদমাধ্যমকে জানান, জি-টোয়েন্টি বৈঠকে আমাদের দেশ ‘ভারত’ নামে অংশগ্রহণ করেছে। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের নাম ভারত করার।

মধ্যপ্রদেশের দেবী আহিল্যা বিশ্ববিদ্যালয়ও ইন্ডিয়া শব্দটি বাদ দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রাকেশ সিংহাই সগর্বে বলেন, তাঁরাই প্রথম পাল্টে দিয়েছেন। তিনি বলেন, সব ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয় ইন্ডিয়া শব্দটি বাতিল করেছে।

ছত্তিশগড়ের বিলাসপুরের গুরুদাস বিশ্ববিদ্যালয়ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইন্ডিয়া শব্দটি পাল্টে ভারত করার। যদিও এই পরিবর্তনের যুক্তিগ্রাহ্য কারণ কেউ উপস্থিত করতে পারছেন না। উপাচার্য অলোক কুমার চক্রবাল বলেন, ইন্ডিয়া নামটি বিদেশিরা দিয়েছে। কিন্তু বিদেশিরা নাম দিয়েছে বলেই কি সেই নাম পরিত্যাজ্য? গোটা বিজ্ঞান বইয়ের বহু কিছু তো বিদেশিরা আবিষ্কার করেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু তত্ত্ব বিদেশি চিন্তানায়করা হয় উদ্ভাবন করেছেন অথবা সমৃদ্ধ করেছেন। সেগুলো কি কোনও অজুহাতেই বাদ দেওয়া চলে? এর ফলে তো সম্মিলিত জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে ভারতবর্ষ পিছিয়ে পড়বে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে উপাচার্যরা যাই বলে থাকুন, আসলে এর পিছনে রয়েছে অন্য পরিকল্পনা। সেটি হল আরএসএস প্রভাবিত সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত প্রয়াত দীননাথ বাত্রার শিক্ষা সংস্কৃতি উত্থান ন্যাসের ভূমিকা। ন্যাসের অন্যতম সেন্ট্রাল এক্সিকিউটিভ সদস্য এম এল গুপ্ত বলেন, তাঁর সংগঠন ধারাবাহিক ভাবে প্রচার করে চলেছে ইন্ডিয়া নামটি পাল্টে ভারত করার জন্য। তাঁর যুক্তি, কোনও ব্যক্তি বা কোনও দেশের দুটি নাম থাকতে পারে না। সত্যিই কি পারে না? যে কৃষ্ণর নাম হিন্দু ধর্মের লোকেরা জপ করেন, সেই কৃষ্ণেরই তো ১০৮টি নাম রয়েছে। আরএসএস কি সেগুলি নাম ছাঁটাই করবে?

এমএল গুপ্তার আরও যুক্তি, ব্রিটিশ শাসকরা ‘ইন্দাস’ থেকে ইন্ডিয়া শব্দটি দিয়েছে। এটি একটি মর্যাদা হানিকর শব্দ। ‘ইন্ডিয়া নয় ভারত’ গ্রন্থে গুপ্তাজি আরও বলেন, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, গুজরাট, মহারাষ্ট্রে তারা ১৭টির মতো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্ডিয়া শব্দটি মুছে দিয়েছেন।

আরএসএস নেতা মোহন ভাগবতের আরও যুক্তি, ভারত প্রপার নাউন। তার অনুবাদ হয় না। ফলে লেখা বা বলার সময় ভারত কথাটি ব্যবহার করা উচিত। ভাগবত স্পষ্ট করে না বললেও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, অনুবাদ অর্থে তিনি ‘ইন্ডিয়া’ কথাটি বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু উনি ভারত সম্পর্কিত ব্যাকরণ জানার পাশাপাশি যদি ভারতের ইতিহাসটাও একটু জানতেন তা হলে সম্ভবত এই ভুল ওঁর হত না। জানতে পারতেন যে, ‘ইন্ডিয়া’ কথাটি ভারতের ইংরেজি অনুবাদ ও ঔপনিবেশিকদের দেওয়া নাম নয়।

ইতিহাস বলছে, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে পারস্যের সম্রাট প্রথম দরায়ুসের লিখনে সিন্ধু উপত্যকাকে ‘হিন্দু’ বা ‘হিন্দুস’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এই পারসিক শব্দ অনুকরণে গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস ‘হিন্দিকে’ এবং পরবর্তী গ্রিক লেখকরা ‘ইন্ডিকা’ বা ‘ইন্ডিয়া’-র মতো শব্দ ব্যবহার করেছেন। সিন্ধু থেকে আসা ‘হিন্দুস’ বা ‘ইন্দোস’ শব্দের সঙ্গে ভূখণ্ডবাচক পারসিক প্রত্যয় তান (যেমন উজবেকিস্তান, আফগানিস্তান) যুক্ত করে হয়েছে হিন্দুস্তান এবং গ্রিক রোমান জগতের প্রত্যয় ইয়া (যেমন সিরিয়া, সার্বিয়া) যোগ করে তৈরি হয়েছে ইন্ডিয়া।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা তো দূরের কথা, যখন মোগল রাজবংশের প্রথম পুরুষ বাবরও ভারতে পদার্পণ করেননি, তারও বহু আগে থেকেই বিশ্ব জুড়ে ইন্ডিয়া নামটির যথেষ্ট প্রচলন ছিল। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের কথা কে না জানে। তিনি কিন্তু আমেরিকা আবিষ্কার করতে নৌঅভিযান করেননি। ১৪৯২ সালে তিনি ‘ইন্ডিয়া’য় আসার পথের সন্ধানে বেরিয়ে আমেরিকা পৌঁছেছিলেন।

ভারত ও ইন্ডিয়া দু’টি নাম বহু বছর আগে থেকেই পাশাপাশি চলে আসছে। ইন্ডিয়া নয়, শুধুমাত্র ভারত এই ভাবনার মধ্যে মনের বা গোষ্ঠীর সঙ্কীর্ণতাই প্রকাশ পায়। সংবিধান প্রণেতাদের সম্ভবত এই সঙ্কীর্ণতা ছিল না। তাই সংবিধানের শুরুতেই ‘ইন্ডিয়া দ্যাট ইজ ভারত…’ লিখতে তাঁদের কোনও অসুবিধা হয়নি। আরএসএস কি তা হলে সংবিধানে ইন্ডিয়া শব্দটি পাল্টাবে? আর মোহন ভাগবতদের সংগঠন কেমন ঔপনিবেশিকতা বিরোধী, তা স্বাধীনতার আন্দোলনে তাঁদের বিশ্বাসঘাতক ভূমিকাতেই স্পষ্ট।

 প্রশ্ন উঠছে, নাম পাল্টানোই কি আজ দেশের সামনে প্রধান কাজ? এই নাম পাল্টাতে গিয়ে অনর্থক অর্থের অপচয় ঘটবে। অনর্থক কিছু বিতর্কে মানুষের মস্তিষ্ককে আটকে দেওয়া হবে। কল্যাণকর কিছু এর মধ্যে নেই। দেশের মূল সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি ঘোরানো ছাড়া এর আর কোনও বাস্তব প্রয়োজনীয়তা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় হবে মুক্তচিন্তা, উদার চিন্তা, বিজ্ঞানসম্মত চিন্তার ধারক বাহক। তার কর্মকর্তারা যদি এ ধরনের যুক্তিহীন আচরণ করেন, দেশাত্মবোধ দেখাতে গিয়ে ইতিহাসকেই উল্টে দেন, পাল্টে দেন তা হলে সেটা ভয়ঙ্কর প্রবণতাকে নির্দেশ করে।