
রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের শিক্ষায় নিয়োগ নিয়ে সীমাহীন দুর্নীতি ও তাদের মতোই ভোটসর্বস্ব বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতিহিংসার রাজনীতির বিষময় চক্করে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন এ রাজ্যের মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষকরা। এই পরিস্থিতিতে ৩ ডিসেম্বর কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায় ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের জীবনে স্বস্তির খবর নিয়ে এল। ডিভিশন বেঞ্চ দুর্নীতির জন্য চিহ্নিত ৩৬০ জনকে বাদ দিয়ে বাকি ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি বহাল রেখেছে। মাধ্যমিক স্তরে এসএসসি-র নিয়োগ দুর্নীতির দায়ে যোগ্য অযোগ্য নির্বিশেষে ২৬ হাজার শিক্ষকেরই চাকরি বাতিল হওয়ার পর এই রায় যে দুর্নীতিগ্রস্তদের সাথে সমস্ত শিক্ষককে এক করে দেয়নি, তাতে শিক্ষানুরাগী মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। একই সাথে দাবি উঠেছে সিবিআই-ইডির টালবাহানা বন্ধ করে সমস্ত দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত দ্রুত শেষ করতে হবে ও তাদের শাস্তি দিতে হবে।
এই শিক্ষকেরা গত ২০১৪ সালের টেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করে ২০১৭ তে চাকরি পেয়েছিলেন। নিযুক্ত ৪২ হাজারের মধ্যে মাত্র ১০ হাজার জন ডিএলএড ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছিলেন। নিয়োগের পর সরকার বাকি ৩২ হাজার শিক্ষককে কেন্দ্রীয় সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ওপেন স্কুলিং (এনআইওএস)-এর মাধ্যমে ডিএলএড করিয়ে নেয়।
এই নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে এবং আনট্রেন্ডদের নিয়ম ভেঙে চাকরি দেওয়া হয়েছে এই অভিযোগে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা হলে ২০২৩-এর মে মাসে তৎকালীন বিচারক এবং বর্তমানে বিজেপির সাংসদ অভিজিৎ গাঙ্গুলী দুর্নীতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করার চেষ্টা না করে ৩২ হাজার শিক্ষককেই অবৈধ ঘোষণা করেন। তিনি ‘ঢাকি সমেত বিসর্জন দেব’ বলে আস্ফালন করেছিলেন। ইতিমধ্যে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী, তাঁর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী, প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের কর্তা, এসএসসি কর্তা, মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি সহ শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক নেতা গ্রেপ্তার হন। কিন্তু সিবিআই, ইডি ইত্যাদি কেন্দ্রীয় সংস্থা দিনের পর দিন তদন্ত চালিয়েও দুন¹তির মূলে পৌঁছানোর আদৌ কোনও চেষ্টা করছে কি না, এ নিয়েই জনমনে প্রশ্ন আছে।
এর আগে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকের ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিলের ক্ষেত্রে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের স্বার্থে শিক্ষা দপ্তরের আমলারা যেমন দুর্নীতি চিহ্নিত করার চেষ্টাই করেনি, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাও দুর্নীতিগ্রস্তদের ধরবার কোনও উদ্যোগই নেয়নি। একই সাথে ভোটের বাজারে ফয়দা তোলার জন্য ভোটবাজ বিরোধী দলগুলি ময়দানে নেমে দুন¹তিগ্রস্তদের ধরার বদলে সকলের চাকরি বাতিলটাকেই পাখির চোখ করে বসেছিল।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে মামলাতেও সরকারের যেমন চেষ্টা ছিল দুর্নীতি ঢাকা দেওয়া, তেমনই বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস ইত্যাদি ভোটসর্বস্ব বিরোধীদের মধ্যে সকলের চাকরি বাতিলের জন্য অস্বাভাবিক উল্লাস দেখা গেছে। এই প্রসঙ্গে একটি মাত্র শিক্ষক সংগঠন দৃঢ়ভাবে সঠিক বক্তব্যটি তুলে ধরেছিল। এই সংগঠন বঙ্গীয় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (বিপিটিএ) আইনজীবী কার্তিক রায় এবং সহযোগী হিসাবে দেবরঞ্জন দাস, গৌরাঙ্গ দেবনাথ, পার্থ মুখার্জী আদালতের কাছে সমিতির বক্তব্য যথাযথ ভাবে বলিষ্ঠতার সাথে তুলে ধরে বলেন, সমস্ত দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা, দুর্নীতি করে চাকরি পাওয়া শিক্ষকদের শাস্তি সুনিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু কোনও নির্দোষ শিক্ষকের যেন শাস্তি না হয়। এই বক্তব্য আদালতে মান্যতা পায়। এ জন্য শিক্ষক ও শিক্ষানুরাগী মানুষ বিপিটিএ সংগঠন এবং তাদের আইনজীবীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এসএসসি-তে নিয়োগ দুর্নীতির প্রশ্নেও রাজ্যের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ চেয়েছেন দাগিদের শাস্তি হলেও যোগ্যদের শাস্তি যেন না হয়। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি, সিপিএম সকলেই নিজ নিজ স্বার্থে স্কুল শিক্ষায় বিপর্যয়টাই চেয়েছে, ফলে এটা হতে পারেনি।
বিপিটিএ-র সাধারণ সম্পাদক আনন্দ হাণ্ডা ৩ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে বলেন, এই মামলায় বঙ্গীয় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির বক্তব্য যে মান্যতা পেয়েছে তা সংগঠনের যুক্তিসঙ্গত অবস্থান এবং তা নিয়ে আইনি লড়াই ও রাজপথের দীর্ঘ আন্দোলনের জয়। তিনি বলেন, শিক্ষকদের স্বার্থরক্ষায় বিপিটিএ ধারাবাহিক ভাবে লড়ে যাবে। এই লড়াইয়ে যে শিক্ষকরা সমিতিকে নানা ভাবে সাহায্য করেন, তিনি তাঁদের অভিনন্দন জানান। তিনি দাবি জানান, দুর্নীতিমুক্ত ভাবে সমস্ত শূন্যপদ পূরণ করে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে।