
সম্প্রতি এ রাজ্যে সরকারি দলের আজ্ঞাবহ এক বাংলা দৈনিকের সংবাদে সচেতন নাগরিক মাত্রই হতবাক। প্রতিদিন এ রাজ্যে ডিয়ার লটারি, সাট্টা, অনলাইন লোটো ও মাইক্রোফিনান্সের ফাঁদে সর্বস্বান্ত হচ্ছে হাজার হাজার গরিব প্রান্তিক মানুষ।
পূর্বতন সরকারের আমলে বঙ্গ লটারি, পাঞ্জাব লটারি, আসাম লটারি, সাপ্তাহিক লটারি ইত্যাদি নানা রাজ্যের নামাঙ্কিত লটারি খেলা চালু ছিল। সেই সাথে দুর্গাপুজো, কালীপুজো, বিশ্বকর্মা পুজো, নববর্ষ স্পেশাল বাম্পার প্রভৃতি নামে লটারি খেলা চলত। বর্তমানে তৃণমূল সরকারের আমলে পূর্বোক্ত লটারির পাশাপাশি দৈনিক ৬ টাকার টিকিটে তিনবার খেলা চালু হয়েছে। শহর, গঞ্জ, পাড়ার মোড়ে, অলিতে গলিতে দিবারাত্রি মানুষ ভাগ্য ফেরাতে ভিড় জমাচ্ছে লটারির দোকানে। ভিড়ে কর্মহীন খেতমজুর, শ্রমিক ও বেকার যুবকদের সংখ্যাই বেশি। এর পাশাপাশি প্রকাশ্যেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে অনলাইন সাট্টা খেলা ও অনলাইন লোটো, যা বেআইনি। চরম অনিশ্চয়তায় ভোগা মানুষ প্রতিদিন ভাগ্য পরীক্ষার লাইনে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার টাকা খুইয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। শহরের বস্তি, গ্রামগঞ্জের পরিবারগুলোতে দ্বন্দ্ব-অশান্তি বাড়ছে। সরকারি হিসেবে প্রতিদিন অনলাইন লোটো, জুয়ার আসর থেকে প্রায় দেড়শো কোটি টাকা লটারি কোম্পানির মালিক, দোকানদার ও ট্যাক্স বাবদ সরকারের কোষাগারে আসছে। এ সবই সরকারি বদান্যতায়। বাৎসরিক শিল্প-বাণিজ্য সম্মেলনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী যতই হাজার টাকা নিয়ে কর্মশ্রীর নামে বাসস্ট্যান্ডে চায়ের দোকানের সাজেশন দিন না কেন, তৃণমূলের কর্মীরাও তা ফুৎকারে উড়িয়ে লটারি দোকানেই ভিড় জমাচ্ছেন।
এর ওপর রয়েছে বিভিন্ন মাইক্রোফিনান্স কোম্পানির দালালরা। দরিদ্র গ্রামগুলিতে গ্রুপের মহিলাদের ছোট ব্যবসা, সংসারের উন্নতির কথা বুঝিয়ে এই মহিলারা ঋণ নেওয়ার জন্য লোভ দেখাচ্ছে। তারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও কিছুদিন পর বড় পুঁজির কাছে হেরে সেই ব্যবসা অলাভজনক হয়ে লাটে ওঠে। প্রতি সপ্তাহে কিস্তি বাবদ সুদে-আসলে দেড়গুণ পর্যন্ত টাকা গুনতে হচ্ছে অসহায় গরিব পরিবারগুলিকে। জমি-জমা সহায়-সম্বল বিক্রি করেও মাইক্রোফিনান্সের ঋণ পরিশোধ হয় না। ফলে অনেকেই পুরো পরিবার সহ পরিযায়ী শ্রমিকের দলে ভিড়তে বাধ্য হচ্ছেন। সংবাদপত্রে খবর বেরোলে অনলাইন লোটোর সঙ্গে যুক্ত ব্যাঙ্কের কর্মকর্তা, মালিকরা একটু নড়েচড়ে বসে। তারপরেই আবার যে কে সেই। একটা গণতান্ত্রিক সরকার চাইলে কি অসচেতন অসহায় জনগণকে এই ফাঁদ থেকে রক্ষা করে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে না? বাস্তবে এটা জানা কথা যে নেতা-মন্ত্রী ও সরকারের পরিকল্পনাতেই এই অর্থ লোটার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সুযোগ সন্ধানীরা। এর সাথে যুক্ত আছে সব বড় রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীরা। সাধারণ মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিচ্ছে এই ধুরন্ধর মুনাফালোভী জালিয়াতরা। চাকরির অনিশ্চয়তা, ফসলের দাম না থাকার সমস্যায় পরিবারগুলো জেরবার। যা হোক করে কিছু রোজগারের লোভ দেখিয়ে তাদের সহজে বিভ্রান্ত করা যায়। শাসক শ্রেণি সমাজে যে অনৈতিক জীবনধারায় প্রশ্রয় দেয়, তাতে এই লোভের ফাঁদে পা দেওয়ার পথ তারা খুলেই রেখেছে। ফলে মানুষকে বুঝতে হবে এই সমাজে তাঁদের অপ্রাপ্তি, দারিদ্র, বেকারি, অসহায়তার প্রকৃত কারণ যে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা, তার স্বরূপ না চিনতে পারলে এ জিনিস চলতেই থাকবে। যতদিন এই অসচেতনতা থাকবে, ততদিন ভাগ্য পরীক্ষার লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে সর্বস্বান্ত হতে হবে। সমস্যার জন্য নিজেকে দায়ী করে অনেককেই হয়তো মাদকাসক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করতে দেখা যাবে।