
‘‘বুর্জোয়া ও বিশেষ করে পেটি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা তর্কাতীত ঐতিহাসিক ঘটনার চাপে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সেখানেই আছে যেখানে শ্রেণি বিরোধ ও শ্রেণি সংগ্রাম আছে। তাঁরা মার্ক্সের চিন্তার ‘সংশোধন’ এমন ভাবে করছেন যেন রাষ্ট্রের কাজ হল শ্রেণিগুলোর মধ্যে মৈত্রী ঘটানো। মার্ক্সের মতে রাষ্ট্রের আবির্ভাবই হত না বা রাষ্ট্র টিকে থাকত না যদি শ্রেণিগুলোর মধ্যে মৈত্রী ঘটানো সম্ভব হত। পেটি বুর্জোয়া ও ফিলিস্টাইন পণ্ডিত ও প্রচারকরা বিনয়ের সাথে মার্ক্সের উল্লেখ করে প্রমাণ করতে চান যে রাষ্ট্র শ্রেণি সমূহের মৈত্রী বন্ধন ঘটায়। মার্ক্সের মতে, রাষ্ট্র শ্রেণি শাসনের যন্ত্র, রাষ্ট্র এক শ্রেণির দ্বারা অপর শ্রেণিকে দমনের যন্ত্র। এ এমন ‘নিয়ম শৃঙ্খলার’ সৃষ্টি, যা শ্রেণিদ্বন্দ্বকে নমনীয় করে এই দমনের ব্যবস্থাকে রক্ষা করে, তাকে আইনি রূপ দেয়। পেটি বুর্জোয়া রাজনীতিকদের মতে, শৃঙ্খলার অর্থ হল মোটের উপর শ্রেণিমৈত্রী– এক শ্রেণির দ্বারা অপর শ্রেণিকে দমন করা নয়। সংঘর্ষকে নমনীয় করার অর্থ হল শ্রেণিমৈত্রী– শোষক শ্রেণিকে উচ্ছেদ করার সুনির্দিষ্ট পন্থা পদ্ধতি থেকে শোষিত শ্রেণিকে বঞ্চিত করা নয়।
যেমন ধরুন, ১৯১৭ সালের বিপ্লবের সময়ে, ব্যবহারিক প্রশ্ন হিসাবে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও তাৎপর্য বিরাট আকার নিয়ে আমাদের সামনে দেখা দিয়েছিল। গণসংগ্রামের আশু প্রয়োজনে এই প্রশ্নের আশু মীমাংসা ব্যাপক ভিত্তিতে দেখা দিয়েছিল। তখনই সমস্ত সোস্যালিস্ট রেভোলিউশনারি ও মেনশেভিকরা এই পেটি বুর্জোয়া তত্তে্বর মধ্যে পুরোপুরি ডুবে গিয়ে বলেছিলেন রাষ্ট্রের কাজ হল ‘শ্রেণি মৈত্রী’ ঘটানো। এই দুই দল, পেটি বুর্জোয়া ও ফিলিস্টাইন সুলভ ‘শ্রেণি মৈত্রী’র তত্ত্ব সম্বলিত অসংখ্য প্রস্তাব গ্রহণ করে ও প্রবন্ধ লিখে পাতার পর পাতা ভরিয়ে ফেলেছিল। রাষ্ট্র যে একটা নির্দিষ্ট শ্রেণি শাসনের যন্ত্র, সেই শ্রেণি যে তার বিরুদ্ধ শ্রেণির সাথে কোনও মতেই মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না, তা এই পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা কখনওই বুঝতে পারেন না। রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, এই সোস্যালিস্ট রেভোলিউশনারি ও মেনশেভিকরা কোনও মতেই সমাজতন্ত্রী নয় (এই কথা আমরা বলশেভিকরা সব সময় বলে এসেছি), তারা সমাজতন্ত্র ঘেঁষা বাক্য বিন্যাসে পূর্ণ পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রী ছাড়া কিছু নয়।
অন্য দিকে, ‘কাউৎসকিপন্থীদের’ মার্ক্সবাদ বিকৃতি অনেক বেশি সূক্ষ্ম। রাষ্ট্র শ্রেণি শাসনের যন্ত্র বা শ্রেণি বিরোধ অনিরসনীয়, ‘তত্ত্বগত ভাবে’ এ কথা তাঁরা অস্বীকার করেন না। কিন্তু যা দৃষ্টির বাইরে থেকে যায় বা গোপন করে রাখা হয়, তা হল এই যদি রাষ্ট্র শ্রেণি বিরোধের অনিরসনীয়তার ফল হয়, যদি তা সমাজ ঊর্ধ্ব একটা শক্তি হয় এবং ‘যদি তা নিজেকে ক্রমাগত সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে থাকে’–তা হলে এটা নিশ্চিত যে সশস্ত্র বিপ্লব ছাড়া শোষিত শ্রেণির মুক্তি ঘটবে না শুধু তাই নয়, যতক্ষণ রাষ্ট্র যন্ত্রকে ধবংস করা না যাবে, ততক্ষণ শোষিত শ্রেণির মুক্তি হবে না। আর এই রাষ্ট্র হল শাসক শ্রেণির সৃষ্টি এবং তা সমাজ ‘বিচ্ছিন্নতার’ প্রতিমূর্তি।’’
–‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’