
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে একই দিনে একটি মসজিদ এবং একটি মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হল। স্থাপন করলেন দুই পরিচিত রাজনৈতিক নেতা– একজন সদ্য-প্রাক্তন তৃণমূল, অন্যজন বিজেপি। পর দিন ব্রিগেড জুড়ে গীতা পাঠের আয়োজন হল। উপস্থিত থাকলেন বিজেপির তাবড় নেতারা এবং রাজ্যপাল।
কিন্তু হঠাৎ মন্দির-মসজিদ প্রতিষ্ঠার জন্য এত তৎপর হয়ে উঠলেন কেন এই সব নেতারা? মন্দির কিংবা মসজিদ প্রতিষ্ঠা কি এখন রাজ্যের মানুষের জন্য খুব জরুরি ছিল? ধর্মবিশ্বাসী মানুষ কি এত দিন নমাজ পড়েনি, পুজো-আর্চা করেনি? ব্যক্তিগত ভাবে কিংবা মন্দিরে, মণ্ডপে গীতাপাঠের কি কোনও অসুবিধা হচ্ছিল? তা যদি না হয় তবে কোন উদ্দেশ্যে এই আয়োজন? ব্রিগেডে মহাসমারোহে গীতাপাঠের যে আয়োজন করা হয়েছিল, আয়োজকরা যতই তার সঙ্গে রাজনীতির যোগ ঢাকবার চেষ্টা করুন, বিজেপির তাবড় কেন্দ্রীয় নেতার উপস্থিতিই প্রমাণ করে এটি ছিল একটি পরিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি।
যত দিন যাচ্ছে মানুষের জীবনের সমস্যাগুলি তীব্র আকার নিচ্ছে। বেকারত্ব, দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষা-চিকিৎসার ব্যয়বৃদ্ধি জনসাধারণের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। যে দলগুলির নেতারা মন্দির-মসজিদ-গীতাপাঠ-কোরানপাঠ নিয়ে মহাশোরগোল তুলছেন, কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক হিসাবে তাঁদের তো প্রথম দায়িত্ব এবং সবচেয়ে জরুরি ছিল, এই জ্বলন্ত সমস্যাগুলি দূর করার চেষ্টা করা। তা না করে তারা সবাই যে ভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকেই একমাত্র রাস্তা হিসাবে বেছে নিচ্ছে তাতে স্পষ্ট যে, শাসক দলগুলির কারওরই জীবনের সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের কাছে যাওয়ার এবং সমর্থন পাওয়ার অন্য কোনও রাস্তা খোলা নেই।
আসলে কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দলগুলি সকলেই ক্ষমতালোভী দল। যে কোনও উপায়ে, এমনকি অতি হীন উপায়ে হলেও, ক্ষমতার দখল নেওয়া এবং তা নিরঙ্কুশ ভাবে ভোগ করাই এই দলগুলির নেতা-নেত্রীদের একমাত্র উদ্দেশ্য। তারা ভাল ভাবেই জানে, যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে একচেটিয়া পুঁজির একাধিপত্য, তখন এই পুঁজিপতি শ্রেণির মদত তথা আনুকূল্য বা পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া, তাদের দেওয়া অর্থ এবং প্রচার ছাড়া এই দলগুলির কারও পক্ষে ক্ষমতার গদিতে বসা সম্ভব নয়। সেই কারণেই পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থের বিরোধিতা করাও এই দলগুলির পক্ষে সম্ভব নয়।
এখানে আর একটি কথা মনে রাখতে হবে। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে রাজনৈতিক দল মানে শ্রেণি দল। বিশেষ শ্রেণির অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক স্বার্থ পূরণের জন্য বিশেষ ঢংয়ে একটা বিশেষ পার্টি গড়ে ওঠে। তাই বাস্তবে অনেক দল থাকলেও শ্রেণিগত বিচারে দল দুটো। একটি শোষিত মানুষ তথা শ্রমিক শ্রেণির দল। বাকি সব পুঁজিপতি শ্রেণির বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিভিন্ন দল। আর কে না জানে, জনগণের স্বার্থ অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ এবং পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ সম্পূর্ণ বিপরীত। একটি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করতে হলে অপর শ্রেণির স্বার্থ বিসর্জন দিতে হয়। মূল্যবৃদ্ধি থেকে বেকার সমস্যা, স্বাস্থ্য-শিক্ষার ব্যয়বৃদ্ধি সবই পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী নীতি এবং তাদের অবাধ শোষণ-লুণ্ঠনের ফল। তাই পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী দলগুলির কারও পক্ষেই জনজীবনের সমস্যাগুলির সমাধান সম্ভব নয়। এই দলগুলির প্রায় সবাই– হয় ক্ষমতায় রয়েছে, বা অতীতে ক্ষমতায় ছিল। এটা প্রমাণিত যে তাদের কারও শাসনেই জনজীবনের মৌলিক সমস্যাগুলি সমাধান দূরের কথা, সব সমস্যাই আরও তীব্র আকার নিয়েছে।
এই অবস্থায় এই দলগুলির কারওরই আর মানুষকে ধাপ্পা ছাড়া নতুন কিছু দেওয়ার নেই। নতুন করে বলার কিছু নেই। এমন কোনও প্রতিশ্রুতি বাকি নেই যা দিয়ে তারা মানুষের সমর্থন আদায় করতে পারে। তাই ভোটের ঢাকে কাঠি পড়তেই জনতার দখল নিতে নেমে পড়েছে ভোটসর্বস্ব দলগুলি। আর এই দখলদারিতে এদের সবার অস্ত্র ধর্ম। আসলে ধর্ম তো নয়, ধর্মের মোড়কে সাম্প্রদায়িকতার নগ্ন ব্যবহার। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কেউ মুসলিমদের কাছে ত্রাতার ভেক ধরেছেন, কেউ সেখানে ভাগ বসাতে বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছেন। তো কেউ হিন্দু ভোট এককাট্টা করতে রাম মন্দিরের শিলান্যাস করছেন, আবার কেউ ব্রিগেড ময়দানে গীতাপাঠের আসর বসাচ্ছেন।
ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দলগুলি এ রাজ্যকে এক সর্বনাশা পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দুর্বলতার কারণে এ দেশে সমাজের গণতন্ত্রীকরণের কাজটা সম্পূর্ণ হয়নি। জাতপাতের বিভেদ, ধর্মীয় বিভেদ, সাম্প্রদায়িকতার বিষ সমাজে থেকে গেছে। স্বাধীনতার পর থেকেই শাসকরা এই বিদ্বেষের বিষকে নিজ নিজ স্বার্থে কাজে লাগিয়েছে। দিনে দিনে মানুষের জীবনে যে ধরনের অনিশ্চয়তা বাড়ছে তাতে এক দিকে উদ্বেগ-ভয়, অন্য দিকে জীবনে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবের জন্য মানুষ অদৃষ্টের উপর আস্থা রাখতে চায়। মানুষের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এক দিকে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা, অন্য দিকে সাম্প্রদায়িক বিভেদের পাঁচিল তুলে মানুষকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র করে চলেছে শাসক দলগুলি। এতে পুঁজিপতি শ্রেণিরও সুবিধা।
এ কথা স্পষ্ট ভাবে বুঝতে হবে, এক সময় ধর্মের প্রগতিশীল ভূমিকা থাকলেও বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সকল অংশের মেহনতি মানুষের সামাজিক অগ্রগতির বিষয়টি এখন আর ধর্মের সঙ্গে জড়িত নেই। এটি জড়িত রয়েছে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। মানুষের জীবনের সমস্ত কর্মপ্রক্রিয়াই পরিচালিত হয় গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি, নিয়ম, আইনের দ্বারা। এর সাথে ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনার, মন্দির-মসজিদের, উপাসনার কোনও সম্পর্ক নেই। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষা-চিকিৎসার ব্যয়বৃদ্ধি কোনওটিরই সমাধান আজ আর ধর্মীয় পথে হওয়া সম্ভব নয়। সম্ভব নয় বলেই উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশের সাথে সাথে তার উপরিকাঠামোতে পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং তার ফলেই পুরনো ধর্মকেন্দ্রিক সামন্তী সমাজ বাতিল হয়ে গিয়ে পুঁজিবাদী সমাজের উদ্ভব হয়েছে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রীয় তথা সরকারি নীতিই যেখানে জনজীবনের সমস্যাগুলির উদ্ভবের জন্য দায়ী, সেখানে মন্দির বা মসজিদ তৈরির পিছনে বিপুল অর্থব্যয় বা তাকে ভিত্তি করে মানুষের আবেগকে উস্কে তোলার দ্বারা জীবনের মূল সমস্যাগুলির সত্যিকার সমাধানের জন্য শোষিত-মেহনতি মানুষের যে ঐক্য, যে লড়াই আজ সব চেয়ে জরুরি তা-ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে আজ যারা মেলাচ্ছেন তাঁদের লক্ষ্য, ধর্মের প্রতি মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত এবং দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থকে চরিতার্থ করা। মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেরা বিধায়ক, সাংসদ, মন্ত্রী হয়ে ক্ষমতা ভোগ করা। একই সাথে মানুষের বাঁচার লড়াইকে দুর্বল করার মধ্য দিয়ে শোষক তথা পুঁজিপতি শ্রেণির শোষণ-লুণ্ঠনকে নিশ্চিন্তে চালিয়ে যেতে সাহায্য করা। আর এ কাজ তারা করে বলেই পুঁজিপতি শ্রেণির অকুণ্ঠ আশীর্বাদ তাদের উপর ঝরে পড়ে।
কিন্তু সাধারণ মানুষ, যাঁরা সততার সঙ্গে ধর্ম চর্চা করেন, তাঁরা কেন এই সমস্ত ধুরন্ধর রাজনীতিকদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা চরিতার্থ করার দাবার ঘুঁটি হবেন? কেন তাঁরা প্রশ্ন করবেন না যে, ধর্মীয় সমাবেশ ধর্মীয় নেতাদের দ্বারাই পরিচালিত হবে, সেখানে রাজনৈতিক নেতারা পরিচালকের ভূমিকায় থাকবেন কেন? এর নাম কি ধর্মচর্চা? এ প্রশ্নগুলি যদি তাঁরা না করেন তবে তাঁরা বারবার শুধু প্রতারিতই হবেন। তাঁদের আবেগকে এই ধুরন্ধর নেতারা ক্ষমতার সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করবে।
কিন্তু তাঁরা তা করতে দেবেন কেন? না হলে এর দ্বারা শুধুতাঁরা প্রতারিতই হবেন না, সমাজে প্রগতিবিরোধী মৌলবাদী শক্তিগুলির দাপট বাড়তে সাহায্য করা হবে। যা সমাজকে আরও বিভেদের পথে, সংঘর্ষের পথে, রক্তপাতের পথে ঠেলে দেবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে নামিয়ে আনবে আরও বেশি দুর্ভোগ।
মনে রাখতে হবে, জীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি সমাধানে জনবিরোধী সরকারগুলিকে যদি কিছুটাও সক্রিয় করতে হয়, তবে শোষিত মানুষের ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনই একমাত্র রাস্তা। আর ধর্মের নামে বিভেদ সেই ঐক্যকেই দুর্বল করবে।