বিজেপির ভেজাল অনুপ্রবেশ তত্ত্ব ও তৃণমূলের ভোট-রাজনীতি

ক্লাসে প্রথম হওয়া ছাত্রটির যেমন খ্যাতি থাকে, তেমনই সবচেয়ে বদমায়েশ ছাত্রটিরও অনেক সময় খ্যাতি জুটে যায়। তবে তা কুখ্যাতি। ঠিক তেমনই কেন্দ্রের বিজেপি শাসনের অবস্থা। এক একটা (কু)কীর্তির জ্বালায় দেশের মানুষের বিজেপি শাসকদের ভোলার কোনও উপায় নেই। তা সে রাতারাতি লক ডাউন ঘোষণা হোক, নোট বাতিল হোক, কিংবা জিএসটি চালুই হোক। শাসক বিজেপি নেতাদের একটার পর একটা তুঘলকি ফরমানে দেশের মানুষকে তুর্কি নাচন নাচিয়ে ছাড়ছে। তার সর্বশেষ ফরমানটি নেমে এসেছে রাজ্যের বাংলাভাষী মানুষের উপর। বিশেষত, যাঁরা অন্য রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে যান।

বিজেপির প্রচার

‘বাংলাভাষী মানেই বাংলাদেশি’ এমন একটা তত্ত্ব প্রচার করে পরিযায়ী শ্রমিকদের নির্বিচারে গ্রেফতার করছে মূলত বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির প্রশাসন। আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ডের মতো সরকারি প্রমাণপত্র দেখিয়েও রেহাই পাচ্ছেন না তাঁরা। সঙ্গে রয়েছে গালাগালি, হেনস্থা ও মারধর। এই সব কাগজপত্র, মোবাইল, টাকাপয়সা কেড়ে নিয়ে কাউকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে তো কাউকে পুশব্যাক করা হচ্ছে বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে। এমনও ঘটেছে যে, বুলডোজার দিয়ে একজনকে কাঁটাতারের ওপারে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে।

এমন একটি বেআইনি, অসাংবিধানিক কাজ বিজেপি করছে কেন? পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য। এখানকার যে কোনও বাংলাভাষী নাগরিক দেশের যে কোনও প্রান্তে কাজকর্ম, ব্যবসাপত্র, পড়াশোনা, বসবাসের জন্য যাওয়ার এবং থাকার পূর্ণ অধিকারী। ঠিক যেমন অন্য রাজ্যের বহু মানুষ নানা প্রয়োজনে এ রাজ্যে এসে বসবাস করেন। বিজেপি নেতাদের কি বিষয়টি জানা নেই? না হলে তাঁরা এমন কাজ করছে কেন?

বিজেপি নেতাদের বক্তব্য, বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যায় মানুষ এ দেশে ঢুকে পড়েছে এবং তারা এ রাজ্যের সরকারের সহযোগিতায় আধার, রেশনের মতো নানা ধরনের কার্ড করিয়ে নিয়েছে। আচ্ছা, রাজ্যে রাজ্যে বাংলাদেশি অভিযোগে যাঁদের আটকানো হচ্ছে, তাঁরা সত্যিই বাংলাদেশি কি না, তা প্রমাণের দায়িত্ব কার? অভিযোগকারীর তো? তা হলে কেন অভিযুক্তদেরই তা প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে? বিজেপি নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতার মাশুল কেন দেশের একজন স্বাধীন নাগরিককে দিতে হবে? এ কি কোনও নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে আইন হাতে তুলে নেওয়া নয়? আর যদি সত্যিই জাল পরিচয়পত্র এমন ব্যাপক হারে তৈরি করা হচ্ছে বলে বিজেপি নেতাদের জানা থাকে তবে কেন্দ্রের এজেন্সিগুলি যারা হয় কথায় নয় কথায় বিরোধীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে– সেই এনআইএ, সিবিআই হাত গুটিয়ে রয়েছে কেন?

অন্য দিকে, সহনাগরিকদের একটি অংশ বিজেপি শাসকদের দ্বারা এ ভাবে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন তা দেখে দেশের বাকি বড় একটি অংশ হয় চুপ করে আছেন, নয়তো বিজেপির মিথ্যা প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে বলছেন, ঠিকই তো, এ দেশটা যদি বাংলাদেশি মানুষে ভরে যায় তবে তো আমরা এক সময় সংখ্যালঘু হয়ে যাব। তাই বাংলাদেশিদের তো চিহ্নিত করে দেশ থেকে বের করে দেওয়াই দরকার। যাঁরা এ কথা বলছেন, তাঁরা বিচার করে দেখছেন না যে, বিজেপি নেতাদের এই প্রচারের সঙ্গে বাস্তবের আদৌ কোনও মিল আছে কি নেই। বিজেপি নেতারা কোথাও তথ্য-প্রমাণ দিয়ে এ কথা বলছেন না।

অনুপ্রবেশ ছাড়া বিজেপির কোনও ইস্যু নেই

বাস্তবে অনুপ্রবেশ তত্ত্বটি বিজেপি-আরএসএসের একটি পুরানো রাজনৈতিক ইস্যু। এই মুহূর্তে বিজেপির হাতে অন্য কোনও ইস্যু নেই। দেশে তৃতীয় বারের জন্য বিজেপি শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবে এই দীর্ঘ শাসনে এমন কোনও সাফল্য নেই যা তারা দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারে এবং তা দিয়ে মানুষের সমর্থন আদায় করতে পারে। মূল্যবৃদ্ধি থেকে কর্মসংস্থান, শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, নারীর নিরাপত্তা থেকে দলিতদের জন্য সমান অধিকার– প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য শূন্য। নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। অথচ মানুষের হাতে কাজ নেই। রোজগার নেই। অতি প্রয়োজনীয় জিনিসটুকুও কিনতে পারছে না। দেশ বেকারে ছেয়ে গেছে। শুধু শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া মানুষেরাই নয়, শিক্ষিত মানুষও কাজের জন্য ছুটছে বিদেশে। একটু রোজগারের আশায় এমনকি বেআইনি পথেও উন্নত দেশগুলিতে ঢুকে পড়ছে। মৃত্যুর পূর্ণ আশঙ্কা জেনেও ভারতীয় বহু যুবক ইজরায়েলী সেনাবাহিনীতে গিয়ে ভাড়া খাটছে। সম্প্রতি আমেরিকা থেকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় বেআইনি ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের মার্কিন সামরিক বিমানে ফেরত পাঠানোর ঘটনা দেশে এখন আর কারও অজানা নয়। মহিলাদের খুন, ধর্ষণ বিজেপি শাসনে সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বাল্য বিবাহ, প্রসূতি মূত্যু অতীতের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ধনকুবেরদের মুনাফা অব্যাহত রাখতে অর্থনীতির পরিপূর্ণ সামরিকীকরণের পথে হাঁটছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। আর এই চরম জনস্বার্থবিরোধী কাজে জনসাধারণের সম্মতি আদায় করতে সরকারের ধামাধরা প্রচারমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ব্যাপক যুদ্ধোন্মাদনা।

এই অবস্থায় দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিক্ষোভ বাড়ছে। প্রায়ই এখানে ওখানে নানা অভিযোগকে কেন্দ্র করে তা ফেটে পড়ছে। এই অবস্থায় ক্ষুব্ধ মানুষের দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে দিয়ে রাজ্যে রাজ্যে নির্বাচনগুলিতে ক্ষমতা ধরে রাখতে বা দখল করতে মিথ্যা আর প্রতারণা ছাড়া বিজেপির সামনে আর কোনও রাস্তা খোলা নেই। এ ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। যদিও এটি বিজেপি-আরএসএসের কোনও নতুন হাতিয়ার নয়। ১৯৩৮-৪০ সাল থেকেই বিজেপির পূর্বসূরী হিন্দু মহাসভা এবং আরএসএস মুসলিম সংখ্যাবৃদ্ধির তত্ত্ব প্রচার করে সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার ভীতি ছড়িয়ে আসছে। এই প্রচারের পিছনে কোনও যুক্তি বা তথ্যই তারা আজ পর্যন্ত দেয়নি। অথচ তথ্য নেই তা কিন্তু নয়। তা হলে তারা তা ব্যবহার করে না কেন? করে না কারণ সেই তথ্যগুলি তাদের এই প্রচারের বিরুদ্ধেই যাবে। তাদের যুক্তির অসারত্বকেই প্রমাণ করবে। দেখা যাক কী বলছে এই তথ্য।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি কি ব্যাপক হারে ঘটছে

প্রথমে দেখা যাক, পশ্চিমবাংলায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্যিই ব্যাপক হারে ঘটছে কি না এবং মুসলিমদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হিন্দুদের সংখ্যা বৃদ্ধির গড় হারের থেকে অনেক বেশি কি না। দেখা যাচ্ছে, ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে রাজ্যে হিন্দু জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ছিল ১৪.২ শতাংশ, যা ২০০১ থেকে ২০১১ সালে কমে হয়েছে ১০.৮ শতাংশ। একই সময়ে মুসলমানদের জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ২৫.৯ শতাংশ থেকে কমে হয় ২১.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, সম্প্রদায়-নির্বিশেষে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়েছে। মুসলিম জনসংখ্যা কমার হার বেশি। এ বার জন্মহারের বিষয়টি একটু খেয়াল করা যাক। ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গে সার্বিক জন্মহার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট বা টিএফআর, অর্থাৎ এক জন মহিলা তাঁর জীবনে গড়ে মোট যতগুলি সন্তানের জন্ম দেন) ছিল ২.৬, যা ২০১১ সালে কমে হয় ১.৭ এবং ২০১৫-১৬ সালে হয় ১.৮। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে জন্মহার এই বছরগুলিতে ছিল যথাক্রমে ২.২, ১.৭ এবং ১.৬। মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ২০০১ সালে জন্মহার ছিল ৪.৬, যা মাত্র দশ বছরে কমে হয় ২.২ এবং ২০১৫-১৬ সালে হয় ২.১। অর্থাৎ, প্রতি মুসলমান মায়ের সন্তানসংখ্যা বিগত ১৫ বছরে কমেছে দুইয়ের বেশি। পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের মধ্যে জন্মহারের কমার পরিমাণ দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। যার ফলে মুসলমানদের জন্মহার প্রায় হিন্দুদের জন্মহারের কাছাকাছি চলে এসেছে। শিক্ষার প্রসার, সচেতনতা, সন্তানদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙক্ষা, এই সবই জন্মহার কমাতে সহায়ক ভূমিকা নিয়েছে।

সুতরাং, মুসলমানদের সংখ্যা ভারতে কখনও হিন্দুদের সংখ্যাকে ছাপিয়ে যাওয়ার সত্যিই কোনও আশঙ্কা নেই। বিজেপি-আরএসএস মানুষকে অযথা ভয় পাইয়ে দিয়ে হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক তৈরির লক্ষ্যেই এই মিথ্যা প্রচার চালায়।

অনুপ্রবেশঃ তথ্য কী বলছে

এ বার বিজেপি-আরএসএসের লাখে লাখে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ তত্তে্বর সত্যতা বিচার করা যাক। স্বাধীনতার পর বিরাট সংখ্যক ও-পার বাংলার মানুষ এ দেশে এসেছেন। সরকার তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে। এবং তাঁদের বেশির ভাগই হিন্দু। এ নিয়ে বোধহয় বিজেপিরও খুব মাথাব্যথা নেই। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কয়েক লক্ষ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের কথাও কারও অজানা নয়। যদিও তাদের প্রায় বেশির ভাগটাই স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে গেছেন বলে সরকারও মনে করে। অনুপ্রবেশের সাম্প্রতিক ছবিটা একবার দেখা যাক।

২০১১ সালের জনগণনার সময় পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী প্রায় ২২ লক্ষ মানুষ জানান যে তাঁদের জন্ম বাংলাদেশে। এঁদের মধ্যে ৫০ শতাংশ (১১ লক্ষ) মানুষ নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনার বাসিন্দা। তাঁরা মূলত মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। মুসলমান প্রধান জেলাগুলি যেমন মালদহ, মুর্শিদাবাদে বাংলাদেশকে নিজের জন্মস্থান বলা মানুষের সংখ্যা নগণ্য। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তথ্য এবং ২০১১ সালের জনগণনার রিপোর্ট দেখাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে কয়েক কোটি অনুপ্রবেশকারী আছে, এ কথাটি বিজেপি-আরএসএস বাহিনীর ডাহা মিথ্যা প্রচার ছাড়া কিছু নয়।

তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট-রাজনীতি

বিজেপির অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত সাজানো প্রচারের ফলে রাজ্যের বাংলাভাষী মানুষের দুর্গতি প্রতিরোধে তৃণমূল সরকারের ভূমিকাটি ঠিক কী? বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী মানুষদের উপর বাংলাদেশী তকমা লাগিয়ে হেনস্থার ঘটনা অনেক দিন ধরেই ঘটছে। এ রাজ্য সহ কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি দেশজুড়ে অনুপ্রবেশ ইস্যুটির ব্যাপক প্রচার করেছে। সে ক্ষেত্রে বলির পাঁঠা করা হচ্ছে দরিদ্র বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের। কারণ বিজেপি নানা রাজ্যে শয়ে শয়ে বাংলাভাষীদের গ্রেফতার করে দেখাতে চায় যে কী ভাবে বাংলাদেশিরা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা দেখাতে পারলে তার অনুপ্রবেশ তত্ত্বও সত্যি প্রমাণ হয়। কিন্তু রাজ্যের তৃণমূল সরকার কেন শুরু থেকেই এই ঘটনার প্রতিবাদ করেনি। কেন অন্য রাজ্যের সরকারগুলি এবং কেন্দ্রের সরকারের কাছে এর এমন বেআইনি কাজের জবাবদিহি চায়নি? কেন রাজ্যের মন্ত্রী এবং প্রশাসনের কর্তারা আইনি পথে তা আটকানোর চেষ্টা করেননি? বিজেপির এই হীন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কেন তাঁরা রাজ্যের মানুষকে সচেতন করেননি? কেন রাজ্য সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কাজগুলি করেনি তা স্পষ্ট হয়ে যায় গত ২১ জুলাই কলকাতায় তৃণমূলের সমাবেশে দলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রীর বক্তৃতা থেকেই। তিনি সে দিন বললেন, ‘‘আজ থেকে শুরু হল আন্দোলন। এখন থেকে প্রতি শনি ও রবিবার বাংলা ভাষার উপরে আক্রমণের প্রতিবাদে মিটিং-মিছিল করুন। এই আন্দোলন চলবে আগামী ভোটের ফল বেরোনো পর্যন্ত।’’ কেন বাংলাভাষীদের উপর আক্রমণের প্রতিবাদে তাঁদের আন্দোলন শুধুমাত্র ভোটের ফল বেরোনো পর্যন্তই চলবে? কেন সমস্যাটি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তা চলবে না? অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিলেন এটা ভোটের ইস্যু।

বাস্তবে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, কেন তাঁরা তাঁদের যা করার ছিল এতদিন তা করেননি। তাঁরা আসলে অপেক্ষা করছিলেন– সমস্যাটি আরও গুরুতর আকার নিক। সংখ্যালঘু মানুষের বিপন্নতা আর একটু বাড়ূক। অন্য দিকে ভোটও আরও কাছে আসুক। তখনই তাঁরা প্রতিবাদে ঝাঁপাবেন। অর্থাৎ বাংলাভাষী মানুষের উপর বিজেপির এই অন্যায় হামলা মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর দলের কাছে আদৌ কোনও গুরুতর সমস্যা নয়, শুধু ভোটের একটি ইস্যু মাত্র। অর্থাৎ তাঁদের সমস্ত প্রতিবাদের লক্ষ্যবিন্দু রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। ‘বাংলা ভাষা বিপন্ন’, ‘বাঙালি বিপন্ন’ আওয়াজ তুলে নিজেদের বাংলার ত্রাতা প্রমাণ করে ‘বাঙালি এক হও’ স্লোগান তুলে নির্বাচনে বাজিমাত করাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। অর্থাৎ অনুপ্রবেশ তত্ত্ব আওড়ে বিজেপি যেমন ভোট-রাজনীতি করছে, তৃণমূল কংগ্রেসও তেমনই ‘বাংলা বাঁচাও’ স্লোগান তুলে একই ভোট-রাজনীতির চর্চাতেই নেমেছে। না হলে, বাংলাকে বাঁচানো, বাংলা ভাষাকে বাঁচানো সত্যিই তাদের উদ্দেশ্য নয়। বাংলা মাধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থাটিকে শেষ করে দিয়ে তারা একই সঙ্গে বাংলা ভাষাকেও শেষ করছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতিকে এ রাজ্যে কার্যকর করে ভাষা-শিক্ষা-সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে তুলছে। অন্য দিকে চুরি-দুর্নীতি, খুন-ধর্ষণ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চার মধ্যে দিয়ে বাংলার উন্নত সংস্কৃতিকেও তারা শেষ করছে। বাংলা বাঁচানো আর যারই হোক তৃণমূল কংগ্রেসের কাজ নয়।

বিজেপি-তৃণমূলের ভোট-রাজনীতির বাইরে গিয়ে প্রতিরোধ গড়তে হবে

এই অবস্থায় রাজ্যের মানুষকে বিজেপি এবং তৃণমূলের সংকীর্ণ দলীয় ভোট রাজনীতির বাইরে গিয়ে নিজেদের সত্যিকারের সমস্যাগুলি সমাধানের সঠিক উপায় নিয়ে ভাবতে হবে এবং বিজেপির বাংলাদেশি তত্ত্বের উদ্দেশ্য এবং তার সর্বনাশা দিকটি সঠিক ভাবে উপলব্ধি করতে হবে। কেউ যদি মনে করেন যে এটা শুধু বাংলাভাষী মুসলিমদের সমস্যা তবে তা ভুল হবে। এখন হয়তো বিজেপির এই আক্রমণ প্রধানত মুসলিমদের উপরই ঘটছে। যদি এখনই ধর্ম নির্বিশেষে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা না যায়, যদি বিজেপি এই ষড়যন্ত্রের সফল হয় তবে আগামী দিনে তার আক্রমণের হাত থেকে কেউই রেহাই পাবে না। কারণ শাসক বিজেপির উদ্দেশ্য মানুষকে ধর্মে হোক, বর্ণে হোক আর প্রাদেশিকতাতেই হোক বিভক্ত করো এবং তার শোষণমুক্তি সংগ্রামকে দুর্বল করো। আসামে এনআরসি-র সময়ে অনেকের ধারণা ছিল তা শুধু মুসলিমদের স্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে। যখন এনআরসির তালিকা প্রকাশ পেল, দেখা গেল, ১৯ লক্ষ মানুষ যাদের রাষ্ট্রহীন ঘোষণা করা হয়েছে তাদের বড় অংশই হিন্দু। পুরুলিয়ায় হিন্দু পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপরেও হুমকি এসেছে, কোচবিহারে বসে আসাম থেকে এনআরসি নোটিশ যাঁরা পাচ্ছেন তাঁরাও হিন্দু। সদ্য উত্তরপ্রদেশে কাঁওয়ার যাত্রার সময়ে যখন সরকার রাস্তার দু’দিকে মুসলিম দোকানদারদের নাম এবং ধর্মপরিচয় প্রকাশ্যে টাঙিয়ে রাখার নিদান দিয়েছিল তখন হিন্দু দোকানদাররা প্রতিবাদ করেননি। বাস্তবে দেখা গেল, কাঁওয়ার যাত্রীরা শুধু মুসলিমদের দোকানেই হামলা চালায়নি, হিন্দুদের দোকানেও জিনিস নিয়ে দাম না দেওয়া, তুচ্ছ অভিযোগে ভাঙচুর চালানো নির্বিচারে ঘটিয়েছে। এখন দোকানদাররা হিন্দু-মুসলমান ঐক্যবদ্ধ ভাবে প্রশাসনের কাছে জানাতে বাধ্য হয়েছে যে, আগামী বছর থেকে তারা এই কাঁওয়ার যাত্রার সময়ে রাস্তা দুদিকের সমস্ত দোকান বন্ধ রাখবেন।

তাই যা করার এখনই করতে হবে। অনুপ্রবেশের ফাঁপানো প্রচার তুলে ভোট রাজনীতির বিপদ অনুধাবন করা দরকার। এই সঙ্গে বোঝা দরকার বাঙালি অস্মিতার নামে প্রাদেশিকতাবাদের বিপদ। কেন্দ্র ও রাজ্যে আসীন দুই সরকার এ ভাবে আগুন নিয়ে খেলছে। যাদের কাজ হওয়া উচিত ঐক্য সংহতি রক্ষা তারাই জল দিচ্ছে বিভেদের বিষবৃক্ষে। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে শোষিত মানুষের সমানে এ এক গুরুতর বিপদ।   তথ্য সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০