Breaking News

নেপালের তরুণ প্রজন্মের রক্তদানকে সম্মান দেখাতে হবে — নেপাল রাজনৈতিক মতবিনিময় মঞ্চ

নেপালের তরুণ প্রজন্মের (জেন জি) ঐতিহাসিক আন্দোলন বা বাণেশ্বর অভ্যুত্থানে বহু তরুণের প্রাণ বলিদানের মধ্য দিয়ে অত্যাচারী ওলি সরকারের পতন ঘটেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে ১৩ সেপ্টেম্বর (নেপালি ক্যালেন্ডারে ২৭ ভাদ্র) প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ও সর্বস্তরে ছেয়ে যাওয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে ৮ সেপ্টেম্বর তরুণ প্রজন্মের যে বিক্ষোভ ফেটে পড়েছে, তা বাস্তবে ছিল নেপালের পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থার সামগ্রিক সংকটের ফলে জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। নেপালের রাজনীতিতে এই গণবিস্ফোরণ ঐতিহাসিক ছাত্র-যুব অভ্যুত্থান হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওলি সরকারের হিংস্র দমননীতির ফলে ৫০ জনের বেশি তরুণ শহিদ হয়েছেন, শত শত আহত এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের দাবি, অবিলম্বে অভ্যুত্থানে জীবন বলি দেওয়া তরুণদের সকলকে শহিদের মর্যাদায় ভূষিত করুন, সমস্ত আহতের বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। আমরা সমস্ত শহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা জানাই।

কে পি ওলি পরিচালিত অত্যাচারী, উদ্ধত, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং স্বৈরাচারী সরকার জনগণের কথাটুকু পর্যন্ত শুনতে রাজি ছিল না। এই সরকার ছাত্র ও তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে শুধু নয়, আন্দোলনের শক্তি সমস্ত প্রধান রাজনৈতিক দলের দাপট এবং ঔদ্ধত্যকেও ধ্বংস করেছে। এই দলগুলো কখনও শাসক হিসাবে, কখনও বিরোধী হিসাবে বুর্জোয়া সংসদীয় ব্যবস্থায় চলা সীমাহীন দুর্নীতিতে একেবারে ডুবে আছে। যদিও একজন শাসকের পতন ঘটলে কিংবা তাকে উচ্ছেদ করলেই দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে না। কারণ, দুর্নীতি, অনিয়ম, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, আর্থিক বৈষম্য এই সব কিছুর ভিত্তি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত। সমস্ত বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো ২০০৫-০৬ থেকেই এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কুকর্মের অংশীদার। নেপালি কংগ্রেস, ইউএমএল এবং মাওবাদীরা পালা করে ক্ষমতায় বসেছে। মাওয়িস্ট সেন্টার সাম্প্রতিক সময়ে বক্তৃতা এবং স্লোগানে জোর গলায় দুর্নীতি বিরোধী স্লোগান তুলছে বটে কিন্তু এটা স্পষ্ট যে তারা অনেক দিন আগেই জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা জলাঞ্জলি দিয়ে আদর্শগত এবং নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। সরকারি গদির অংশীদার হয়ে তার ভাগ পাওয়ার জন্য তারা বিপ্লবী আদর্শ ও তার প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করেছে। পুরনো শাসক দল কংগ্রেস-ইউএমএল এবং মাওয়িস্ট সেন্টার কিছুদিন আগে মহান গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় বসেছিল। এই তিনটি দলই চলতি সময়ের বিকৃত সংসদীয় রাজনীতি ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থার অংশীদার। এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এই কারণেই এই তিন দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ও ছাত্রযুবদের ক্রোধের প্রকাশঘটেছে সবচেয়ে বেশি।

৮ সেপ্টেম্বরের অভ্যুত্থানকে ‘ক্ষমতা লোভীদের দ্বন্দ্ব’, ‘বহিঃশক্তির চক্রান্ত’, অথবা এটাকে ‘প্রতিক্রিয়াশীলদের পরিকল্পনা’ হিসাবে তুচ্ছ করার অর্থ ঘুরপথে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা ও তার শাসকদেরই রক্ষার চেষ্টা। যাঁরা এই অভ্যুত্থানের পিছনে বাস্তব কারণ দেখতে চান না, তাঁরা জনগণের যে কোনও অভ্যুত্থানকেই ‘চক্রান্ত তত্ত্বের’ লেন্স দিয়ে দেখতে চান। অবশ্যই এই আন্দোলন কোনও আদর্শগতভাবে কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বের সুচিন্তিত কর্মধারা ও সুসংগঠিত শক্তির ডাকে শুরু হয়নি। সংবাদমাধ্যমে যেমন দেখানো হয়ছে তেমন করে এই আন্দোলন একটি বা দুটি গ্রুপের ডাকেও শুরু হয়নি। যদিও বিশ্বের ইতিহাস একাধিকবার দেখিয়েছে এই ধরনের অভ্যুত্থানে আদর্শগত, সাংগঠনিক এবং লক্ষ্য স্থির করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকে। বহু বারই দেখা গেছে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং শক্তিশালী সাংগঠনিক শক্তির উদ্যোগ ছাড়াই একটা অভ্যুত্থান সরকারকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে, কিন্তু নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। একই সাথে এই কথা সত্য যে, দেশের ভিতরের এবং বাইরের ক্ষমতালোভী গোষ্ঠীগুলি নিজেদের হীন স্বার্থে এই ধরনের অভ্যুত্থানকে ব্যবহার করা ও তাকে বিভক্ত করার চেষ্টা করে থাকে। এই আন্দোলনের সময়েও তা দেখা গেছে। তা সত্ত্বেও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে জনগণের বুকে তিল তিল করে জমা হওয়া ক্ষোভই যে বাণেশ্বর অভ্যুত্থানের মূল শক্তি, এই সত্যের অবমূল্যায়ন করতে পারি না আমরা।

এই প্রেক্ষিতে সফল জেন জি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত অন্তর্বর্তী সরকারকে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতাকে পূর্ণ মর্যাদা দিতে হবে। বিক্ষোভকারীদের সমস্ত ন্যায্য দাবি সর্বোচ্চ মাত্রায় পূর্ণ করতে হবে। একই সাথে দেশকে আরও প্রগতিশীল রাস্তায় নিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। এই অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুত যে কাজগুলি করতে হবে–

১। ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর নিহত সমস্ত বিক্ষোভকারীকে শহিদের মর্যাদা দিতে হবে। সরকারি দায়িত্বে সমস্ত আহতের চিকিৎসা ও খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে।

২। বর্তমান সংবিধানের সীমাব্ধতা সত্ত্বেও এতে যতটুকু প্রজাতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং সকলের কল্যাণের ব্যবস্থার কথা আছে তার পূর্ণ ব্যবহার করতে হবে।

৩। দুর্নীতি, আর্থিক অসাম্য, বেকারি, মূল্যবৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্যের মতো সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে হবে। এ জন্য আমরা সংবিধানের প্রগতিশীল সংশোধন দাবি করছি। ব্যাপক রাজনৈতিক ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতিকে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হতে হবে। আন্দোলনের মূল সুরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আর্থিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন করতে হবে।

৪। কঠোর ভাবে দুর্নীতি দমনের জন্য উচ্চ পর্যায়ের কমিশন নিযুক্ত করতে হবে। তাদের সমস্ত রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মচারি, নেতাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও ব্যবসায়ীদের সম্পদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের অধিকার দিতে হবে।

৫। সরকারি দপ্তরে ঘুষ ও দীর্ঘসূত্রতা নির্মূল করতে বিশেষ নজর দিতে হবে। লাগামছাড়া দামের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। নানা বিষয়ে জনগণ যে দুর্দশা ও সমস্যার সম্মুখীন হয়, তার সমাধানে ব্যবস্থা করতে হবে।

৬। প্রগতিশীল নির্বাচনী সংস্কার করতে হবে। টাকার জোরে ভোটে জেতা ও জেতার পর জনগণের ও রাষ্ট্রের সম্পদ লুঠ করা রুখতে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

৭। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অন্যায় ও দুর্নীতি করলে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ‘রাইট টু রিকল’-এর ব্যবস্থা করতে হবে। তাতে আইনি পথেই দুর্নীতিগ্রস্ত শাসককে সরাতে পারা যাবে, রাস্তায় নামার প্রয়োজন হবে না। তরুণ প্রজন্মের ঝরানো রক্তের প্রতি এটাই হবে সম্মান প্রদর্শন।

সঙ্গীত, সমন্বয়ক