
‘‘ঐতিহ্যের কথা যদি বলা হয়, আমি তো মনে করি, ভারতবর্ষের ঐতিহ্যের সবচেয়ে গর্ব করার মতো একটা বড় জিনিস রয়েছে। তা হল, সুদূর অতীতকাল থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের আগে পর্যন্ত ভারতবর্ষ অনেক সময়ই জবরদস্তি নিজের মত অপরের ঘাড়ে চাপাত না– যেটা ইউরোপে বা অন্য দেশে এবং ধর্ম বিস্তারের ক্ষেত্রে বহু সময় ঘটেছে। কিন্তু ভারতবর্ষে সেরকম প্রায় হয়নি।
একটা মত আর একটা মতের সঙ্গে তর্ক করেছে, বিচার করেছে। বিচারে যে পক্ষ জিতে গিয়েছে, অপর পক্ষ নির্দ্বিধায় আনন্দের সঙ্গে তাকে গুরু বলে মেনে নিয়েছে। শঙ্করাচার্যের কাহিনি থেকে দেখুন। শঙ্করাচার্য তখন যুবক। অন্য দিকে মণ্ডন মিশ্র বয়সে বড় এবং সেই সময় হিন্দু সমাজের প্রতিষ্ঠিত সুপণ্ডিত। যখন শঙ্করাচার্য মণ্ডন মিশ্রের সাথে অদ্বৈত দর্শন নিয়ে আলোচনা করতে গেলেন, শঙ্করাচার্য বললেন মণ্ডন মিশ্রকে, ‘আপনার স্ত্রী আদিভারতী বিচার করবেন।’ সকলে বলল, উনি তো মণ্ডন মিশ্রর স্ত্রী। শঙ্করাচার্য বললেন ‘তা হোক, উনি পণ্ডিত, সুবিচার করবেন।’ তর্ক হল। স্ত্রী রায় দিলেন, মণ্ডন মিশ্র হেরে গেলেন। হেরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু সমাজের অতবড় একজন প্রতিষ্ঠিত নেতা, যার কথায় হিন্দুসমাজ চলত, তিনি সঙ্গে সঙ্গে শঙ্করাচার্যকে গুরু বলে স্বীকার করে নিলেন। এই তো ভারতবর্ষের ঐতিহ্য। কংগ্রেস ঐতিহ্যের কথা বলে। বহু লোক ঐতিহ্যের কথা বলে। যদি ঐতিহ্যের কথা বলে, তা হলে রাস্তা ঠিক কি ভুল, তা নিয়ে যুক্তিবাদী আলোচনা হোক। যদি যুক্তিসঙ্গত হয়, গ্রহণ করা। আর, তা না করলে বুঝতে হবে, ভারতীয় ঐতিহ্য বলাটা একটা চালাকি মাত্র, একটা ভাঁওতা মাত্র। ভারতের গৌরব করার ঐতিহ্য আর কী আছে? আমি দেখি, সুদূর অতীতে ভারতবর্ষের অনেক জিনিস গৌরব করার মতো ছিল। তারপর থেকে একটা যুগ অন্ধকার। আর একটা অধ্যায় রামমোহন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত আমাদের গর্ব করার, যেটা চলে গিয়েছে। আবার অন্ধকার। এই তো ভারতবর্ষ! তাহলে ভারতীয় পরম্পরা ও ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে এই মানসিকতাই তো প্রতিফলিত করতে হবে। কই সেই মানসিকতা? কাজেই এ সব বক্তৃতা থাক। তারা কেউ ভারতীয় পরম্পরা-টরম্পরা নিয়ে মাথা ঘামায় না, ঐতিহ্য নিয়েও ঘামায় না। আর তাদের জ্ঞান-বিদ্যা-বুদ্ধিও অনেকেরই সমান। কাজেই ও-সব বড় বড় কথা থাক। আসল কথা হচ্ছে, একদিকে মানুষের অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অন্য দিকে দেশপ্রেম– একটা সমাজে যেটা থাকে, তার উপরে কাজ করে তারা প্রগতির গলা টিপে ধরতে চাইছে।’’
‘উন্নত নৈতিক মান ও সঠিক রাস্তায় লড়াই চাই’ থেকে