Breaking News

এ বার আইএসআইকে কুক্ষিগত করতে চায় বিজেপি সররকার

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে রাশিবিজ্ঞান চর্চার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ১৯৩১ সালে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (আইএসআই) নামক প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করেন। বর্তমানে এর কেন্দ্রীয় দপ্তর বরানগর অঞ্চলে অবস্থিত। ১৯৫৯ সালে ভারত সরকার এই প্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার বজায় রেখে একে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসাবে ঘোষণা করে এবং গবেষণার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনা করার সুযোগ চালু হয়। কিন্তু আজ রাষ্ট্রের কর্তারা দেশের সমস্ত সম্পদই মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে তুলে দিতে উদ্যত। শিক্ষাব্যবস্থার এক দিকে যেমন বেসরকারিকরণ চলছে, অন্য দিকে পাঠক্রমের মধ্যে দিয়ে অবৈজ্ঞানিক চিন্তাকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে যাতে সত্য অনুসন্ধানের পথ অবরুদ্ধ হয়। এই পরিস্থিতিতে আইএসআই এর মতো প্রতিষ্ঠান যেখানে পাঠক্রম, গবেষণা ইত্যাদির দিক নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার রয়েছে তা সরকারের চক্ষুশূল হওয়া স্বাভাবিক।

২৭ অক্টোবর কেন্দ্রীয় মন্ত্রক এক বিল প্রকাশ্যে আনে যাতে আইএসআই সংক্রান্ত পুরানো আইনকে বাতিল করে নতুন আইন নিয়ে আসার কথা বলা হয়। এই বিলে বলা হয়েছে সরকারের থেকে আর্থিক অনুদানের ভরসায় না থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যে এগোতে হবে এবং তার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে বেতন চালু করার কথাও উল্লেখ রয়েছে। ফলে ভারতের মুষ্টিমেয় যে ক’টি উন্নত মানের প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে পড়াশুনা করা এবং স্টাইপেন্ড পাওয়ার সুযোগ ছিল সেখানেও আঘাত নেমে আসবে। মহলানবীশের দান করা জমির উপর তৈরি আইএসআই এর সমস্ত সম্পত্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার ভার সম্পূর্ণরূপে চলে যাবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে, অবলুপ্ত হবে আইএসআই সোসাইটি। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার যে নতুন বোর্ড হবে তাদের কথামতো চলতে না পারলে তিন মাসের বেতন দিয়ে প্রফেসর ও কর্মচারীদের বরখাস্ত করে দেওয়ার হুমকিও রয়েছে এই বিলে।

কিন্তু শুধুই কি কর্মী সঙ্কোচন, ফি চালুর মধ্য দিয়ে সরকার কিছু আর্থিক খরচ কমাতে চাইছে, নাকি আইএসআই-এর অধ্যাপকদের সঙ্গে কোনও পরামর্শ না করেই এই বিল আনার পিছনে অন্য মতলব রয়েছে?

জাতীয় শিক্ষানীতির মাধ্যমে ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমের নামে অন্ধ বিশ্বাসের যে সংস্কৃতি তারা সমাজে ছড়াতে চাইছে, সেই পথ সুগম করাই সরকারের মুখ্য উদ্দেশ্য। আমরা এর আগে দেখেছি আইআইটি-মাদ্রাজের ডিরেক্টর গো-মূত্রের গুণাগুণ বিচার করেছেন, বিজেপি দলের সাংসদ স্কুল ছাত্রদের শিখিয়ে এসেছেন প্রথম মহাকাশে গিয়েছিলেন স্বয়ং হনুমান। সাম্প্রতিক কালে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, মহলানবীশের গবেষণাকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে বর্ণবাদের হাতিয়ার তুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আইএসআই-এর অধ্যাপক, ছাত্র, কর্মচারীরা এই ঘটনাকে ধিক্কার জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এই রকম একজন মানুষ কী ভাবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে নিযুক্ত থাকতে পারেন?

এই নতুন বিল বাতিল করার দাবিতে আইএসআই-এর ছাত্র, অধ্যাপক, কর্মীদের পাশাপাশি সরব হয়েছে ব্রেকথ্রু সায়েন্স সোসাইটি। গত ৩০ অক্টোবর এই সংগঠনের পক্ষ থেকে আইএসআই-এর গেটে বিক্ষোভ দেখানো হয়। অল বেঙ্গল সেভ এডুকেশন কমিটি এই বিল বাতিল করার দাবিতে মন্ত্রকের উদ্দেশে ডেপুটেশন দাখিল করে আইএসআই-এর ডিরেক্টরের কাছে। বরানগর নাগরিক প্রতিরোধ মঞ্চের উদ্যোগে এই বিল বাতিল করার দাবিতে আইএসআই সংলগ্ন এলাকায় লাগাতার আন্দোলন চলছে। ইতিমধ্যে আইএসআই সোসাইটির বৈঠক হয়। সূত্রের খবর, সেখানে ডিরেক্টর ছাড়া প্রত্যেকে এই বিল প্রত্যাহার করার পক্ষে তাঁদের মতামত দেন। তাই সোসাইটির অন্য সকলে ডিরেক্টরকে অনুরোধ করেন সোসাইটির সচিব হিসাবে বিল প্রত্যাহার করার দাবি তিনি যেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের কাছে পৌঁছে দেন।

এই পরিস্থিতিতে ১১ নভেম্বর সকালে আইএসআই-এর হোস্টেলের গেটে মুসলিম বিরোধী লেখা ছাত্রদের নজরে আসে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক বিভেদের কোনও স্থান ইতিপূর্বে ছিল না। অনেকেই মনে করছেন এই ঘটনা, আইএসআই বিল নিয়ে যে প্রতিবাদ চলছে তা থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার অঙ্গ। যদিও এই ঘটনা আইএসআই-এর সর্বস্তরে নিন্দিত হয়েছে এবং ছাত্র-ছাত্রী-অধ্যাপকদের উদ্যোগে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানান হয়েছে। যে সমস্ত নাগরিক ও বিজ্ঞান সংগঠন এই বিলের প্রতিবাদে পথে নেমেছেন সকলেই মনে করছেন এ ভাবে আইএসআই বিল বিরোধী আন্দোলনকে দমিয়ে ফেলা যাবে না।