
গত ১৯ জুলাই থেকে উজানী আসামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপে এই বন্যা সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যাগুলির মধ্যে অন্যতম। শিবসাগর, চরাইদেও, জোড়হাট, গোলাঘাট– এই চারটি জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। নাগাল্যান্ডের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হওয়ার দিখৌ নদী এবার শিবসাগর জেলার বন্যায় মূল ভূমিকা পালন করেছে। এ ছাড়া নাগাল্যান্ড থেকে আসা ভোগদই ও জাঁজি নদীও এই বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে। সরকারি হিসেবে একশো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যদিও বাস্তবে সংখ্যাটা কয়েক গুণ বেশি। এ ছাড়াও দেড় লক্ষ মানুষ আক্রান্ত। ধ্বংস হয়েছে তিরিশ হাজারের বেশি বাড়ি ও হাজার হাজার বিঘা জমির ফসল। বহু মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
প্রশ্ন উঠছে, আসামের এই ভয়াবহ বন্যার কারণ কি শুধুই প্রাকৃতিক, নাকি এতে মানুষেরও ভূমিকা রয়েছে?
নাগাল্যান্ডের পাহাড় থেকে উৎপন্ন ও ব্রহ্মপুত্রতে গিয়ে মিলিত হওয়া এই নদীগুলি এত ভয়ানক হয়ে উঠল কেন? জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে নাগাল্যান্ডের পাহাড়ে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতের ফলে নদীগুলিতে জল বাড়তে থাকে। সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ সতর্কবাণী বা আসন্ন বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ কোনও উদ্যোগ ছিল না। ১৯ তারিখে নাগাল্যান্ডের পাহাড়গুলিতে বেশ কিছু ধস নামলে নদীগুলি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে ও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়ে।
প্রখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ শৈলেন বড়ঠাকুর ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নদী বিশেষজ্ঞ নয়ন সারমার মত অনুযায়ী এ বারের ভয়াবহ বন্যা মূলগত ভাবে মনুষ্যসৃষ্ট। প্রথমত, দিখৌ নদী সহ প্লাবিত নদীগুলির দুই কূল জুড়ে প্রচুর কয়লা ও পাথর খাদান রয়েছে। নাগাল্যান্ডের পাহাড়ে বিশাল এলাকা জুড়ে র্যাট হোল মাইনিং সহ বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে। এর ফলে পাহাড়ে মাটিক্ষয় বেড়ে গেছে এবং পাথর, বালি ও মাটি নদীগুলিতে এসে মিশেছে। সেই কারণে নদীগুলির জলধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, অবৈজ্ঞানিক ভাবে খননকাজ চালানো ও বনভূমি ধ্বংসের ফলে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে পড়েছে। ফলে ভূমিধস বৃদ্ধি পেয়েছে। তৃতীয়ত, এই খনিগুলিতে ধস নামার ফলে সেখানে জমে থাকা জল মুক্ত হয়ে নিচে নেমে এসেছে। আসাম সরকারের পক্ষ থেকে শুধু অতিবৃষ্টিকে কারণ হিসেবে দেখানো হলেও আসল কারণগুলি জনসমক্ষে চলে আসার পরেই শুরু হয়েছে আসাম ও নাগাল্যান্ড দুই রাজ্যের সরকারের একে অপরের বিরুদ্ধে দোষারোপ। কিন্তু কেন্দ্র সহ এই দুটি রাজ্যেই রয়েছে বিজেপির সরকার। তাই এর মাধ্যমে বিজেপির জনগণের প্রতি চূড়ান্ত উদাসীনতাই ফুটে ওঠে।
বন্যার পরেই এসইউসিআই(কমিউনিস্ট)-এর কর্মীরা উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ব্যাপক অংশের সাধারণ মানুষ ত্রাণ তহবিলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। চাল, ডাল, শুকনো খাবার, জল, সাবান, ফিনাইল সহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী আক্রান্ত মানুষদের দেওয়া হয়। জল নামার সঙ্গে সঙ্গেই স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে ঘরবাড়ি মেরামত ও পরিষ্কার করার কাজ শুরু হয়। বহু সাধারণ মানুষ ও ছাত্রছাত্রী এই কাজগুলিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। বিভিন্ন জায়গায় নানা রোগের প্রকোপ দেখা দিতে শুরু কর়লে স্বাস্থ্যশিবিরের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এসইউসিআই(কমিউনিস্ট)-এর উদ্যোগে ও সহায়তায় নাগাল্যান্ড ও আসামের বেশ কিছু বন্যাবিধ্বস্ত এলাকায় স্বাস্থ্যশিবির করা হয়। ওড়িশা থেকে ডাঃ প্রাজ্ঞ অনির্বাণ, পশ্চিমবঙ্গ থেকে ডাঃ শাহরিয়র আলম, ডাঃ বিক্রম মণ্ডল ও ডাঃ রাজ বর্মন ও ক্রিটিকাল কেয়ার প্যারামেডিক মিঠুন মাইতি, আসাম থেকে ডাঃ চিত্রলেখা দাস, ডাঃ কৌশিক ও ফার্মাসিস্ট মিঃ ভাইটি রিশং অংশগ্রহণ করেন। শিবিরে আসা রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে সেখানকার স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্দশা নজরে আসে। নাগাল্যান্ডের মন ও টিজিট শহরে মেডিকেল ক্যাম্প করে কয়েকশো বন্যাবিধ্বস্ত মানুষের চিকিৎসা করা হয়।