
নভেম্বর বিপ্লবকে (রুশ পুরনো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী অক্টোবর বিপ্লব) নিছক ‘জাতীয় সীমার মধ্যে আবদ্ধ’ একটি বিপ্লব মনে করা ঠিক নয়। নভেম্বর বিপ্লব মূলত বিশ্ববিপ্লব। এর তাৎপর্য আন্তর্জাতিক। কারণ এই বিপ্লবের মধ্যে রয়েছে মানব-ইতিহাসের এক বৈপ্লবিক পালাবদলের, পুরনো পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে নতুন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের সূচনা।
অতীতে যে সব বিপ্লব ঘটেছে, তা সাধারণত সরকারি ক্ষমতায় বসে থাকা এক দল শোষকের উচ্ছেদ এবং তার বদলে অপর এক দল শোষকের ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে। শোষক বদলেছে কিন্তু শোষণটা থেকেই গিয়েছে। দাসদের মুক্তিসংগ্রাম এ ভাবেই শেষ হয়েছিল। এমনটাই ঘটেছিল ভূমিদাসদের বিপ্লবেও। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং জার্মানির মহান বিপ্লবগুলিতে একই ঘটনা ঘটেছিল। আমি অবশ্যই এখানে প্যারি কমিউনের কথা বলছি না। প্যারি কমিউনেই সর্বপ্রথম সর্বহারা শ্রেণি পুঁজিবাদকে খতম করে মানব ইতিহাসে নবযুগ সৃষ্টির মহান ও দুঃসাহসী চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল।
অতীতের সমস্ত বিপ্লবের সঙ্গে নভেম্বর বিপ্লবের পার্থক্যের চরিত্র মৌলিক। এক ধরনের শোষণের বদলে ভিন্ন ধরনের শোষণ, বা এক দল শোষকের বদলে ভিন্ন আর এক দল শোষককে নিয়ে আসা এর লক্ষ্য ছিল না, এই বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল– মানুষের দ্বারা মানুষের সর্বপ্রকার শোষণের অবসান, সব ধরনের শোষকগোষ্ঠীর উচ্ছেদ, সর্বহারার একনায়কত্বের প্রতিষ্ঠা, ইতিহাসে এ যাবৎ নিপীড়িত সকল শ্রেণির মধ্যে সবচেয়ে বিপ্লবী সর্বহারা শ্রেণিকে ক্ষমতায় আনা এবং একটি নতুন শ্রেণিহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। ঠিক এই কারণেই, নভেম্বর বিপ্লবের বিজয় মানব সমাজের ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করেছে, বিশ্বপুঁজিবাদকে ইতিহাস-নির্ধারিত পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে, দেশে দেশে সর্বহারা শ্রেণির মুক্তি আন্দোলনের বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটিয়েছে। গোটা দুনিয়ায় শোষিত জনগণের সংগ্রামের পদ্ধতি, সংগঠনের চেহারা, জীবনযাত্রা ও রীতিনীতি, সংস্কৃতি ও আদর্শের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে।
এই মূল কারণগুলির জন্যই নভেম্বর বিপ্লব বিশ্ববিপ্লব, এর তাৎপর্য আন্তর্জাতিক। এই কারণেই, সকল দেশের শোষিত শ্রেণিগুলি নভেম্বর বিপ্লবকে সুগভীর সহমর্মিতায় সমৃদ্ধ করেছে। নভেম্বর বিপ্লবকে তারা নিজেদের মুক্তি সংগ্রামের দিশারি বলে গ্রহণ করেছে।
(১৯২৭-এ নভেম্বর বিপ্লবের দশম বার্ষিকী উপলক্ষে প্রাভদা পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে)