Breaking News

পহেলগামের পর দিল্লি মৃত্যুমিছিলের শেষ কোথায়

পহেলগামের পর আবার লাল কেল্লা। পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলায় ২৬ জন পর্যটকের মৃত্যুর পর খোদ রাজধানী দিল্লির লাল কেল্লার সামনে তীব্র বিস্ফোরণে ৯ জনের মৃত্যু হল। গত ১০ নভেম্বর সন্ধ্যায় লাল কেল্লার সামনে ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়িতে তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী বিস্ফোরণে ৯ জন নাগরিকের মৃত্যু হয়। বেসরকারি মতে সংখ্যাটা দ্বিগুণ। আহত হন অসংখ্য মানুষ।

পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার পরও দেশ জুড়ে গোয়েন্দা ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছিল। এ বারও গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। দিল্লির বিস্ফোরণের আগেই হরিয়ানার ফরিদাবাদ থেকে ৩০০০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার হয়। তারপরও গোয়েন্দা বাহিনী কেন সতর্ক হল না? এত বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক নিয়ে কাশ্মীর থেকে প্রায় ৭০০ কিমি পেরিয়ে অভিযুক্তরা দিল্লি এসেছে বলে সরকারের বয়ান যদি সঠিক হয়, তা হলে প্রশ্ন, তারা এত গোয়েন্দা নজর এড়িয়ে তা পারল কী ভাবে? ফরিদাবাদে প্রায় ৩ হাজার কেজি বিস্ফোরকই বা কী ভাবে আনা হল? জম্মু-কাশ্মীর ও দিল্লির নিরাপত্তার দায়িত্ব সিআরপিএফ, বিএসএফ এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন। সবগুলি সংস্থাই এক সঙ্গে ব্যর্থ হল? ঘটনায় কারা জড়িত তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই এ বিষয়টিও তো সমান গুরুত্বপূর্ণ যে এতগুলি নিরাপত্তা সংস্থার চোখ এড়িয়েই তা ঘটতে পারল কী করে? এর দ্বারা সংস্থাগুলির অক্ষমতার বিষয়টিই তো সামনে চলে এল এবং একের পর এক ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতাও স্পষ্ট হয়ে গেল।

এর আগে নোট বাতিলের সময় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশে সন্ত্রাসবাদের কোমর ভেঙে গেছে। তারপর পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার পর পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের সময় সরকার ঘোষণা করেছিল যে, পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের ঘাঁটিগুলি ভারতীয় সেনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সন্ত্রাসবাদী সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদের কোমর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার মাত্র কয়েক মাস পর দিল্লির এই বিস্ফোরণ থেকে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র্রমন্ত্রীর সেই ঘোষণার বাস্তব ভিত্তি কতটুকু ছিল? এ বার অবশ্য এখনও পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী বা বিজেপির কোনও নেতা-মন্ত্রীই বিস্ফোরণের সঙ্গে পাকিস্তানের যোগের কথা বলেননি। এর আগে এমন প্রতিটি বিস্ফোরণ বা সন্ত্রাসবাদী হামলার পরই যে কথা অনায়াসে বলে দেওয়া হত। ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ তথা অপারেশন সিঁদুরের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছিলেন, ভারত ভবিষ্যতে যে কোনও সন্ত্রাসবাদী হামলাকে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসাবে দেখবে।

সেই হুঙ্কারের কথা দেশবাসী এখনও ভুলে যায়নি বলেই কি দিল্লির ঘটনায় জইশ-ই-মহম্মদের দিকে সন্দেহের তীর থাকলেও ঘটনায় পাকিস্তান যোগের কথা বিজেপি নেতারা এ বার আর আগের মতো হাওয়ায় ভাসিয়ে দিতে পারছেন না? কারণ তা হলে এখনই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হয়। অথচ এখন আর তার উপায় নেই। পাকিস্তানের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে আমেরিকা এবং তার প্রেসিডেন্ট স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প। তা ছাড়া যে কোনও মূল্যে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে অত্যন্ত ব্যগ্র হয়ে রয়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। তাই এমনকি বিস্ফোরণের ঘটনাকে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বলতেও সরকারের ৪৮ ঘণ্টা লেগে গেল।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান স্থগিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী-প্রতিরক্ষামন্ত্রী বারবার বলেছেন, অপারেশন সিঁদুর বন্ধ হলেও অপারেশন বন্ধ হয়নি। তা যদি সত্যি হয়, তবে এই কি সেই অপারেশন চলার নমুনা?

দেশের মানুষ আজও জানে না, পাকিস্তানের সঙ্গে কী শর্তে ভারত অপারেশন সিঁদুর বন্ধ করেছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অজস্র বার ঘোষণা করেছেন, তিনিই বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দিয়ে দুই দেশকে যুদ্ধ বন্ধ করিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বা ভারত সরকার ট্রাম্পের এই দাবির কখনও বিরোধিতা করেনি। সব সময়ই চুপচাপ থেকেছে।

নরেন্দ্র মোদি সরকারের এগারো বছরের রাজত্বে পাঠানকোট, উরি, পুলওয়ামা, পহেলগামের পর দিল্লিতে সন্ত্রাসবাদী হামলা ঘটল। দিল্লি হামলার পর প্রধানমন্ত্রী ভুটান থেকে ঘোষণা করেছেন, আমাদের নিরাপত্তা সংস্থা এই ষড়যন্ত্রের শিকড় পর্যন্ত যাবে। ষড়যন্ত্রকারীদের মাফ করা হবে না। অথচ আগের ঘটনাগুলিতে তদন্তের ফলাফল কী হয়েছিল দেশবাসী আজও জানতে পারেনি। পহেলগাম বিখ্যাত পর্যটনক্ষেত্র হওয়া সত্ত্বেও কেন সেখানে কোনও নিরাপত্তা রক্ষী ছিল না? কেন হত্যাকাণ্ডেরও দীর্ঘ সময় পর পর্যন্ত নিরাপত্তা রক্ষীদের দেখা মেলেনি? কেন গোয়েন্দারা এই হামলার আগাম আঁচ করতে পারেনি? কেন ঘটনার পরেও গোয়েন্দা এবং নিরাপত্তা বাহিনী সন্ত্রাসবাদীদের হদিশ পেল না? কেন গোয়েন্দা এবং নিরাপত্তা বাহিনী এ কাজে ব্যর্থ হল? তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে পারলে কি এত সহজে দিল্লির ঘটনা ঘটতে পারত? দেশের মানুষের এ সব প্রশ্নের কোনও উত্তর সরকার দেয়নি। পুলওয়ামাতে সেনা কনভয়ে বিপুল পরিমাণ আরডিএক্স বোঝাই গাড়ি কী ভাবে ঢুকে পড়ে ৪০ জন সেনাকে হত্যা করতে পেরেছিল? কাদের গাফিলতিতে তা সম্ভব হয়েছিল? এ সব কোনও কিছুই প্রকাশ্যে আসেনি।

প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর হুঙ্কার– ‘শেষ দেখে ছাড়ব’, ‘ষড়যন্ত্রকারীরা নিরাপত্তা সংস্থার চরম রোষের মুখে পড়বে’। দেশের মানুষের কানে এ সবই ফাঁকা আওয়াজ ঠেকে। মানুষের দাবি, সরকার নাগরিকদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষায় যথার্থই সর্বশক্তি নিয়োগ করুক এবং তদন্তের ফলাফল দেশের মানুষের কাছে অতীতের মতো গোপন না করে প্রকাশ্যে নিয়ে আসুক। এই মৃত্যুমিছিল শেষ হোক।