Breaking News

বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের রেকর্ড কী রকম

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করতে বিজেপির নেতারা অজস্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এগুলি মূলত হল লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পাল্টা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার চালু করা, স্বাস্থ্যসাথীর বিপরীতে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প আনা, নানা ভাতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ইত্যাদি।

এ রাজ্যে প্রথম নয়, কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় বসে এবং দেশের অন্য রাজ্যগুলিতে বিজেপি সরকার এমনই বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কর্মসংস্থান থেকে আচ্ছে দিন, বেটি বাঁচাও-বেটি পড়াও এর পরিণতি কী দেশের মানুষ জানেন। রাজ্যগুলিতে এই সমস্ত প্রতিশ্রুতির নিরিখে তারা কী ভূমিকা পালন করেছেন তার তিনটি রাজ্যের দিকে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

ওড়িশা

কৃষিক্ষেত্রঃ দু’বছর আগে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল উৎপাদিত সমস্ত ধান কৃষকদের থেকে সরকার কিনে নেবে। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য হবে ৩১০০ টাকা কুইন্টাল, এ ছাড়াও কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষিত সহায়ক মূল্যের ওপর অতিরিক্ত ৮০০ টাকা প্রতি কুইন্টালে দেওয়া হবে। কিন্তু জেতার পরেই বিজেপির রাজ্য সরকার সরকারি এজেন্সির মাধ্যমে ধান কেনার ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে বহু কৃষকই সরকারকে ধান বিক্রি করতে পারেনি। ধানের দাম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ার কথা দিয়েছিল তারা। বাস্তবে যে কৃষকরা সরকারকে ধান বিক্রি করা সুযোগ পেয়েছেন তাঁদের বিক্রির টাকা পেতেও নানা দপ্তর ও নেতার কাছে দৌড়ে বেড়াতে হচ্ছে।

প্রতিটি ব্লকে কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং ‘কৃষি সংরক্ষণ কোষ’ প্রকল্পে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি সরকার। বিগত দুটি বছরে এই বিষয়ে কিছুই হয়নি।

সুভদ্রা যোজনাঃ প্রতিশ্রুতি ছিল, প্রত্যেক মহিলাকে ৫০ হাজার টাকার ক্যাশ ভাউচার দেওয়া হবে। দু’বছরের মধ্যে তা ভাঙানো যাবে। কিন্তু জেতার পরেই বিজেপি সরকার সুবিধা প্রাপক তালিকা থেকে বিরাট সংখ্যায় মহিলাদের নাম কেটে দিয়েছে। তার পরেও দুটি কিস্তিতে বছরে মাত্র ১০ হাজার টাকা দিয়েছে।

কর্মসংস্থানঃ বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল সরকারি চাকরিতে ২.১৫ লক্ষ খালি পদ পূরণ করা হবে। প্রথম দুই বছরে ৬৫ হাজার সরকারি চাকরি হবে। কিন্তু এই দু বছরে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে ১০ বার সরকারি চাকরির নানা পরীক্ষা বাতিল হয়ে গেছে। নিয়োগ তো অনেক পরের বিষয়।

সামাজিক সুরক্ষাঃ বার্ধক্য ভাতা বিধবা ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতা ১০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও গত দুই বছরে এক টাকাও বাড়েনি।

বিদ্যুৎঃ ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম মকুব করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বিজেপি সরকার ভোটের পর ভুলেই গেছে।

চিট ফান্ডঃ ক্ষমতায় বসার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অর্ডিন্যান্স এনে চিট ফান্ডে প্রতারিতদের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি গত দু’বছরে তারা আর উচ্চারণ করেনি।

ওড়িয়া অস্মিতাঃ নির্বাচনে জিতে তথাকথিত ‘ওড়িয়া অস্মিতা’য় সুড়সুড়ি দিয়ে বিপুল কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু গত দু-বছরে ওড়িয়া ভাষা বা রাজ্যের ঐতিহ্য ও মর্যাদা রক্ষার কোনও পদক্ষেপই নেয়নি।

ত্রিপুরা

কর্মসংস্থাঃ বিগত সিপিএম সরকারের আমলে চাকরিচ্যুত ১০,৩২৩ জন শিক্ষকের পুনর্নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি ২০১৮-র নির্বাচনে। কিন্তু আজও তা পূরণ করেনি। মিসড কল দিলেই চাকরি, বিপুল কর্মসংস্থান, কোনও প্রতিশ্রুতিই পূরিত হয়নি।

নেশা মুক্ত ত্রিপুরাঃ বিজেপি শাসনে নেশা, বিশেষত ড্রাগ আসক্তি বেড়েছে। এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যায় ত্রিপুরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সর্বোচ্চ স্থানে আছে।

শিক্ষাঃ ১২৫টি পুরনো ও গুরুত্বপূর্ণ বাংলা মাধ্যম স্কুলকে বিদ্যা জ্যোতি স্কিমে ইংরেজি মাধ্যমে পরিণত করে সিবিএসই-র হাতে তুলে দিয়েছে বিজেপি সরকার। কিন্তু পরিকাঠামোর কোনও উন্নতি হয়নি।

মধ্যপ্রদেশ

লাডলি বহিন যোজনাঃ এই ক্ষেত্রে বিজেপি ১২৫০ টাকা থেকে মহিলাদের ভাতা বাড়িয়ে ১৫০০ টাকা করেছে। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে।

৪৫০ টাকায় গ্যাসঃ লাডলি বহিন যোজনা ও উজ্জ্বলা যোজনা প্রাপকদের ৪৫০ টাকায় গ্যাস সিলিন্ডার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বিজেপি সরকার সরাসরি এই দামে দেয়নি। ভর্তুকি আকারে ব্যাঙ্কে টাকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অভিযোগ এই প্রকল্পে গ্যাসের সরবরাহ অত্যন্ত কম। এই গ্রাহকরা বহু দেরিতে গ্যাস পান। ভর্তুকিও সব সময় মেলে না। ফলে এই প্রতিশ্রুতি আংশিক পালিত হয়েছে মাত্র।

কৃষিঃ গমে ২৭০০ টাকা কুইন্টাল ও ধানে ৩১০০ টাকা কুইন্টাল এমএসপি-র কথা বললেও বিজেপি সরকার এর কোনও গ্যারান্টি দেয়নি। নানা সময় এই দাম পরিবর্তিত হয়ে যায়।

শিক্ষাঃ দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা এবং দরিদ্র ছাত্রীদের স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও কিছু স্কলারশিপ ও অনুদান ভিত্তিক ব্যবস্থা ছাড়া সমস্ত দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীর জন্য এই সুযোগ তৈরি হয়নি।

বিদ্যুৎঃ ১০০ টাকায় ১০০ ইউনিট বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কিছু ক্ষেত্রে ভর্তুকির ব্যবস্থা হলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মাশুল কমানো হয়নি।

কর্মসংস্থানঃ প্রতিটি পরিবারে অন্তত একজনের চাকরি বা স্বনিযুক্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও কাজের গ্যারান্টি প্রকল্প মধ্যপ্রদেশের বিজেপি সরকার গ্রহণ করেনি। মধ্যপ্রদেশে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেও বিজেপি সরকার অনুদানভিত্তিক প্রতিশ্রুতিগুলি কিছুটা পালন করলেও কর্মসংস্থান বা স্থায়ী রোজগারের সুযোগ তৈরির মতো কোনও ব্যবস্থা করেনি।

তাদের এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা বা দায়সারা ভাবে কিছু অনুদানেই দায়িত্ব শেষ করার রেকর্ড পশ্চিমবঙ্গে এলে পাল্টেযাবে, নাকি তারই পুনরাবৃত্তি ঘটবে এটাই আজ মানুষের প্রশ্ন।