
ভারতের প্রেক্ষাগৃহগুলিতে ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এবং কিছুদিন পরেই সমস্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছিল মারাঠা শাসক ছত্রপতি শিবাজির জ্যেষ্ঠ পুত্র সম্ভাজির জীবন নির্মিত ছবি ‘ছাভা’। সিনেমাটি দেখার পর খুবই আশঙ্কা ও দুঃখ হয়, কারণ একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ দেশে ইতিহাসকে যে ভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বিকৃত করে সিনেমার আকারে সম্প্রচার করা হয়েছে তা খুবই চিন্তার।
সব থেকে আশঙ্কার বিষয়, একাংশের শিক্ষিত মানুষ এই সিনেমাটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ এবং সিনেমাটির জনপ্রিয়তা ভারতীয় যুব সমাজের কাছে সব থেকে বেশি। ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে সিনেমাটিরযে ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে এবং ঐতিহাসিক সত্যতার স্বপক্ষে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, আর তা নিয়ে ভারতের যুবসমাজের একটা বিশেষ অংশ যে ভাবে মাতামাতি করছে তা সত্যিই যে কোনও সমাজ সচেতন নাগরিককে চিন্তিত না করে পারে না। ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা সব থেকে বেশি আশঙ্কিত। বেশ কিছু বছর ধরে একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে যে সমাজের একটা বড় অংশের শিক্ষিত মানুষ নির্ভরযোগ্য ইতিহাস বই পড়ে চলচ্চিত্র যাচাই করার বদলে চলচ্চিত্র দেখে ইতিহাস বইকে বাছাই করা নির্ভরযোগ্য মনে করছেন। এই প্রবণতার মধ্যে সবথেকে নেতিবাচক বিষয়টি যে কাজ করছে তা হল, বই পড়ার প্রতি অনীহা, বিশেষ করে ইতিহাস বই পড়ার প্রতি। অথচ সেই সব মানুষই এই ধরনের ছবির ভূয়সী প্রশংসা করছেন যাদের ইতিহাস বিষয়টির প্রতিই চরম অনীহা। তারাই চলচ্চিত্র জগতের উপর ভরসা করে বসে আছেন ইতিহাস জানার জন্য।
ইতিহাস-বিকৃত সিনেমা
এই প্রবণতার পিছনেও একটি সুনির্দিষ্ট, সুপরিকল্পিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রচার করছে। কেন্দে্রর বর্তমান শাসক দল চায় না দেশের মানুষ প্রকৃত ইতিহাস জানুক। তাই শুধু ইতিহাস বিকৃত সিনেমাই তৈরি হচ্ছে তা নয়, নতুন করে ভারতের ইতিহাস লেখার দাবিও তারা তুলছেন এবং ইতিমধ্যেই তারা তাদের সেই দাবি অনেকটাই আদায় করে ফেলেছেন এনসিইআরটি-র ইতিহাস বইয়ের পাঠ্যসূচিতে বদল ঘটিয়ে। এই পাঠ্যসূচিতে মধ্যযুগের ভারতের অংশ থেকে সম্পূর্ণ রূপে দিল্লি সুলতানি এবং মুঘল শাসনকাল বাদ দেওয়া হয়েছে এবং তার পরিবর্তে যুক্ত হয়েছে কুম্ভ মেলার ইতিহাস, মোদি সরকারের বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও প্রকল্প, মেক ইন ইন্ডিয়া প্রকল্প ইত্যাদি। তাই একদিকে যেমন পাঠ্যসূচিতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সাম্প্রদায়িক ইতিহাস চর্চার বীজ রোপন করা হচ্ছে, তারই পাশাপাশি জনপ্রিয় ইতিহাসকেবিকৃত করে সুপরিকল্পিত ভাবে সাম্প্রদায়িক চলচ্চিত্র তৈরি করা হচ্ছে। সেগুলি মুক্তি পাচ্ছে। কাশ্মীর ফাইলস, কেরালা স্টোরি, সম্রাট পৃথ্বীরাজ, বেঙ্গল ফাইলস, সিংঘম এগেইন এবং সর্বোপরি ছাভা সিনেমাগুলি যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
‘ছাভা’ সিনেমাটির মধ্য দিয়ে ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে যে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের প্রত্যক্ষ মদতে হিন্দুদের উপর অকথ্য অত্যাচার করা হয়েছে এবং বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে যে ঔরঙ্গজেব ছিলেন প্রবল হিন্দুবিদ্বেষী এবং উগ্র ধর্মান্ধ একজন শাসক এবং তার বিরুদ্ধে সম্ভাজি ‘ভারতবর্ষের স্বাধীনতাক্স (হিন্দু স্বরাজ) অর্জনের জন্য এবং হিন্দু সমাজকে রক্ষা করার জন্য যেন একজন দেবদূতের আকারে ভারতে আবির্ভূত হয়েছেন। একই সঙ্গে দেখানো হয়েছে সম্ভাজি একজন সৎ, মহৎ চরিত্রের অধিকারী এবং প্রজাকল্যাণকারী শাসক।
মিথ্যাচার
যে ঘটনাগুলি ‘ছাভাক্স সিনেমাটির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে এবং ইতিহাস বলে দাবি করা হয়েছে তা কি সত্যিই ইতিহাস নাকি ইতিহাসের আড়ালে দূরভিসন্ধিমূলক এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি এক মিথ্যাচার? প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার রচিত পাঁচটি খণ্ডে ‘হিস্ট্রি অফ ঔরঙ্গজেব’ এবং ‘এ শর্ট হিস্ট্রি অফ ঔরঙ্গজেব’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন যে সম্ভাজি ছিলেন একজন লম্পট, দুশ্চরিত্র, মাদকাসক্ত এবং একজন ব্রাহ্মণ মহিলাকে ধর্ষণ করার অপরাধে সম্ভাজিকে স্বয়ং ছত্রপতি শিবাজি মহারাষ্ট্রের পানহালা দুর্গে বন্দি করে রেখেছিলেন। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার এও দেখিয়েছেন যে সম্ভাজিই তার সেনাবাহিনীদের গোয়া আক্রমণ করার সময় অবাধ লুঠতরাজ এবং গণধর্ষণের অনুমতি দিয়েছিলেন এবং সম্ভাজির এই ধরনের দুশ্চরিত্র এবং লাম্পট্যের কথা স্বীকার করেছেন স্বয়ং আরএসএস-এর গুরু বিনায়ক দামোদর সাভারকার এবং এম এস গোলওয়ালকর।
ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকারের মতে, মুঘল সেনার হাতে বন্দি সম্ভাজিকে সম্রাট ঔরঙ্গজেব ক্ষমা করে দিতেন যদি সম্ভাজি তার গুপ্ত সম্পত্তির হদিশ এবং মুঘলদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা মারাঠাদের নাম ঔরঙ্গজেবকে বলে দিতেন। কিন্তু তা না করে সম্ভাজি নবি মুহাম্মদকে নিয়ে কটূক্তি করেন এবং সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কন্যাকে অশ্লীল প্রস্তাব দেন যা সম্ভাজির নৃশংস মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
ঔরঙ্গজেবের সভাসদদের ৩১ জন হিন্দু
ঔরঙ্গজেব সম্পর্কে উক্ত সিনেমাটিতে যে সমস্ত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তার ঐতিহাসিক সত্যতা কতটুকু? প্রথমত, মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব সম্পর্কে যে প্রবল হিন্দুবিদ্বেষী ভাবমূর্তি তুলে ধরা হয়েছে, বাস্তবে তা অতিরঞ্জিত। মুঘল সম্রাটদের মধ্যে ঔরঙ্গজেবের সময়েই সব থেকে বেশি ৩১ জন হিন্দু সভাসদ ছিল। এই তথ্যটি জানা যায়় বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আতাহার আলির গ্রন্থ ‘হিন্দু নোবিলিটি আন্ডার ঔরঙ্গজেব’ থেকে। ঔরঙ্গজেব সিংহাসন দখল নিয়ে ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন এ কথা ঠিক। কিন্তু এ কথাও সত্য যে রাজতন্তে্রর যুগে সিংহাসন দখল নিয়ে এই রক্তাক্ত লড়াই বহু ক্ষেত্রে ঘটেছে। সেই যুগে বর্তমানের গণতান্ত্রিক ধারণার বিকাশই হয়নি, যেমন গণতান্ত্রিক ধারণার অস্তিত্ব ছিল না প্রাচীন ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায়। সুতরাং পরিবারের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব সংঘাতের জন্য শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দায়ী করা মানে তা হবে সত্যকে অস্বীকার করা। কারণ ঐতিহাসিক ভাবে এ কথা সত্য যে ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্মের আগমনের আগে যে সমস্ত রাজবংশ শাসন করে গেছে সেই সমস্ত সম্রাটরাও নিজেদের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে কখনও ভাইয়ের বিরুদ্ধে, কখনও পিতার বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয়েছেন। এমনকি তাঁদের হত্যা পর্যন্ত করেছেন। উদাহরণ হিসেবে প্রাচীন ভারতের হর্যঙ্ক বংশ, মৌর্য বংশ, গুপ্ত বংশে এবং রাজপুতদের ইতিহাস তুলে ধরা যায় এবং পরবর্তীকালে মারাঠা শাসকদের মধ্যেও উত্তরাধিকার নিয়ে খুনোখুনি, গুপ্ত হত্যা এবং চরম দ্বন্দ্ব-সংঘাত অব্যাহত ছিল। এই ধারণাও ভুল যে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ঔরঙ্গজেব লিপ্ত হয়েছেন। ঔরঙ্গজেবের আগে শাহজাহান, জাহাঙ্গির, হুমায়ুন এমনকি বাবরকেও এই উত্তরাধিকারী দ্বন্দ্বে বাধ্য হয়ে লিপ্ত হতে হয়েছে। কারণ তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় সিংহাসন দখলের আকাঙক্ষা সমস্ত ধর্মের সমস্ত রাজবংশের মধ্যেই ছিল।
ঔরঙ্গজেব মন্দির গড়ায় অনুদানও দিয়েছেন
সম্রাট ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে আরেকটি প্রধান অভিযোগ যে তিনি লক্ষ লক্ষ হিন্দুকে হত্যা করেছেন এবং হাজার হাজার মন্দির ধবংস করেছেন। এই অভিযোগের সত্যতা কতটুকু? ইতিহাসবিদ আদ্রে ট্রু শেখে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ঔরঙ্গজেব দ্য ম্যান অ্যান্ড দ্য মিথ’-এ এবং প্রত্নতত্ত্ববিদ বিশ্বম্ভর নাথ পাণ্ডে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘হিন্দু মন্দির আউর ঔরঙ্গজেব কি ফরমান’-এ দেখিয়েছেন অন্য কথা। তাঁরা সম্রাট ঔরঙ্গজেবের বিভিন্ন চিঠিপত্র এবং অন্যান্য প্রামাণ্য ঐতিহাসিক সূত্র থেকে দেখিয়েছেন যে ঔরঙ্গজেব বারোটার বেশি মন্দির যেমন ধ্বংস করেছিলেন এবং একই সাথে সমকালীন বিজাপুরের সুলতান ৩ বছর ধরে খাজনা মুঘল রাজকোষে প্রদান না করে তা একটি মসজিদের তলায় লুকিয়ে রেখেছিলেন এবং এই ঘটনা জানার পর ঔরঙ্গজেব বিজাপুর অভিযান করে ওই মসজিদ ভেঙে গুপ্ত সম্পত্তি খাজনা হিসেবে আদায় করে নিয়ে আসেন। ফলে আক্রমণের লক্ষ্যটা ছিল সম্পদ।
একই সঙ্গে ঔরঙ্গজেব হিন্দুদের বিখ্যাত মন্দির যেমন আসামের কামাখ্যা মন্দির, উজ্জয়নীর মহাকাল মন্দির এবং মথুরার কৃষ্ণ মন্দির সহ আরও কিছু মন্দির তৈরির জমি এবং অনুদান প্রদান করেছিলেন। তিনি সমস্ত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মানুষ যাতে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার না হন তার ফরমানও জারি করেছিলেন। এই তথ্যসূত্র থেকে জানা যায় তিনি যেমন রাজদরবারে হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব দোল-পূর্ণিমা, দীপাবলি ইত্যাদি পালনের প্রতি রাশ টেনেছিলেন, ঠিক একই ভাবে ঈদ, মহরম ইত্যাদি ইসলাম ধর্মের পালনীয় উৎসবেও রাশ টেনেছিলেন। তিনি দরবারি চিত্রকলা, সংগীত নৃত্য, শিল্প ইত্যাদি নিষিদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু এর পিছনে রাজকোষের সংকটই ছিল মূল কারণ।
কিন্তু সমগ্র ভারতবর্ষে সেগুলির আঞ্চলিক বিকাশে কোনও হস্তক্ষেপ করেননি এবং সেগুলি আঞ্চলিক ভাবে সব থেকে বেশি বিকাশ লাভ করেছিল ঔরঙ্গজেবের আমলেই। এ কথাও সত্য ঔরঙ্গজেব তার রাজত্বের ২২তম বছরে জিজিয়া কর পুনরায় আরোপ করেন। কিন্তু এরও কারণ ছিল আর্থিক সংকট। ইরফান হাবিব, আতাহার আলি, সৈয়দ নাদিম রিজভি প্রমুখ বিখ্যাত ইতিহাসবিদেরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই সমস্ত ঘটনার কারণ ছিল রাজকোষে অর্থ সংকট এবং এই অর্থ সংকটের প্রধান কারণ ছিল বিভিন্ন বিদ্রোহ দমন এবং জায়গীরদারি এবং মনসবদারি সংকট যা ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। সুতরাং সামন্ততন্ত্র এবং রাজতন্ত্রের যুগের ঘটনাগুলিকে শত শত বছর পরে বর্তমান গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বিচার করতে হলে সেই সময়কার আর্থ-সামাজিক আয়নায় বিচার করতে হবে। ইতিহাসের ঘটনাগুলি সম্পর্কে মনগড়া ধারণা নিয়ে চললে এবং তা নিয়ে মাতামাতি ও সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার সৃষ্টি করা হলে তা হবে আত্মঘাতী এবং মানবসভ্যতার প্রতি চরম শত্রুতা।