Breaking News

রামের মূর্তিতে পুজো দিয়েই প্রণামী লুঠ

অযোধ্যার রামমন্দিরের বিপুল পরিমাণ প্রণামী ও দানসামগ্রী চুরি নিয়ে যখন দেশ তোলপাড়, এর সঙ্গে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রভাবশালী নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার ঘটনায় যখন নিন্দার ঢেউ বইছে, তখন এই সংগঠিত চুরির ঘটনাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’, ‘ব্যতিক্রমী’ প্রভৃতি বলে পরিস্থিতি সামাল দিতে আসরে নামলেন আরএসএসের সহ-কার্যবাহ দত্তাত্রেয় হোসবলে।

দত্তাত্রেয় চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত মাথাদের এবং গোটা চক্রকে সামনে আনার ও তাদের কঠোর শাস্তির জন্য পুলিশি তদন্ত দাবি না করে গোটাটাই ‘দেশবিরোধী শক্তির চক্রান্ত’ বলে হিন্দুদের একতাবদ্ধ থাকতে এবং ধৈর্য ও সংযম দেখানোর পরামর্শ দিয়েছেন। দেশের মানুষের প্রশ্ন, দত্তাত্রেয় কোনটাকে দেশবিরোধী শক্তির চক্রান্ত বলেছেন– সংঘ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বছরের পর বছর ধরে প্রণামীর টাকা এবং অন্যান্য দানসামগ্রী চুরির ঘটনাকে, নাকি চুরির ঘটনা জেনে দেশবাসী যে এমন ভয়ঙ্কর ঘটনার নিন্দা করে ষড়যন্তে্রর মূলে গিয়ে মাথাদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি করছেন তাকে? হোসবলের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, যারা এই ভাবে ভক্তদের প্রণামী এবং দান লুঠ করল, তারা দেশবিরোধী কাজ করেনি, করেছেন তাঁরা, যাঁরা এর প্রতিবাদ করছেন। ধর্মের প্রতি হোসবলের কী অগাধ নিষ্ঠা!

হিন্দুত্ববাদী হোসবলের মনে রাখা দরকার, দেশের হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী মানুষ, চুরির এই ন্যক্কারজনক ঘটনা যাঁদের বিশ্বাস এবং আবেগে গভীর ভাবে আঘাত করেছে, তাঁরা ঘটনাটিকে প্রবল নিন্দার দৃষ্টিতে দেখবে, নাকি সে সম্পর্কে ধৈর্য ও সংযম দেখাবে, তা তাঁদের নিজস্ব বিষয়, আরএসএস-বিশ্ব হিন্দু পরিষদকে কেউ তার অছি নিয়োগ করেনি। হিন্দু এবং হিন্দুত্ববাদ এক নয়। হিন্দুত্ববাদ হল হিন্দু ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধনের এক কার্যক্রম। এই হিন্দুত্ববাদীরাই আজ দেশের বড় বড় মন্দিরগুলির দখল নিয়েছে, সেগুলিতে তাদেরই একচ্ছত্র দাপট। সেখানে আর ধর্মপ্রাণ হিন্দু ভক্তদের কার্যত কোনও ভূমিকা নেই।

অনুদান লুঠের এই বিরাট কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরেও উত্তরপ্রদেশের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ প্রথম দিকে বেশ কিছুদিন মুখ খোলেননি, ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে চেপে দিতে চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীও যথারীতি নীরব ছিলেন। কিন্তু দেশ জুড়ে শোরগোলের তীব্রতা বৃদ্ধি ও প্রবল নিন্দার মুখে পড়ে উত্তরপ্রদেশ সরকার হঠাৎ সক্রিয় হয়ে প্রথমে তিন সদস্যের বিশেষ অনুসন্ধানকারী দল (সিট) গঠন করে, পরে এফআইআর-ও দায়ের করতে বাধ্য হয়। মন্দিরের সাধারণ কয়েকজন কর্মচারীর ঘাড়েই দোষ চাপানোর চেষ্টা এবং জনা আষ্টেক কর্মচারীকে গ্রেফতার করা হয়। অথচ এ কথা কে না বোঝেন, এত বড় একটি দুর্নীতি, যা মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই চলে আসছে, উচ্চ স্তরের যোগসাজশ ছাড়া করা অসম্ভব। এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট হওয়া দরকার যে, চুরি করা অর্থ, কর্মচারীরা ছাড়াও আর কারা কারা পেয়েছে। হোসবলের বক্তব্য এই তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করবে, কিংবা তদন্তকে লক্ষ্মণরেখায় আটকে ফেলবে, এই সন্দেহের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ দুর্নীতি তো শুধু রামমন্দিরেই নয়, হিন্দুদের পুণ্যক্ষেত্র বলে পরিচিত চার ধামের অন্যতম বদ্রীনাথ মন্দিরেও চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। সেখানে ভৈরব সেনা নামে একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন মন্দিরে চুরির অভিযোগ তুলেছে। সে অভিযোগ যে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়, তা বদ্রীনাথ-কেদারনাথ মন্দির কমিটির চেয়ারম্যান হেমন্ত দ্বিবেদী কমিটি গঠন করে তদন্তের নির্দেশ দেওয়াতেই স্পষ্ট। যদিও দ্বিবেদীর আপ্ত সহায়কের বিরুদ্ধেই যেখানে চুরিতে জড়িত থাকার অভিযোগ সেখানে তাঁর তৈরি কমিটি কতটুকু সত্য উদঘাটন করবে, তা দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। পুলিশের কাছেই বা তাঁরা কেন চুরির এই অভিযোগ জানাননি তা-ও স্পষ্ট নয়। উল্লেখ্য যে, এই হেমন্ত দ্বিবেদী বিজেপির সঙ্গেই যুক্ত। রাজনৈতিক যোগাযোগের সূত্রেই তিনি মন্দির কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছেন।

 এখন হঠাৎ প্রধানমন্ত্রী রামমন্দিরের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কথা বলছেন। কেন? রাম মন্দির ট্রাস্ট তো নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারেরই তৈরি। ট্রাস্টের সদস্যদের ন’জন সরাসরি সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। এত দিন তিনি সঙ্ঘ পরিবারের সদস্যদের বিরাট নৈতিক চরিত্র এবং গুণাবলির গুণগান গেয়ে জনমনে যে ধারণা তৈরি করে এসেছেন, তা কি সত্যি ছিল না? আরএসএস ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতির যে কথা এত দিন বলে এসেছে, চরিত্র গঠনই নাকি তাদের আদর্শের একেবারে মূল ভাবনা, তা কি মিলছে? ট্রাস্টে তো প্রধানমন্ত্রীর দফতরের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি নৃপেন্দ্র মিশ্র, অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব তথা সিবিএসই-র চেয়ারম্যান প্রশান্ত লোখণ্ডে এবং উত্তরপ্রদেশের রাজ্য সরকারের আমলাও রয়েছেন।

অর্থাৎ এটা স্পষ্ট যে, মন্দির পরিচালনায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ যথেষ্টই ছিল। সেই নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়েই এই অবাধ লুঠতরাজ গত আড়াই বছর ধরে চলে আসছে। এখন ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই প্রধানমন্ত্রী সহ সমস্ত বিজেপি আরএসএস নেতারাই ঘটনা থেকে নিজেদের দূরত্ব বোঝানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। নাগপুরে সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবতকে রামমন্দিরে চুরির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি শুধু ‘রাম রাম’ বলে সাংবাদিকদের এড়িয়ে যান। অথচ এই ভাগবতই রামমন্দির উদ্বোধনের দিন বলেছিলেন, মোদি যা করার করেছেন, এ বার আমাদের পালা। মোদির নেতৃত্বে আমাদের ধর্মস্থাপন করতে হবে। দুর্নীতির প্রশ্নে ভাগবতের এই নীরবতা কোন ধর্মস্থাপনের উদ্দেশ্যে!

যে প্রধানমন্ত্রী আজ এত বড় ঘটনায় নীরবতাকেই গা বাঁচানোর সর্বোত্তম রাস্তা হিসাবে বেছে নিয়েছেন, তিনিই বিপুল সমারোহে, প্রচারের সমস্ত আলো নিজের উপর কেন্দ্রীভূত করে অসমাপ্ত রামমন্দির উদ্বোধন করে বলেছিলেন, রামমন্দির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সূচনা হল নতুন যুগের, সূত্রপাত হল রামরাজত্বের। এই তা হলে প্রধানমন্ত্রীর রামরাজত্ব? এই কি তাঁর ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’র প্রতিশ্রুতি রক্ষা? দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহনশীলতা? না হলে এত বড় ঘটনা দেখেও তিনি নীরব কেন? কেন তিনি চুরির বিরোধিতায় রামমন্দির উদ্বোধনের দিনের মতোই অতি-সক্রিয়তা দেখালেন না? আসলে সে দিন তাঁর প্রয়োজন ছিল রামমন্দিরকে সামনে রেখে হিন্দু ভোটকে একত্রিত করা। আজ তাঁর প্রয়োজন মন্দির লুঠের কারবারিদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা।

কিন্তু কেন এই সর্বব্যাপক দুর্নীতি? এ কি শুধুই লোভ? আজ কঠোর একটি সত্য মানুষকে উপলব্ধি করতে হবে যে, চরম প্রতিক্রিয়াশীল, দুর্নীতিগ্রস্ত, পচে যাওয়া বর্তমান পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার যারা সেবা করবে, তাকে টিকে থাকতে সাহায্য করবে, তারা দুর্নীতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। ধর্ম যত দিন সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার ছিল তত দিন তা চরিত্র গঠন করতে পেরেছে। কিন্তু ধর্ম আজ যখন মতলববাজ শাসকের হাতিয়ার, তখন ধর্মের আড়ম্বর চরম প্রতিক্রিয়াশীল দুর্নীতিগ্রস্ত চরিত্রেরই জন্ম দেবে। রামমন্দির কেলেঙ্কারি এই সত্য আজ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।