সাম্রাজ্যবাদ যত দিন থাকবে তত দিন যুদ্ধের সম্ভাবনাও থাকবে — লেনিন

সাধারণভাবে সাম্রাজ্যবাদ গণতন্ত্রকে অস্বীকার করতে চায়, জাতীয় প্রশ্নেও (জাতীয় আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অর্থে) সাম্রাজ্যবাদ গণতন্ত্রকে অস্বীকার করতে চায়, পদদলিত করতে চায়। সাম্রাজ্যবাদ গড়ে উঠলে গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জন করা, অর্থাৎ স্বাধীন প্রজাতন্ত্র গঠন, সৈন্যবাহিনীর সৃষ্টি, জনসাধারণের দ্বারা প্রশাসক নির্বাচিত করা এই সমস্ত কিছু একই মাত্রায় এবং একই ভাবে অর্জন করা প্রাক-একচেটিয়া পুঁজিবাদের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। একচেটিয়া কারবার, ধনকুবের গোষ্ঠী, স্বাধীনতার বদলে শক্তিশালী জাতির দ্বারা ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় ছোট ছোট ও দুর্বল জাতির শোষণ– এইগুলি সাম্রাজ্যবাদের সেই সব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে, যা দেখে আমরা তাকে পরজীবী বা ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদ হিসাবে আখ্যায়িত করতে বাধ্য।

অর্থনৈতিক দিক থেকে একচেটিয়া পুঁজিবাদই হল সাম্রাজ্যবাদ। একচেটিয়া পুঁজির চরিত্র সম্পূর্ণ ভাবে অর্জন করতে হলে সমস্ত রকম প্রতিযোগিতার অবসান ঘটাতেই হয় এবং তা শুধু দেশীয় বাজারেই (বিশেষ দেশের) নয়, বিশ্ব জুড়ে বিদেশের বাজারেও ঘটাতে হবে। এই লগ্নিপুঁজির যুগে বিদেশি রাষ্ট্রের বাজারেও সমস্ত প্রতিযোগিতার অবসান ঘটানো কি অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব। প্রতিদ্বন্দ্বী পুঁজিকে অর্থনৈতিক ভাবে নির্ভরশীল করে তোলা, তার কাঁচামালের উৎসগুলিকে দখল করা এবং এই ভাবে তার সমস্ত শিল্পগুলিকে গ্রাস করার মধ্য দিয়েই তা করা হয়ে থাকে।

মার্কিন ট্রাস্টগুলিই সাম্রাজ্যবাদ অথবা একচেটিয়া পুঁজিবাদকে সর্বশ্রেষ্ঠ রূপে চিহ্নিত করছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য তারা যে নানা কৌশল অবলম্বন করে তা শুধু অর্থনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ রাখে না– তারা প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক, এমনকি অপরাধমূলক অপকর্মের আশ্রয় নেয়। এই ট্রাস্টগুলি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নানা কৌশল প্রয়োগ করে তাদের একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করতে পারে না, এ রকম ভাবা চূড়ান্ত ভুল হবে। এটা যে বাস্তবে সম্ভব তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। ট্রাস্টগুলি ব্যাঙ্কসমূহ (ট্রাস্টের মালিকেরা শেয়ার কিনতে কিনতে ধীরে ধীরে ব্যাঙ্কের মালিক হয়ে বসে) নিয়ন্ত্রণ করার দ্বারা প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়োজিত পুঁজিকে ক্রমাগত দুর্বল করে। তাদের কাঁচামালের সরবরাহ কমিয়ে দেয় (শেয়ার কেনার মাধ্যমে ট্রাস্ট মালিকেরা রেলপথের মালিক হয়ে বসে), কখনও কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীকে বরবাদ করে দেওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা লোকসান দিয়েও তারা সস্তায় পণ্য বিক্রি করে এবং শেষ পর্যন্ত তার শিল্পকারখানা, কাঁচামালের উৎস (খনি, জমি-জায়গা প্রভৃতি) কিনে নেয়।

এই ভাবে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ট্রাস্টগুলির ক্ষমতা এবং তাদের সম্প্রসারণ সম্বন্ধে বোঝা যাচ্ছে। আরও বোঝা যাচ্ছে যে, কী ভাবে তারা কারখানা, কাঁচামালের উৎস প্রভৃতি কিনে নেওয়ার দ্বারা সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক পথেই নিজেদের সম্প্রসারণ ঘটাতে থাকে। এক দেশের বৃহৎ লগ্নিপুঁজি রাজনৈতিক ভাবে স্বাধীন অপর কোনও দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী পুঁজিগুলোকে এই ভাবে গ্রাস করে ফেলতে পারে এবং প্রতিনিয়ত তা করে থাকে। এটা সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ভাবেই করা সম্ভব। রাজনৈতিক ভাবে কোনও দেশ অধিকার না করেও অর্থনৈতিক ভাবে সম্পূর্ণ অধিকার করে ফেলা সম্ভব এবং তা ব্যাপক ভাবে করা হয়ে থাকে। সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক নানা পত্রপত্রিকায় প্রায় এ ধরনের উল্লেখ দেখা যায়। যেমন, আর্জেন্টিনা বাস্তবে ব্রিটেনের বাণিজ্যিক উপনিবেশ, বা পর্তুগাল বাস্তবে ব্রিটেনের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ইত্যাদি। বাস্তবত এগুলো তা-ই। ব্রিটেনের কাছে ঋণ, ব্রিটিশ ব্যাঙ্কগুলোর উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা, রেলপথ, খনি এবং জমিতে ব্রিটিশ মালিকানা প্রভৃতির মাধ্যমে এই দেশগুলোর রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণ না করেও অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্রিটেন এই দেশগুলোর উপর অধিকার কায়েম করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ বলতে বোঝায় রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সাম্রাজ্যবাদ এই রাজনৈতিক স্বাধীনতাও খর্ব করতে চায়। তার কারণ হল, রাজনৈতিক দখলদারি থাকলে অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার অধিকতর সহজ, সস্তা, বেশি সুবিধাজনক এবং অনায়াসলব্ধ হয়ে যায়। যেমন, সহজে উচ্চ পদাধিকারীদের ঘুষ দিয়ে কিনে নেওয়া, নানা সুযোগসুবিধা আদায় করা, সুবিধাজনক আইন প্রণয়ন করিয়ে নেওয়া প্রভৃতি। সেই কারণে সাম্রাজ্যবাদ গণতন্ত্রের বদলে খুবই অল্পসংখ্যক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

সাম্রাজ্যবাদ হল পুঁজিবাদের বিকাশের সর্বোচ্চ স্তর এবং বিংশ শতাব্দীতেই পুঁজিবাদ সেই স্তরে উপনীত হয়েছে। পূর্বতন জাতীয় রাষ্ট্র– যা গড়ে না উঠলে সামন্ততন্ত্রকে উচ্ছেদ করা সম্ভব ছিল না, সেগুলি আজ আর পুঁজিবাদের পক্ষে যথেষ্ট নয়। পুঁজিবাদ কেন্দ্রীকরণকে এমন ভাবে গড়ে তুলেছে যে, শিল্পের সমস্ত শাখা-প্রশাখাগুলিকে ধনকুবেরদের সিন্ডিকেট, ট্রাস্ট ও অ্যাসোসিয়েশন অধিকার করেছে এবং ‘পুঁজির সম্রাটরা’ হয় উপনিবেশ করে অথবা অন্য দেশগুলিকে অর্থনৈতিক শোষণের হাজার রকমের জালে আটকে প্রায় সমগ্র বিশ্বকেই নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত যে পুঁজিবাদ ছিল জাতীয় মুক্তিদাতা, সেই পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র অর্জন করে এখন জাতির সবচেয়ে বড় উৎপীড়কে পরিণত হয়েছে। আগে যে পুঁজিবাদ ছিল প্রগতিশীল, আজ সে প্রতিক্রিয়াশীল। এই পুঁজিবাদ আজ উৎপাদিকা শক্তিকে এমন একটা স্তরে উন্নীত করেছে যে, উপনিবেশ সৃষ্টি, একচেটিয়া ব্যবস্থা, নানা সুযোগ সুবিধা এবং জাতির উপর সমস্ত রকমের উৎপীড়নের মাধ্যমে পুঁজিবাদকে কৃত্রিম ভাবে বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে মানবসমাজকে হয় বছরের পর বছর, এমনকি কয়েক দশক ধরে ‘বৃহৎ শক্তিগুলির’ সশস্ত্র সংগ্রামের যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে, নতুবা তারই বিকল্প হিসাবে সমাজতন্ত্রের দিকে যেতে হবে।

(সূত্রঃ সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর)