
‘‘জৈব প্রকৃতির বিকাশের নিয়ম যেমন আবিষ্কার করেছেন ডারউইন, তেমনই মার্ক্স আবিষ্কার করেছেন মানব-ইতিহাসের বিকাশের নিয়ম। নানা মতাদর্শের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে এত কাল যা লোকচক্ষুর অগোচরে ছিল, মার্ক্স উদ্ধার করেছেন সেই সহজ-সরল সত্যটিকে– রাজনীতি-বিজ্ঞান-শিল্প-ধর্ম ইত্যাদি নিয়ে চর্চা করার আগে মানুষের একেবারে প্রাথমিক প্রয়োজন হল খাদ্য, পানীয়, আশ্রয় আর পরনের বস্ত্র। অর্থাৎ জীবনধারণের জন্যে প্রয়োজনীয় তাৎক্ষণিক বৈষয়িক উপাদানসমূহের উৎপাদন এবং এক নির্দিষ্ট যুগকালের মধ্যে অর্জিত অর্থনৈতিক বিকাশের স্তরই হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই ভিত্তি, যার উপর বিবর্ধিত হয়ে উঠেছে এক-একটি বিশেষ জনসমাজের যাবতীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইন-সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণা, শিল্প এবং এমনকি ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনা পর্যন্ত– আর সে-কারণে এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ীই উপরোক্ত ব্যাপারগুলি ব্যাখ্যা করা উচিত, এ পর্যন্ত যেমনটা হয়ে এসেছে তেমন উল্টো দিক থেকে নয়।
কিন্তু ওটাই সব নয়। আজকের দিনের পুঁজিবাদী উৎপাদন-পদ্ধতি এবং এই উৎপাদন পদ্ধতি যে বুর্জোয়া সমাজকে সৃষ্টি করেছে, উভয়ের গতিশীলতার বিশেষ নিয়মকে আবিষ্কার করেছেন মার্ক্স। উদ্বৃত্ত মূল্যের আবিষ্কার হঠাৎ এমন একটি সমস্যার উপর আলোকপাত করল, যার সমাধান করার জন্য বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ ও সমাজতন্ত্রী সমালোচকদের পূর্বেকার সকল অনুসন্ধানই ছিল অন্ধকার হাতড়ে বেড়ানোর সামিল।
একজন মানুষের সারা জীবনের পক্ষে এই জাতীয় দুটি আবিষ্কারই যথেষ্ট। এমন ধরনের একটি আবিষ্কারের সৌভাগ্যও যার হয়, সে মানুষ ধন্য। অথচ যে ক্ষেত্রেই মার্ক্স গবেষণা চালিয়েছেন– বলা বাহুল্য তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রও ছিল বহুবিচিত্র, আর কোনও ক্ষেত্রেই অনুসন্ধানের কাজ তিনি দায়সারা ভাবে করেননি– প্রতিটি ক্ষেত্রে, এমনকি গণিতশাস্ত্রেরও, স্বাধীন সব আবিষ্কার ঘটানোয় সক্ষম হয়েছেন।
এমনই ছিলেন এই বিজ্ঞানী মানুষটি। কিন্তু এটাও মানুষটির এমনকি অর্ধেক পরিচয়ও নয়। মার্ক্সের কাছে বিজ্ঞান ছিল ঐতিহাসিক ভাবে গতিশীল এক বৈপ্লবিক শক্তি। কোনও একটি ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের কোনও নতুন তত্ত্বগত আবিষ্কার– হাতে-কলমে যার প্রয়োগের কল্পনাও হয়ত তখনও পর্যন্ত রীতিমতো অসম্ভব ঠেকছে, তাকেই অভ্যর্থনা জানাতে মার্ক্সের যত আনন্দই হোক না কেন, যে আবিষ্কার শিল্পের ক্ষেত্রে কোনও আশু বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও সাধারণ ভাবে ঐতিহাসিক বিকাশের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ধারাকে সূচিত করত, সে ক্ষেত্রে তাঁর আনন্দ হত সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতের। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিদ্যুৎশক্তির ক্ষেত্রে আবিষ্কারগুলির বিকাশ এবং মার্সেল দেপ্রের১ সাম্প্রতিক আবিষ্কারসমূহ গভীর মনোযোগে অনুধাবন করছিলেন তিনি।
সব কিছুর উপরে মার্ক্স ছিলেন একজন বিপ্লবী। তাঁর জীবনে প্রকৃত লক্ষ্য ছিল পুঁজিবাদী সমাজ ও সেই সমাজ যে সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছে যে কোনও প্রকারে তাদের উচ্ছেদের কাজে অবদান রেখে যাওয়া। আধুনিক যে প্রলেতারিয়েতকে তিনিই প্রথম তাদের নিজস্ব অবস্থান ও প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন করেছিলেন, তার মুক্তির পক্ষে আবশ্যিক শর্তাবলি সম্পর্কে চেতনা দিয়েছিলেন, তাদের শৃঙ্খলমোচনের কাজে অবদান রাখা ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। সংগ্রাম ছিল তাঁর চরিত্রবৈশিষ্ট্য। আর এমন এক প্রচণ্ড আবেগ, নাছোড়বান্দা ভাব আর সাফল্যের সঙ্গে তিনি লড়তেন যার তুলনা ছিল বিরল। রাইনসে জাইতুং প্রথম পর্ব (১৮৪২), প্যারিসের ভোরওয়ার্টস (১৮৪৪), ডয়েৎস-ব্রাসলার জাইতুং (১৮৪৭), নিউ রাইনসে জাইতুং (১৮৪৮-৪৯) ও নিউ ইয়র্ক ট্রিবিউন (১৮৫২-৬১) পত্রিকায় তাঁর কাজ,২ এ ছাড়াও প্রচুর সংগ্রামী প্রচার-পুস্তিকা রচনা, প্যারিস, ব্রাসেলস ও লন্ডনে সংগঠনগুলোর কাজকর্ম চালানো, পরিশেষে সবচেয়ে বড় ব্যাপার, মহান আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংঘ৩ গঠন– একই সঙ্গে এ সবই নিষ্পন্ন করেছেন তিনি। বস্তুত, শেষোক্ত কাজটি এমনই একটি গৌরবময় কীর্তি যে এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা যদি আর কিছুই না করতেন তবু শুধুমাত্র এই কাজটির জন্যই তিনি গর্বিত হতে পারতেন।
ফলত, মার্ক্স ছিলেন তাঁর কালের সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষের পাত্র, সবচেয়ে জঘন্য কুৎসার নিশানা। একচ্ছত্র রাজতন্ত্রী ও প্রজাতন্ত্রী উভয় ধরনের গভর্নমেন্টই তাঁকে তাদের ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করেছে। রক্ষণশীল অথবা অতিগণতন্ত্রী যা-ই হোক না কেন, বুর্জোয়ারা একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা কুৎসাবর্ষণে মেতেছে। এ সব কোনও কিছুতে ভ্রুক্ষেপ করেননি তিনি, মাকড়সার জাল বা জঞ্জাল গণ্য করে ঝেঁটিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন, অত্যন্ত প্রয়োজনে বাধ্য হলে মাঝেসাঝে জবাব দিয়েছেন– এইমাত্র। সাইবেরিয়ার খনি-অঞ্চল থেকে ক্যালিফোর্নিয়া এবং ইউরোপ ও আমেরিকার সকল অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ বিপ্লবী সহকর্মীর ভালবাসা, শ্রদ্ধা আর শোক নিবেদনের মধ্য দিয়েই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, অত্যন্ত জোর দিয়ে এ কথা আমি বলছি যে, হয়তো মার্ক্সের বহু বিরোধী ছিল কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রু তাঁর একজনও ছিল না। যুগ যুগ ধরে স্থায়ী হবে তাঁর নাম, কীর্তিত হবে তাঁর কৃতি’!’
১। মার্সেল দেপ্রে (১৮৪৩-১৯১৮) – ফরাসি পদার্থবিদ, দূরান্তরে বিদ্যুৎসঞ্চার প্রণালীর আবিষ্কারক) ২। মার্কস রাইনসে জাইতুং ও নিউ র্যানসে জাইতুং নামের পত্রিকা দুটির সম্পাদক ছিলেন এবং উপরোক্ত অন্যান্য পত্রপত্রিকাগুলির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কিংবা বিদেশস্থ সংবাদদাতা ছিলেন। ৩। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সঙ্ঘ (প্রথম আন্তর্জাতিক)-এর প্রতিষ্ঠা করেন মার্ক্স ১৮৬৪ সালে। এই আন্তর্জাতিক কায়েম থাকে ১৮৭২ সাল পর্যন্ত। এইটিই ছিল প্রলেতারীয় পার্টির প্রথম অঙ্কুর।
১৮৮৩ সালের ১৭ মার্চ কার্ল মার্ক্সের সমাধিস্থলে শ্রদ্ধার্ঘ্য