
বিশ্বে সবকিছুই গতিশীল, …
জীবন বদলে যায়,
উৎপাদিকা শক্তি বিকশিত হয়,
পুরনো সম্পর্ক ধসে পড়ে।
–কার্ল মার্ক্স
মার্ক্সবাদ শুধুমাত্র সমাজতন্তে্রর তত্ত্ব নয়, এ একটা সুসংহত বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি, একটা দার্শনিক প্রণালী যা থেকে মার্ক্সের সর্বহারা সমাজতন্ত্র যুক্তিসংগত ভাবেই এসে যায়। এই দার্শনিক প্রণালীকেই দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ বলা হয়।
সুতরাং মার্ক্সবাদকে ব্যাখ্যা করার অর্থ হল দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকেও ব্যাখ্যা করা।
এই প্রণালীকে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ বলা হয় কেন?
কারণ এর পদ্ধতি দ্বন্দ্বমূলক এবং এর তত্ত্ব বস্তুবাদী।
দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি কী?
বলা হয়, সমাজজীবন অবিরাম গতি ও বিকাশের মধ্যে আছে। এ কথা সত্য, জীবনকে অপরিবর্তনীয় ও অনড় বলে মনে করা ঠিক নয়। জীবন কখনও এক জায়গায় থেমে থাকে না, এ অনন্ত গতিশীলতার পথে ধ্বংস ও সৃষ্টির এক চিরন্তন প্রক্রিয়া। তাই, জীবনের মধ্যে সব সময়ই আছে নতুন ও পুরনো, বিকাশমান ও ক্ষয়িষ্ণু এবং বিপ্লবী ও প্রতিবিপ্লবী।
দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি আমাদের বলে, জীবন বাস্তবে যেমন, তেমন করেই তাকে দেখতে। আমরা দেখেছি জীবন অবিরাম গতির মধ্যে আছে, ফলে জীবনকে এই গতিশীলতার মধ্যে রেখেই আমরা বিচার করব এবং জিজ্ঞাসা করব– এই গতি জীবনকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমরা দেখেছি, জীবন অবিরাম ধ্বংস ও সৃষ্টির একটা চলমান চিত্র। তাই আমরা জীবনকে অবশ্যই এই ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রক্রিয়ার মধ্যে রেখে বিচার করব এবং জানতে চাইব, কী ধ্বংস হচ্ছে, জীবনে কী সৃষ্টি হচ্ছে?
এই জীবন প্রবাহে দিনের পর দিন যা সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিকশিত হচ্ছে তা অজেয়। তার অগ্রগতি আটকানো যায় না। তাই উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, শ্রেণি হিসাবে সর্বহারাদের যদি জন্ম হয় এবং দিন দিন তারা যদি বাড়তে থাকে, তা হলে আজ তারা শক্তিতে যত দুর্বল ও সংখ্যায় যত কমই হোক, শেষ পর্যন্ত তারা জয়লাভ করবেই। কেন তারা জয়লাভ করবে? কারণ তারা ক্রমাগত বাড়ছে, শক্তি অর্জন করছে এবং সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। অন্য দিকে, এই জীবন প্রবাহে যা পুরনো হচ্ছে, যা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তা যত বিশাল শক্তির অধিকারী হোক, তার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। তাই দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, আজ যদি বুর্জোয়াদের পায়ের তলা থেকে ক্রমাগত মাটি সরে যেতে থাকে এবং প্রতি দিন যদি তারা আরও পিছু হটতে থাকে, তা হলে আজ তারা যত শক্তিশালী ও সংখ্যায় যত বেশি হোক শেষ পর্যন্ত তারা পরাজিত হবেই। কেন? কারণ শ্রেণি হিসাবে আজ তারা ক্ষয়িষ্ণু, দুর্বল ও পুরনো হয়ে যাচ্ছে এবং তারা আজ জীবনের বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তাই এ থেকেই দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির অতি পরিচিত এই বক্তব্যের জন্ম হয়েছে,
– বাস্তবে যার অস্তিত্ব আছে অর্থাৎ যা দিনের পর দিন বাড়ছে তা যুক্তিসিদ্ধ এবং যা দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে তা যুক্তিহীন এবং শেষ পর্যন্ত তা পরাজিত হবেই।
যেমন গত শতাব্দীর আশির দশকে রাশিয়ার বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একটা বিরাট বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। নারদনিকরা জোরের সাথে বলেছিল, গ্রাম ও শহরের পেটিবুর্জোয়ারাই প্রধান শক্তি যারা রাশিয়াকে ‘মুক্ত’ করার দায়িত্ব নিতে পারে। মার্ক্সবাদীরা জিজ্ঞাসা করল– কেন? উত্তরে নারদনিকরা বলল, কারণ গ্রাম ও শহরের পেটি বুর্জোয়ারা এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তা ছাড়া তারা গরিব, দারিদ্রের মধ্যে তারা বাস করে।
এর উত্তরে মার্ক্সবাদীরা বলল, এ কথা সত্য যে এখন গ্রাম ও শহরের পেটিবুর্জোয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তারা সত্যিই গরিব, কিন্তু এটা কি বিতর্কের বিষয়? পেটিবুর্জোয়ারা অনেক দিন ধরেই সংখ্যাগুরু, কিন্তু এখনও পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণির সাহায্য ছাড়া ‘মুক্তি’ সংগ্রামে তাদের কোনও উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি। কেন? কারণ শ্রেণি হিসাবে পেটি বুর্জোয়ারা সংখ্যায় আর বাড়ছে না। বরং তারা দিনের পর দিন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে বুর্জোয়া ও শ্রমিক শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে। তা ছাড়া দারিদ্রের প্রশ্ন এখানে নির্ধারক বিষয় নয়, কারণ ‘ভবঘুরেরা’ তো পেটি বুর্জোয়াদের চেয়ে দরিদ্র, তাই বলে এ কথা কেউ বলবে না যে তারা ‘রাশিয়াকে মুক্ত’ করার দায়িত্ব নিতে পারে। তা হলে দেখা যাচ্ছে, কোন শ্রেণি সংখ্যাগরিষ্ঠ বা কোন শ্রেণি দরিদ্রতর এটা মূল বিচার্য বিষয় নয়। মূল প্রশ্ন, কোন শ্রেণি ক্রমাগত শক্তিসঞ্চয় করছে আর কোন শ্রেণি ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
যে হেতু সর্বহারারাই হচ্ছে এক মাত্র শ্রেণি যারা নিশ্চিতগতিতে বেড়ে উঠছে এবং শক্তিশালী হচ্ছে, যা সমাজ জীবনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং সমস্ত বিপ্লবী শক্তিগুলিকে তার চারপাশে সমবেত করছে, সেই কারণে এই সর্বহারা শ্রেণিকে আমরা আজকের দিনের আন্দোলনের প্রধান শক্তি হিসাবে গণ্য করব এবং এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে সমাজ প্রগতির এই সংগ্রামকে নিজেদের সংগ্রামে পরিণত করব।
এই ভাবে মার্ক্সবাদীরা উত্তর দিয়েছিল।
মার্ক্সবাদীরা অবশ্যই জীবনকে দ্বন্দ্বমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছিল, আর নারদনিকরা যুক্তি করেছিল অধিবিদ্যামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে। তারা সমাজ জীবনকে একটা অনড় বিষয় হিসাবে দেখেছিল।
দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি জীবনের বিকাশকে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে।
… দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি বলে, আন্দোলনের বিবর্তনমূলক ও বিপ্লবাত্মক এই দুই রূপ আছে। যখন প্রগতিশীল শক্তি তাদের দৈনন্দিন আন্দোলনের কর্মসূচি চালিয়ে যেতে থাকে এবং সমাজের পুরনো ব্যবস্থায় ছোটখাটো পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটায় তখন তাকে বলা হয় বিবর্তনমূলক আন্দোলন।
আবার যখন এই প্রগতিশীল শক্তি আদর্শগত দিক থেকে একই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সংঘবদ্ধ হয় এবং পুরনো সমাজ ব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটিত করার লক্ষ্যে জীবনের গুণগত পরিবর্তনের জন্য, একটা নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য শত্রু শিবিরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন তাকে বৈপ্লবিক আন্দোলন বলা হয়।
বিবর্তন বিপ্লবের জমি তৈরি করে এবং তার ভিত্তি রচনা করে। বিপ্লব এই ক্রমবিকাশের প্রক্রিয়াকে পূর্ণতা দেয় এবং তার পরবর্তী কাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়।
প্রকৃতিতেও একই রকম প্রক্রিয়া ঘটে। বিজ্ঞানের ইতিহাস দেখিয়ে দেয়, দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি সম্পূর্ণ বিজ্ঞান-ভিত্তিক। জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে সমাজ বিজ্ঞান, এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা এই ধারণারই স্বীকৃতি পাই যে, এই মহাবিশ্বে কোনও কিছুই শাশ্বত নয়, সব কিছুই পরিবর্তিত হচ্ছে, সব কিছুই বিকশিত হচ্ছে। তাই, প্রকৃতির সমস্ত কিছুকেই তার গতি ও বিকাশের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করতে হবে। এবং এ কথার মানে, দ্বন্দ্বতত্তে্বর মর্মবস্তু বর্তমান দিনের সমস্ত বিজ্ঞানের মধ্যে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে।
দ্বন্দ্বতত্ত্বের নিয়ম অনুযায়ী আন্দোলনের রূপ সম্পর্কে এর সিদ্ধান্ত হল, ছোট ছোট পরিমাণগত পরিবর্তন, আগে হোক পরে হোক, তা পরিণতিতে বৃহৎ পরিবর্তন, গুণগত পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায়। এই নিয়ম একই ভাবে প্রকৃতির পরিবর্তনের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য। মেন্ডেলিভের ‘মৌলের পর্যায় সারণি’’ পরিষ্কার ভাবে দেখিয়ে দেয়, প্রকৃতির ইতিহাসে পরিমাণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গুণগত পরিবর্তনের উদ্ভব কত গুরুত্বপূর্ণ।
(‘নৈরাজ্যবাদ না সমাজতন্ত্র’ বই থেকে)
(এই লেখাটি গণদাবী ৭৮ বর্ষ ২৯ সংখ্যা ২৭ ফেব্রুয়ারি – ৫ মার্চ ২০২৬ এ প্রকাশিত)