
অনেকে মনে করেন, অতীতের মনীষীরা যে সব মতবাদের সৃষ্টি করে গেছেন, যে হেতু তাঁরা মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেই করেছেন এবং যে হেতু সমস্ত মানুষের জন্যই তাঁদের মনে দরদবোধ ছিল, সেই হেতু সে সব মতবাদগুলোও ‘হিউম্যানিজম’ বা ‘মানবতাবাদ’। আজকাল বহু তথাকথিত প্রগতিশীল তত্ত্ববিদদেরও প্রায়ই এ ধরনের কথা বলতে শোনা যায়। বেশ কিছু দিন আগে পর্যন্ত প্রগতিশীল তত্ত্ববিদরা যাঁরা তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতেন, তাঁদের অন্তত এ রূপ বেফাঁস মন্তব্য করতে শুনিনি। কিন্তু আজকাল বহু তাত্ত্বিকের মুখ থেকে শুনি, মানবতাবাদ নাকি অতীত যুগ থেকেই রয়েছে। আমি বলতে চাই, এ রূপ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং অনৈতিহাসিক। মানুষের ভাবজগতের বিকাশের ইতিহাসে মানবতাবাদ ও মানবতাবাদী আদর্শ বলতে সমাজ বিকাশের একটা বিশেষ স্তরের একটা সুনির্দিষ্ট আদর্শগত পরিমণ্ডলকেই বোঝায়। এই সব পণ্ডিতরা বোধহয় ‘হিউম্যান ইডিওলজি’ (মানবিক মতাদর্শ) কথাটার সাথে হিউম্যানিজম-কে গুলিয়ে ফেলেছেন। এদের বোঝা উচিত ছিল, যা কিছু মানবিক তাই মানবতাবাদ নয় (anything humane is not humanism)। মানুষের সমাজে যখনই যে কোনও মতবাদ ও আদর্শ সৃষ্টি হয়েছে, সে আদর্শ তো মানুষের জন্যই হয়েছে। তাকে মহম্মদই সৃষ্টি করে থাকুন, চার্বাক মুনিই সৃষ্টি করে থাকুন, কপিল মুনিই করে থাকুন, আর শঙ্করাচার্যই সৃষ্টি করে থাকুন, মানুষের সমাজে মানুষের জন্যই তা করা হয়েছে– তাই এগুলো সবই মানবিক মতাদর্শ (human ideology)। কিন্তু পুঁজিবাদী বিপ্লব যে বুর্জোয়া মানবতাবাদের জন্ম দিল– সেই মানবতাবাদের সাথে অতীতের এই সমস্ত মানবিক মতাদর্শগুলোর মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। এ পার্থক্যের বিভিন্ন দিকের আলোচনার মধ্যে বিস্তারিত ভাবে না গিয়ে একটি মাত্র বিষয় নিয়ে আলোচনা করলেই বোধহয় পার্থক্যের স্বরূপটি পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠবে।
মানবতাবাদ-এর আগে গড়ে ওঠা প্রায় সমস্ত মতাদর্শগুলোই ঐশ্বরিক বা ধর্মীয় মূল্যবোধের উপরই প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ সমস্ত মানুষই ঈশ্বরের সন্তান, তাই সমস্ত মানুষের প্রতি প্রেম ও মমত্ববোধই ছিল এই সব ভাবাদর্শগুলির মূল কথা। ঈশ্বরের স্বীকৃতি থেকেই কতকগুলো মূল্যবোধের সৃষ্টি– যাকে আমরা দর্শনের ভাষায় ‘প্রায়রি ভ্যালু’ বা পূর্ব নির্ধারিত নীতিবোধ বলে থাকি। আর মানবতাবাদ, অর্থাৎ বুর্জোয়া মানবতাবাদ সে দিন যে মূল্যবোধের জন্ম দিয়েছিল সেগুলি মূলত গড়ে উঠেছিল মানুষকে কেন্দ্র করে। মানুষের সত্যিকারের প্রয়োজন ও সামাজিক চেতনাই ছিল সে দিন এই মূল্যবোধের কেন্দ্রবিন্দু। ধর্মীয় ভাবধারা ও অতিপ্রাকৃত সত্তার স্বীকৃতিজনিত মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এই মানবতাবাদই প্রথম মানুষের সমাজে ‘সেকুলার’ এবং গণতান্ত্রিক ভাবনাধারণা ও মূল্যবোধ নিয়ে এল। সেকুলার কথাটার বাংলা মানে হচ্ছে পার্থিব। তাই সমস্ত সেকুলার ধারণার শুরুই হচ্ছে অতিপ্রাকৃত সত্তার অস্বীকৃতির মধ্য দিয়ে (all secular concepts start with the non-recognition of any supernatural entity)। কিন্তু ভারতবর্ষে, আমাদের দেশে সেকুলার রাষ্টে্রর বর্তমানে মানে দাঁড়িয়েছে সমস্ত ধর্মে সমান উৎসাহদান। এ রকম ঘটার পেছনে দেশের রাষ্ট্রনায়কদের, তত্ত্ববিদদের ও রাজনৈতিক নেতাদেরই যে মিলিত কৃতিত্ব রয়েছে– এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আমরা হয় অজ্ঞতাবশত ভুল করছি, আর না হয় ইচ্ছা করেই ভুলে বসে আছি যে, সেকুলার রাষ্ট্র গঠনের ধারণাটি গড়ে উঠেছিল রাষ্ট্র, সমাজজীবন, অর্থনৈতিক জীবন, রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন– সমস্ত কিছুকে চার্চের প্রভাব বা ধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত করার জন্য। জীবন সম্পর্কিত পার্থিব গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণা (secular concept of life) এবং পার্থিব মানবতাবাদের এই হল ভিত্তি। কংগ্রেসি রাষ্ট্রনায়ক ও বুর্জোয়া চিন্তাবিদদের কথা বুঝতে পারি। কিন্তু বহু তথাকথিত মার্ক্সবাদী ও কমিউনিস্ট নেতাদের চিন্তা, ভাবনাধারণা, প্রতি দিনের আচরণ ও ধর্মানুষ্ঠানগুলোর প্রতি ক্রমবর্ধমান পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়ে সেকুলারিজম সম্বন্ধে যে ধারণা প্রকাশ পাচ্ছে, তাতে সত্যিই অবাক হতে হয়। এই সব নেতারা মিলে আমাদের দেশে ‘সেকুলার স্টেটক্স-এর মানে যা দাঁড় করিয়েছেন, তাতে যে কোনও চিন্তাশীল ব্যক্তির মনে স্বাভাবিক ভাবেই একটা প্রশ্ন দেখা দেবে। ইসলাম ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করে বলে আমরা পাকিস্তানকে বলব ইসলামিক ধর্মীয় রাষ্ট্র (Islamic theocratic state)। আর যদি সকল ধমের্র পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহদানই ভারত রাষ্টে্রর কাজ হয়, তা হলে তাকে একটি বহুধর্মীয় রাষ্ট্র (multi-theocratic state) ছাড়া আর কী বলা চলে? …
সেকুলার গণতন্ত্রের, সেকুলার গণতান্ত্রিক জীবনযাত্রার মূল নীতিগুলি কী? সেকুলার ভাবনাধারণা বা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক জীবনযাত্রার মূল নীতিগুলো গড়ে তোলার ব্যাপারে শিক্ষা যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে– এ কথা বোধকরি কেউ অস্বীকার করবেন না। তা হলে এটাই তো স্বাভাবিক যে, একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্টে্র শিক্ষা সব সময় ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধগুলোকে তুলে ধরবে। যদি সত্যসত্যই ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্টে্রর মর্যাদা দিতে চাই তা হলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে অবশ্যই ধর্মীয় ভাবধারার প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে। কিন্তু আমরা আমাদের এই তথাকথিত সেকুলার রাষ্টে্র বাস্তবে কী দেখছি? শিক্ষাব্যবস্থাকে ধর্মীয় প্রভাব থেকে মুক্ত করা তো দূরের কথা, শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় প্রভাব, শিক্ষানুষ্ঠানগুলিতে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের আধিক্য, এমনকি পাঠ্যপুস্তকগুলিতে ধর্মীয় প্রচার দিনের পর দিন ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। তাই শিক্ষাপদ্ধতি ও শিক্ষাব্যবস্থার গণতন্ত্রীকরণের দাবিতে যাঁরা আজ আন্দোলন পরিচালনা করছেন, তাঁদের প্রথমেই দুটো জিনিস পরিষ্কার করে বুঝতে হবে। প্রথমত শিক্ষাকে ধর্মীয় ভাবধারা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত শিক্ষা সংস্কারের দৃষ্টিভঙ্গি– পুঁজিবাদী শোষণ থেকে মুক্তির জন্য শ্রমিক শ্রেণি ও অন্যান্য শোষিত জনসাধারণের প্রতি দিন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে যে লড়াই চলছে– তার পরিপূরক কি না বিচার করে দেখতে হবে। এ দু’টি মাপকাঠির ভিত্তিতেই শিক্ষা সংস্কার ও শিক্ষাব্যবস্থার গণতন্ত্রীকরণের উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোনও একটি আন্দোলন প্রগতিশীল কি প্রতিক্রিয়াশীল– তা বিচার করে দেখতে হবে।
(‘ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও আমাদের কর্তব্য’ থেকে)