Breaking News

ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি ভারতীয় কৃষকরা ভয়ঙ্কর বিপদের সামনে

এক বছরের বেশি টালবাহানার পর ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ চূড়ান্ত হয়েছে। সংসদে কৃষক বিরোধী, জনবিরোধী এবং কর্পোরেট স্বার্থবাহী বাজেট পেশ হওয়ার ঠিক পর পরই এই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার খবর দেশবাসী জানতে পারল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা থেকে। পরিতাপের বিষয়, ভারতের সংসদ অধিবেশন চলাকালীন ভারতবাসীকে এ কথা জানতে হল মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখ থেকে। অথচ এই চুক্তি ভারতবাসীর একটা বড় অংশের স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে। বিশেষত, এই চুক্তি ভারতের কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই চুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও ঘোষণা করেননি। শুধুমাত্র বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এই চুক্তি সম্পর্কে একটা ভাসা ভাসা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অনেক পরে একটা খসড়ার কথা ভারতীয় কর্তারা বললেও বাস্তবে সেটার রূপ কী, তা আজও কোথাও প্রকাশিত হয়নি।

এই চুক্তি সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন দেশের উচ্চ পর্যায়ের আধিকারিকরা বলছেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করবে এবং আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কিনবে। রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যের উপর ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ৫০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করেছিলেন, তা কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে। অন্য দিকে জানা যাচ্ছে, আমেরিকা থেকে ভারতে আমদানি করা বিরাট সংখ্যক পণ্যের উপর কোনও শুল্ক থাকবে না। আমেরিকা দাবি করছে ভারত আমদানি শুল্ক কমাবে, অন্যান্য অ-শুল্ক প্রাচীর তুলে দেবে এবং আমেরিকা থেকে আমদানি করা পণ্যের উপর কোনও শুল্ক চাপাবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন ভারত আমেরিকা থেকে ৪৫.৫ লক্ষ কোটি টাকার পণ্য কিনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।

ভারতের কৃষকদের পক্ষে এই চুক্তির একটি মারাত্মক দিক হল, খাদ্যশস্য এবং জেনেটিক্যালি মডিফায়েড সয়াবিন, পশুখাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত লাল জোয়ার, বাদাম সহ বেশ কিছু মার্কিন কৃষিপণ্য এ দেশের বাজারে ঢোকার দরজা ভারত সরকার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। মার্কিন আধিকারিকরা আশা করছেন, এর ফলে ভারতের সাথে তাদের দেশের কৃষি বাণিজ্যের ১.৩ বিলিয়ন ডলার যে ঘাটতি তা অনেকটা কমে আসবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বলা হচ্ছে ব্যাপক ভর্তুকিপ্রাপ্ত মার্কিন দেশের দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য ভারতের দুগ্ধ শিল্প বাজারের দরজা খুলে দেওয়ার ফলে ভারতের ডেয়ারি ফার্মারদের ১.০৩ লক্ষ কোটি টাকা সম্ভাব্য ক্ষতি হবে। বর্তমানে ভারত সরকার দেশের ডেয়ারি ফার্মারদের রক্ষা করার জন্য দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির উপর ৫৫ শতাংশ থেকে ৮১ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করে। এই চুক্তির ফলে এই ক্ষেত্রে কোনও আমদানি শুল্ক থাকবে না এবং এই পথ ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুগ্ধজাত পণ্য এ দেশের বাজার দখল করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি সচিব উল্লসিত হয়ে বলছেন, এই চুক্তি তাঁদের বিরাট জয়। এর ফলে ভারতের বিরাট বাজারে মার্কিন কৃষিপণ্য রপ্তানি করে আমেরিকার গ্রামীণ এলাকায় চাষিদের পকেটে ভালো পরিমাণ নগদ অর্থ ঢুকবে।

ভারতের কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহান যতই বলুন না কেন ভারতীয় কৃষক এবং ডেয়ারি শিল্পকে সরকার রক্ষা করবে, মার্কিন আধিকারিকরা কিন্তু বলছেন, ভারত সরকার মার্কিন পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো বা একেবারে তুলে দেওয়া এবং আমদানিকৃত কৃষিপণ্যের উপর অন্যান্য অ-শুল্ক বাধা তুলে দিতে সম্মত হয়েছে। কাজুবাদাম এবং পেস্তা বাদামের বাজার ভারতে সুবিস্তৃত এবং ২০২৪ সালে আমেরিকা থেকে ভারত ১.১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এইসব পণ্য আমদানি করেছে। আমেরিকা থেকে ডাল, যেমন মুসুর ডাল ও অন্যান্য হলুদ ডাল আমদানির ক্ষেত্রেও বর্তমান শুল্কের হার ৩০ শতাংশ আরোপ করা আছে। সেই শুল্ক কমিয়ে দেওয়া হবে বা একেবারেই তুলে দেওয়া হবে। এর ফলে ভারতীয় কৃষক সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ কতটা ভয়ানক হতে পারে তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। সম্প্রতি ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া এবং তার পরবর্তীকালে সমস্ত ধরনের তুলোর উপর আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে শুরু করে একেবারে শূন্যে নামিয়়ে আনার ফলে বাজারে তুলোর দাম মারাত্মকভাবে কমে গেছে এবং ভারতীয় তুলো চাষিরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারত-মার্কিন চুক্তি দেশি-বিদেশি কর্পোরেট পুঁজিকে কৃষিক্ষেত্র বিপুল মুনাফার সুযোগ করে দেবে। একই সাথে তা ভারতীয় কৃষকদের চরম বিপদের মধ্যে ঠেলে দেবে।

এই চুক্তি প্রতিরোধের ডাক দিয়ে এআইকেকেএমএস-এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড শঙ্কর ঘোষ ৪ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে কৃষক সম্প্রদায়ের স্বার্থবিরোধী এই চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনে এগিয়ে আসার জন্য জনসাধারণের কাছে আহ্বান জানান।