
শাসক দলের নেতার কথাতে নাবালিকাকে ধর্ষণ এবং খুনে অভিযুক্তদের পুলিশ ছেড়ে দিলে আর জি করের অভয়া হত্যার ফাইল নতুন করে খোলা, গুন্ডা দমনের আইন, ধর্ষণের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’-এ সব বড় বড় ঘোষণার মূল্য তবে কী? এটাই কি বিজেপি কথিত ‘ভরসা ইন’? বারুইপুরের কাছে সূর্যপুরে ১১ বছরের নাবালিকাকে খুন এবং ধর্ষণে দুই অভিযুক্তকে ধরে পুলিশের হাতে ৫ জুলাই ভোরেই তুলে দিয়েছিল এলাকার মানুষ। কিন্তু তখন তাদের গ্রেপ্তার না করে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। কেন? অভিযোগ– স্থানীয় বিজেপি নেতা পুলিশ ফাঁড়ি থেকে অটোতে চাপিয়ে প্রথমে তাদের থানায় নিয়ে যায়, তারপর তার তদ্বিরের জোরেই পুলিশ ছেড়ে দেয় তাদের। সূর্যপুরের নাবালিকাকে চার জন মিলে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা তার পরিবার ৪ জুলাইতেই থানায় জানিয়েছিল। কিন্তু জনরোষ ফেটে পড়ার আগে পুলিশ নড়ে বসার দরকারই বোধ করেনি। এলাকার মানুষই দল বেঁধে স্থানীয় হাটের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খুঁজে চিহ্নিত করেছেন অপরাধীদের। তাঁরাই রাত জেগে খুঁজে বেড়িয়েছেন মেয়েটিকে। তাঁরা পুলিশের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন, মারাত্মক কিছু ঘটার আগেই মেয়েটির জীবন রক্ষার অন্তত একটা চেষ্টা করুক পুলিশ। কিন্তু পুলিশ তার কোনও মূল্যই দেয়নি।
বিজেপি নেতারা যারা জায়গায় জায়গায় ডিম ছুঁড়ে বেড়াচ্ছেন, এক নেতা আবার বিরোধীদের দিকে তাক করে ঢিল ছোঁড়ারও নিদান দিচ্ছেন, তাঁরা সব বারুইপুরের ঘটনায় কোথায় ছিলেন? পুরো একটা দিন পুলিশ কিছু করল না কেন? বিজেপি নেতা অটোয় চাপিয়ে মানুষের হাত থেকে অপরাধীদের বাঁচিয়ে থানায় নিয়ে গেলে তার় নির্দেশ মেনে পুলিশ কেন তাদের ছেড়ে দিল? পুলিশমন্ত্রী হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর জবাব কোথায়? ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, তাঁরা ক্ষমতায় এলে ‘ধর্ষণ’ বলে কোনও শব্দ রাজ্যে থাকবে না। যদি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তবে অপরাধী ‘সকালে জমা হলে বিকেলেই খরচ হয়ে যাবে’! কিন্তু পুলিশ তো অপরাধীদের জমাই নিল না! শুধু তাই নয়, মুখ্যমন্ত্রী পরদিন ন্যক্কারজনক ভাবে বিষয়টিতে সাম্প্রদায়িক রঙ লাগানোর চেষ্টা করলেন!
বীভৎস যন্ত্রণা ভোগ করে ১১ বছরের এক মেয়েকে নিজের এলাকার মধ্যেই যখন এমন করে ক্ষত-বিক্ষত লাশে পরিণত হতে হয়, যখন যথেষ্ট সময় পেয়েও তাকে উদ্ধারের কোনও ইচ্ছাই পুলিশ দেখায় না– তখন বিক্ষোভের জোরে দাবি আদায় ছাড়া জনগণের হাতে আর কী অবশিষ্ট থাকে? মুখ্যমন্ত্রী যতই হিন্দু-মুসলমান করুন সূর্যপুরের মানুষ কোনও ধর্ম-বর্ণ, দলীয় পরিচয় কিছু না দেখে ঐক্যবদ্ধভাবে পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেমেছেন। জনরোষ ফেটে পড়ার পরে হয়তো বিক্ষোভকারী সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধেই তথাকথিত ‘গুন্ডা দমন’ আইন প্রয়োগ করে ‘ভরসা ইন’ দেখাবে সরকার। প্রবল গণবিক্ষোভের সামনে পড়ে মুখ্যমন্ত্রী মেয়েটির বাবাকে ফোন করে দেখা করার আশ্বাস দিয়েছেন, পুলিশ কর্তা দোষীদের শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু বহু সময় কাটিয়ে অপরাধীদের অপকর্মের সমস্ত সুযোগ করে দেওয়ার দায় কেউ নিলেন না! সরকার প্রকারান্তরে বলেই দিল জনগণ নেমে দুষ্কৃতীদের না খুঁজলে, পুলিশের ওপর ক্ষোভে জ্বলে না উঠলে এইটুকু সংবেদনশীলতাও দেখানোর দায় সরকারি কর্তারা অনুভব করেন না। সরকারি গদিতে যে রঙের ঝান্ডাধারীরাই অধিষ্ঠান করুন না কেন, ধর্ষক-খুনীদের জন্য অবাধ বিচরণের অসুবিধাই নেই দেখা গেল।
মনে পড়ে যায় জয়নগরের আর এক নিহত-ধর্ষিতা কিশোরীর কথা। তৎকালীণ তৃণমূল সরকারের আমলে পুলিশ ঠিক একই রকম ভূমিকা নিয়ে পরিবারকে এক থানা থেকে আর এক থানায় ছুটিয়ে নিয়ে বেড়িয়েছিল। অবশেষে সাধারণ মানুষ তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুললে পুলিশ সে দিন নড়ে বসেছিল কিছুটা। বানতলায় সরকারের মহিলা অফিসারের ধর্ষণ ও নৃশংস খুনের পর সিপিএম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ‘এমন তো কতই হয়’ মন্তব্যও মানুষ ভুলতে পারে না।
শাসক দলগুলো এলাকায় দাপট বজায় রাখা ও ভোটে জেতার জন্য দষ্কৃতীদের কীভাবে মদত দেয়, তা এ রাজ্যের মানুষের দীর্ঘদিন ধরেই জানা আছে। পুলিশ, প্রশাসনিক কর্তা, দুষ্কৃতী-মস্তান ও শাসক দলের নেতাদের এক অশুভ চক্রই সমস্ত এলাকার আসল পরিচালক। এর সাথে আছে মোবাইলের মাধ্যমে ব্লু-ফিল্ম, যৌন উত্তেজক ভিডিও এবং মদ ও মাদকের অবাধ প্রসার। অনেক ক্ষেত্রেই শাসক দলের শক্তি ও টাকার উৎস এই সমস্ত চক্রই। আর জি করের ঘটনা দেখিয়েছিল এই দুষ্কৃতীচক্রের হাত কতদূর লম্বা। সিবিআইও সে হাত পর্যন্ত পৌঁছানোর চেষ্টা আজও করল না! ওই ছোট্ট কিশোরীর যন্ত্রণাবিদ্ধ দেহটা সারা রাজ্যের মানুষের কাছে প্রশ্ন রেখে গেল– এই অশুভ শক্তিই কি জয়ী হবে? নাকি সূর্যপুরের জনগণ সমস্ত ভয় কাটিয়ে যে ভাবে রুখে দাঁড়িয়েছেন তাকে সংগঠিত রূপ দিতে মানুষ এগিয়ে আসবে। ওই কিশোরীর স্মৃতি মানুষের বিবেকের কাছে আকুতি জানায়, এলাকায় এলাকায় নারী নির্যাতন বিরোধী ভলান্টিয়ার বাহিনী গড়ে তোলার। আকুতি জানায় সামাজিক আন্দোলনের জোয়ার তুলে এই দুষ্কৃতী চক্রকে নির্মূল করার পথে এগিয়ে যাওয়ার। দুষ্কৃতীদের শাস্তি দানে পুলিশকে বাধ্য করতে হলে এ ছাড়া কোনও রাস্তা নেই।