
সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে (১৭-১৮ ডিসেম্বর) কেন্দ্রের বিজেপি সরকার লোকসভায় ও রাজ্যসভায় সমস্ত বিরোধী দলগুলির বক্তব্যকে উপেক্ষা করে পাশ করিয়ে নিল ‘সাসটেনেবেল হারনেসিং অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অফ নিউক্লিয়ার এনার্জি ফর ট্রান্সফরমেশন ইন্ডিয়া’ সংক্ষেপে ‘শান্তি’ বিল-২০২৫। এ রকম একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডিং কমিটিতে পর্যালোচনার জন্য না পাঠিয়ে কার্যত কোনও রকম আলোচনা ছাড়াই গায়ের জোরে পাস করানো হল। এরপর রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু অত্যন্ত তৎপরতায় ২০ ডিসেম্বরই এতে স্বাক্ষর করায় এটি আইনে পরিণত হল।
কেন্দ্রের যুক্তি– তাদের স্বপ্নের ‘বিকশিত ভারতে’ বিদ্যুতের চাহিদা এত বাড়বে যে, ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট পরমাণু বিদ্যুৎ তৈরি করতে হবে। এর মধ্যে ২০৩১-৩২ সালে ২২ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো প্রয়োজন। এই লক্ষ্যেই পূর্বতন পরমাণু বিদ্যুৎ শক্তি আইন-১৯৬২ এবং ‘সিভিল লায়াবেলিটি ফর নিউক্লিয়ার ড্যামেজ অ্যাক্ট’ ২০১০ (সিএলএনডি) আইন বাতিল করে ‘শান্তি’ আইন-২০২৫ আনা হল।
অতঃপর ভারতীয় একচেটিয়া পুঁজিপতিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের বহুজাতিক সংস্থার সাথে যুক্তভাবে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করবে এবং বিদ্যুৎ বিক্রি করে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করবে। কিছু কাল ধরেই এ নিয়ে তৎপরতা চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্টে্রর শক্তি দপ্তর তাদের দেশের বহুজাতিক সংস্থা ‘হোলটেক ইন্টারন্যাশনাল’কে এক্সপোর্ট লাইসেন্স দেয় ২০২৫-এর মার্চ মাসে, যাতে সে ভারতের কোম্পানিগুলিকে এস এম আর-৩০০ প্রযুক্তি সরবরাহ করতে পারে। এর পরেই ভারত ও মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তি (১২৩ চুক্তি) কার্যকরী করতে দু’পক্ষই উদ্যোগী হয়। বাস্তবে বেশ কিছু মার্কিন সংস্থা (হোলটেক ইন্টারন্যাশনাল, ডাবলুইসি, জিই, হিতাচি প্রভৃতি) এবং ভারতীয় সংস্থা টাটা, এল অ্যান্ড টি, আদানি ও আম্বানি গোষ্ঠীর কোম্পানিগুলির স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকার তড়িঘড়ি এই আইন নিয়ে এসেছে।
পারমাণবিক বোমার জ্বালানি বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার উদ্যোগ
কী আছে এই নতুন আইনে যা পূর্বোক্ত দুটি আইনের থেকে ভিন্ন? প্রথমত, ১৯৬২ সালের পরমাণু বিদ্যুৎ আইনে বলা হয়েছিল পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে হবে। কারণ পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ এবং তার প্রাথমিক আর্থিক বিনিয়োগ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। মোদি সরকার ঠিক উল্টো যুক্তি দিয়ে বলেছে, এত ব্যয় কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না কারণ কেন্দ্রীয় বাজেটে অর্থসংকট (যদিও পুঁজিপতিদের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে অর্থসংকট হয় না)। তাই এই আইনে পূর্বতন সরকারি নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে বলা হয়েছে, দেশি-বিদেশি বেসরকারি বহুজাতিক সংস্থা এই ধরনের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে পারবে।
দ্বিতীয়ত, এই আইনে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমস্ত মুনাফা হবে বিনিয়োগকারীদের। কিন্তু সমস্ত ঝুঁকি ও ক্ষতিপূরণের দায় সরকারের, অর্থাৎ বাস্তবে জনগণের। এই সব দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দায়িত্ব থাকবে পারমাণবিক খনিজ সমৃদ্ধ খনি থেকে পারমাণবিক জ্বালানি সংগ্রহ, পারমাণবিক চুল্লি তৈরি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা ও সর্বোচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রি করা এবং সর্বশেষ পরমাণু কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া। আর সরকারের দায় হল পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদন, ভারী জল (হেভি ওয়াটার) উৎপাদন এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, জটিল, কঠিন ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। প্রশ্ন হচ্ছে, পরমাণু বিদ্যুতের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম-২৩৫ যার দ্বারা পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব, তা এই দেশি-বিদেশি বেসরকারি বহুজাতিক সংস্থা ও প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর হাতে কতখানি নিরাপদ? ফলে দেশের ও জনসাধারণের নিরাপত্তা আজ কঠিন প্রশ্নের মুখে।
বিদেশি কোম্পানির স্বার্থেই সিএলএনডি আইন ২০১০ বাতিল
সিএলএনডি আইনের ১৭ (বি) ধারা অনুসারে পারমাণবিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লির সাপ্লায়ার এবং মালিকের দায়বদ্ধতা অত্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়ে বলা ছিল, তাদের যন্ত্র ও সরঞ্জাম এবং কর্মচারীদের ত্রুটির জন্য এই সব কোম্পানি দায়বদ্ধ থাকবে। আমেরিকা ও ফ্রান্সের কোম্পানিগুলি ভারতীয় মালিকদের সাথে মিলে তাদের দায়বদ্ধতাকে জনগণের ঘাড়ে ঠেলতে চাইছে। এদের খুশি করতে ‘শান্তি’ আইনে এই ধারা সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আগের সিএলএনডি আইনের ৪৬ ধারায় পারমাণবিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পরিচালকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সমস্ত ক্ষমতা, পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রকদের দেওয়া হয়েছিল। নতুন ‘শান্তি’ আইন-২০২৫ এ পরমাণু দুর্ঘটনার প্রশ্নে পরিচালক বা সাপ্লায়ারদের ত্রুটি বা অপদার্থতার শাস্তির কোনও বিধান বা অধিকার সরকারের থাকল না।
২০০৮ সালে কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকারের শাসনে ভারত-আমেরিকা পরমাণু চুক্তি হয়, যার দ্বারা এ দেশে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পুঁজি বিনিয়োগের দরজা খুলে দেওয়া হয়। এ সত্ত্বেও জনমতের চাপে তৎকালীন কেন্দ্রীয় কংগ্রেস সরকার সিএলএনডি আইন ২০১০ চালু করতে বাধ্য হয়। কিন্তু বর্তমান বিজেপি সরকার বিগত এক দশক ধরে আমেরিকা ও ফ্রান্সের পরমাণু বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলির চাপে (বিশেষত ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর) এবং তাদের এ দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য আকৃষ্ট করতে পূর্বোক্ত আইন দুটোকে নস্যাৎ করে দিয়ে এই ‘শান্তি’ আইন-২০২৫ জোর করে চালু করেছে, যার দ্বারা এ দেশের একচেটিয়া পুঁজিকেও (আদানি, আম্বানি, টাটা প্রমুখ) পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পুঁজি নিবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্ঘটনার প্রশ্নে যতটুকু রক্ষাকবচ ও শাস্তি বিধান ছিল তাও তুলে দিল সরকার।
ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার স্মৃতি ভেসে উঠছে
১৯৮৪ সালের ৩ ডিসেম্বর মধ্যপ্রদেশের ভোপালে ভয়াবহ গ্যাস দুর্ঘটনা হয়। ইউনিয়ন কার্বাইড পরিচালিত এই কারখানায় বিষাক্ত মিক গ্যাসের প্রভাবে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। আজ ৪০ বছর পরেও তার প্রভাব এবং জের পরবর্তী প্রজন্মের উপর লক্ষ করা যাচ্ছে। পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব এবং ক্ষয়ক্ষতি এর চেয়েও অনেক গুণ ভয়াবহ, যার জের ৮০ বছর পর আজও জাপানের হিরোশিমা নাগাসাকিতে চলছে। আমাদের সামনে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিল (১৯৮৬), জাপানের ফুকুশিমা (২০১১) ও আমেরিকার থ্রি মাইল আইল্যান্ডে (১৯৭৯) পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াবহ দুর্ঘটনার কথা জানা আছে। ৪০ বছর পরেও চেরনোবিলে পারমাণবিক দুর্ঘটনার প্রভাবে ইউরোপের ১৩টি দেশে এক লক্ষ একষট্টি হাজারের বেশি বর্গমাইল জুড়ে ভীষণ ভাবে তেজস্ক্রিয়তার ক্ষতি বর্তমান। সে ক্ষেত্রে এই শান্তি ২০২৫ আইনে ব্যক্তিগত শারীরিক ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত অভিযোগের সর্বোচ্চ সময়সীমা কুড়ি বছরের মধ্যে ধরা হয়েছে। তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই এটার বাহ্যিক প্রকাশ ৩০-৪০ বছর পরেও হতে পারে (বিশেষত বিকলাঙ্গ শিশু জন্মের ক্ষেত্রে)। ফলে এই আইনে ২০ বছর সময়সীমা থাকায় তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ জনই কোনও ক্ষতিপূরণ পাবেন না।
শান্তি নয়, এই আইন যুদ্ধের বিপদ বাড়াবে
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘পারমাণবিক শক্তি একটি স্বচ্ছ শক্তি’। তার জন্য এর নাম দেওয়া হয়েছে, ‘শান্তি’ আইন। এটা কি আদৌ সত্য? পারমাণবিক শক্তি কি যথার্থই শান্তি নিয়ে আসবে?
অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এটি মারাত্মক দুর্ঘটনাপ্রবণ। দ্বিতীয়ত, এটার জন্য যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি হবে তার দ্বারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা যায়। ভারত একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। তার পরমাণু অস্ত্র ভাণ্ডার আছে। এই পারমাণবিক শক্তি তাকে আরও পারমাণবিক অস্ত্র সজ্জিত করবে, পরিণত করবে আরও বৃহৎ পারমাণবিক শক্তিধর দেশে, যা আগামী দিনে পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলবে। বিশ্বজুড়ে অশান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করবে। হিরোশিমা নাগাসাকি থেকে চেরনোবিল হয়ে ফুকুশিমা ও থ্রি মাইল আইল্যান্ড দুর্ঘটনা প্রমাণ করেছে পারমাণবিক শক্তি আদৌ স্বচ্ছ বা নিরাপদ নয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রযুক্তির বাজার তৈরি করে মুনাফা করাই লক্ষ্য
অনেকে মনে করেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র দূষণ ছড়ায়। সে ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রদূষণ মুক্ত। এ কথাটা কি সর্বাঙ্গীন সত্য?
এই নিবন্ধে আগেই বলা হয়েছে, পারমাণবিক জ্বালানি এবং পারমাণবিক বর্জ্য দুটোই প্রবলভাবে তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়ায় যার প্রভাব বহু বছর ধরে থাকে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম তার শিকার হয়। ক্যান্সার, বিকলাঙ্গতা, বন্ধ্যাত্ব তার মধ্যে অন্যতম। এর জন্য জার্মানি সহ ইউরোপের বহু দেশ পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে। আমেরিকা ও ফ্রান্স এ দেশে পরমাণু চুল্লি তৈরি করতে আগ্রহী। কারণ তাদের দেশে জনমতের চাপে নতুন করে পরমাণু কেন্দ্র গড়ে উঠছে না। এ দিকে তাদের পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দে্রর প্রযুক্তির বাজার চাই। তাই তারা ভারতের মতো দেশে বিক্রি করতে আগ্রহী।
ফুকুসিমা দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে জাপান নতুন করে পরমাণু কেন্দ্র আর তৈরি করছে না। গোটা বিশ্ব জুড়ে পরিবেশপ্রেমী মানুষ পরমাণু চুল্লির তেজস্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন। দূষণমুক্ত বিকল্প শক্তির দাবি জানাচ্ছেন। এ দেশেও দূষণমুক্ত বিকল্প শক্তির সম্ভাবনা প্রবল। বিশেষ করে সৌর বিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ। অথচ বিজেপি সরকার দেশি-বিদেশি একচেটিয়া পুঁজি ও বহুজাতিক সংস্থার স্বার্থে পরমাণু চুল্লি স্থাপনের মধ্যে দিয়ে এ দেশের মানুষকে নতুন করে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আশার কথা, দেশের মানুষ এর প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন। সারা ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাথে যুক্ত শ্রমিক কর্মচারী ও ইঞ্জিনিয়ারদের সংগঠন (এনসিসিওইইই) এর প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির সংযুক্ত প্ল্যাটফর্ম এবং কৃষক ও কৃষিজীবী মানুষের সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম ‘সংযুক্ত কিসান মোর্চা’ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে। দেশের সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এর বিপদ অনুধাবন করে নিশ্চয়ই এর প্রতিবাদে সোচ্চার হবেন।