
অসীম দুর্ভোগ সয়ে অবশেষে দেশের মাটিতে পা রাখতে পেরেছেন সোনালি বিবি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে অধিষ্ঠিত শাসক দল বিজেপির দুরভিসন্ধির মুখোশ খুলে দিয়ে গেল তাঁর এই যন্ত্রণাময় ৬টি মাস। সারা দেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের রাজনীতিকে পাকাপোক্ত করে তুলতে অনুপ্রবেশ আতঙ্ক তৈরির যে ছক কষছে বিজেপি আসন্ন বাংলা ও আসামের বিধানসভা ভোটযুদ্ধ উতরোতে– সোনালিরা তারই দুর্ভাগা শিকার।
অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে বীরভূমের মুরারই বিধানসভা এলাকার সোনালি বিবি, তাঁর স্বামী দানিশ শেখ এবং আট বছরের পুত্র সাবির শেখ সহ মোট ৬ জনকে গ্রেফতার করে গত জুন মাসে সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে বাংলাদেশে জোর করে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছিল কেন্দে্রর বিজেপি সরকার। ৬ মাস আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে মোদি সরকার বাংলাদেশ থেকে তাদের ফেরত আনতে বাধ্য হল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে।
দিল্লি, হরিয়ানা সহ বাংলার পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলিতে বাংলা ভাষায় কথা বললেই তাকে বাংলাদেশি দাগিয়ে দিয়ে গ্রেপ্তার করে কোনও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার এক নারকীয় অভিযান বিজেপি সরকার শুরু করেছিল কয়েক মাস আগে। সেই সময় দিল্লিতে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কর্মরত বীরভূমের সোনালিদের গ্রেপ্তার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পুলিশ। পুলিশ অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানো সংক্রান্ত আইনের অ-আ-ক-খ জানে না এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। তা হলে কার নির্দেশে দিল্লি পুলিশ তাঁদের কোর্টে না তুলে শুধুমাত্র গায়ের জোরে বাংলাদেশে ঠেলে দিল? এই বেআইনি কাজটা পুলিশ করল কাদের ভরসায়? সুপ্রিম কোর্ট সঠিক ভাবেই বলেছে– সোনালিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে রাতের অন্ধকারে কাঁটাতারের ওপারে ঠেলে দেওয়া মানবাধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন।
২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকাকে এসআইআর বৈধ নাগরিকত্বের দলিল হিসেবে মান্যতা দিয়েছে। সোনালি শেখের বাবা ভদু শেখ মুরারই বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার, যাঁর নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় রয়েছে। কলকাতা হাইকোর্ট সোনালিদের দেওয়া ডকুমেন্ট বিচার করে তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, বাংলাদেশে সোনালিদের ঠেলে পাঠানোর ঘটনা আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বাস্তবিক হাইকোর্টের বক্তব্যের অর্থ– দিল্লি পুলিশ সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ করেছে। তবে এই বেআইনি কাজের জন্য দিল্লি পুলিশের শাস্তি হবে না কেন? বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ আদালতও সোনালিদের ভারতীয় হিসেবে রায় দিয়ে ভারত সরকারকে বলেছে তাদের ফেরত নেওয়ার জন্য। কলকাতা হাইকোর্ট ২৬ সেপ্টেম্বর সোনালিদের ভারতে ফেরানোর নির্দেশ দিলেও মোদি সরকার তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারের সব ওজর আপত্তি অগ্রাহ্য করে ভারতে সোনালিদের ফিরিয়ে আনার রায় বহাল রাখে।
এই পরাজয় ঢাকতেই মোদি সরকার নতুন ঢাল খাড়া করেছে। বলেছে, সোনালিদের ফিরিয়ে আনা হবে মানবিকতার খাতিরে। কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকের সমস্যা সমাধানে মানবিক হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট যখন তাঁদের বাংলাদেশে পাঠানোকেই বেআইনি বলেছে, সেখানে আলাদা করে মানবিকতার কথা এখন সরকার তুলছে কেন? সোনালিকে অন্তঃসত্ত্বা জেনেও যে দিন রাতের অন্ধকারে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হল, তাঁরা কোথায় যাবেন, কী খাবেন, কোন শত্রুর মুখে পড়বেন, সোনালির সন্তান কোন পরিবেশে কী ভাবে ভূমিষ্ঠ হবে– এ সব কোনও কিছুরই তোয়াক্কা করা হল না, সে দিন তাঁদের মানবিকতা কোথায় বন্দি ছিল? সম্পূর্ণ অন্যায় ভাবে বাংলাদেশে সোনালিদের কয়েক মাস জেল খাটানো হল। অন্তঃসত্ত্বা সোনালি বিবির যে মেডিকেল পরিষেবা দরকার ছিল– তা থেকে বঞ্চিত করা হল। গর্ভাবস্থাতেই তার সন্তান অপুষ্টির শিকার হল। এর ফলে গর্ভস্থ সন্তান কোনও শারীরিক সমস্যা নিয়ে জন্মালে তার দায় কার? জন্মের আগেই শিশু পেল রাষ্ট্রীয় অত্যাচার। এর চেয়ে নির্মম আর কী হতে পারে! এত বড় অপরাধ করেও বিজেপির নেতারা বেপরোয়া। সম্প্রতি নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্য মন্তব্য করলেন, ‘অনেক রূপালির মাঝে একটা সোনালি’! এগুলোও কি মানবিকতার নিদর্শন?
আবার এখন সরকার বলছে সোনালিকে প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি ভদু শেখের কন্যা। কোর্টে দাঁড়িয়ে ভদু শেখ বলেছেন, সোনালি তাঁর মেয়ে। সোনালি বলেছেন, ভদু তাঁর পিতা। আদালতকে দেওয়া এই স্বীকারোক্তির কোনও মূল্য নেই সরকারের কাছে? এরপর কি তবে সরকার বলবে ডিএনএ টেস্ট করতে হবে? এই সরকারের মানবিকতার নিদর্শন? সরকার যদি এত অমানবিক হয়, আইনকে দু’পায়ে মাড়ায়, অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেয়, তা হলে পরিস্থিতি কতখানি শ্বাসরোধকারী হয়ে ওঠে ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।
পরিযায়ী বাংলাভাষী শ্রমিকদের উপর বিজেপির এই হামলার বিরুদ্ধে তৃণমূলের ভূমিকা কী? তাদের এত এমপি থাকা সত্তে্বও, তৃণমূল নেত্রী বিরোধী জোটের একজন অন্যতম নেত্রী হওয়া সত্তে্বও কেন দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলতে পারলেন না? তাঁরা শ্রমিকদের বললেন– বাংলায় চলে এসো, মাসে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হবে। ঘোষণা করলেন, শ্রমশ্রী প্রকল্প। কেন, ভারতবাসী হিসাবে দেশের যে কোনও প্রান্তে তাঁদের পছন্দমতো জায়গায় কাজ করার অধিকার কি তাঁদের নেই? যদিও সেই শ্রমশ্রী প্রকল্পও ধুঁকছে। কেউ একবার টাকা পেয়েছেন, কেউ পাননি! এখন অনেকেই আবার চলে যাচ্ছেন অন্য রাজ্যে কাজের আশায়। কারণ মানুষ যেখানে বেশি মজুরি পাবে সেখানেই যাবে।
সোনালির এই হেনস্থাপর্ব কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সোনালিরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিকার। ফলে সোনালি ইস্যুতে লড়াইটাও এমন ভাবে কাম্য নয় যাতে মৌলবাদই উস্কানি পায়। লড়তে হবে গণতান্ত্রিক লাইনের ভিত্তিতে। সোনালির পরিবার সঠিকভাবেই বলেছে, বাংলাদেশি দেগে দিলেই বাংলাদেশি হবে না, সে কথা প্রমাণ করতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারকে। সোনালিদের নিয়ে কেন এই সরকারি হেনস্থা? বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই হেনস্থার মূলে রয়েছে বিজেপির মুসলিমবিরোধী নীতি, যা তাদের ভোট রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে রাজনীতির মধ্যে হিন্দুপ্রীতির ছিটেফোঁটাও নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোটকে ধর্মীয় মেরুকরণের পথে বিজেপির দিকে টেনে আনাই এর একমাত্র লক্ষ্য এবং সেই অভিসন্ধি নিয়েই বিজেপির অনুপ্রবেশ তত্ত্ব। কয়েক কোটি বাংলাদেশি ভারতে ঢুকে এ দেশের সম্পদের মালিক হয়ে বসছে, তাই ভারতীয়দের এত দুর্দশা– এই ভাষ্য তৈরি করে বিজেপি সরকার এক ঢিলে অনেক পাখি মারতে চাইছে। তাৎক্ষণিক লাভ হল ভোট। দীর্ঘমেয়াদি লাভ হল জনজীবনের সমস্যার মূল কারণ যে পুঁজিবাদী শোষণ ও সরকারের জনবিরোধী শাসন, তা জনগণের থেকে আড়াল করা। ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ বাড়িয়ে শোষিত মানুষের ঐক্যে ফাটল ধরানো, যাতে তারা একজোট হয়ে প্রতিবাদ-আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারে। এই মূল কথাটা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমস্ত অংশের শোষিত মানুষকে আজ মনে রাখতে হবে। সোনালিদের হেনস্থা-পর্ব শাসকের যে অমানবিক চরিত্র নতুন করে সামনে নিয়ে এল, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদই তার একমাত্র সমুচিত জবাব হতে পারে।