
তত্ত্ব বোঝা মানে কতকগুলো বড় বড় কথা শেখা নয়। কোনও তত্ত্ব বোঝারই কোনও মূল্য নেই যদি ডিসিপ্লিন না থাকে, যদি তা কাজ করতে না শেখায়। তত্ত্ব প্রকৃত বোঝার অর্থ, কী ভাবে সুশৃঙ্খল আচরণ করতে হয় তা শেখা। কী ভাবে আচরণ করতে হয় তাই শিখছেন না, আচরণ করছেন উল্টো, আর মনে করছেন, খুব বড় জিনিস বুঝেছেন, তা কখনও হয়? তার মানে বুঝছেন সব গোলমেলে জিনিস। বুঝছেন বলে মনে করছেন, কিন্তু আসলে বাজে জিনিস বুঝছেন। শিখছেন না কিছুই। যতটুকু ঠিক বুঝছেন ততটুকু সংযমী হবেন, সুশৃঙ্খল হবেন, আচরণে তা প্রকাশ পাবে, ততটুকু ঠিক আচরণ করবেন, ততটুকু পরিমিতি জ্ঞান হবে। বেশি বোঝার মানে তো এই যে, জ্ঞান বেশি হবে, বেশি সংযমী হবেন, নিজের উপর বেশি নিয়ন্ত্রণ আসবে, বেশি সহ্য করবার শক্তি আসবে। শেখবার ফল ও প্রক্রিয়া হল এটাই। …
আপনারা দশ লক্ষ লোক জড়ো করেও যদি এ রকমই থাকেন, তা হলে বিপ্লব আপনাদের দ্বারা হবে না, এ আমি লিখে দিতে পারি। বিপ্লবী দল দশ লক্ষ লোকের কম নিয়ে, এমনকি এক লক্ষ লোক নিয়েও বিপ্লব করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস, যদি সে দল সুসংবদ্ধ সুশৃঙ্খল হয়, তার প্রতিটি কর্মী শৃঙ্খলাপরায়ণ হয়, তাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত উদ্যোগ থাকে, বিপ্লবীসুলভ আচরণ থাকে, তেজ থাকে ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা থাকে। তারা ঝুঁকি নিতে পারে, কোনও অবস্থাতেই দিশাহারা হয় না, এবং সব অবস্থায় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবার জন্য, রাজনীতির দিক থেকে, তত্ত্বের দিক থেকে, শরীর ও মনের দিক থেকে তারা নিজেদের তৈরি করেছে। দলের প্রত্যেকটি কর্মী যদি এ রকম হয়, তা হলে এক লক্ষ কর্মীর পার্টি ভারতবর্ষে বিপ্লব জয়যুক্ত করতে পারে। এই দিকে লক্ষ রেখে আপনাদের ভাবতে হবে।
আপনারা বুঝতেই পারছেন, এটা আমি আমার নিজের দলের সমালোচনা করছি। এখানে আমার সমালোচনার লক্ষ্য অন্য কোনও দল নয়। আমার দুশ্চিন্তা কী নিয়ে, কী আমাদের করা উচিত, তা আমি বললাম। প্রতিটি কর্মীরই এতে সাড়া দেওয়া উচিত। যদি তাঁরা সাড়া না দেন, তা হলে মেছোবাজার হবে, তা দিয়ে বিপ্লব হবে না। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বিপ্লব করা যায় না। বিপ্লবের প্রতিটি মানুষ হবে সচেতন, সক্রিয় ও সুশৃঙ্খল। নভেম্বর বিপ্লবের শিক্ষা আলোচনা প্রসঙ্গে এটা অনেকের কাছে ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ মনে হতে পারে। কিন্তু, আজ আমাদের কাছে এটাই নভেম্বর বিপ্লবের বাস্তব শিক্ষা। কারণ, নভেম্বর বিপ্লব যে বিপ্লবীদের তৈরি করেছিল, তারা প্যানপ্যানে ছিল না, ভণ্ড ছিল না। এ সব নিয়ে নভেম্বর বিপ্লব করা সম্ভব হয়নি। যারা নভেম্বর বিপ্লব করেছে, তারা যে কোনও পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত ছিল। তারা ভালবাসা, নরনারীর সম্পর্ককে বিপ্লবের থেকে, দলের থেকে বড় স্থান দেয়নি। আমরাও বক্তৃতায় দিই না, আলোচনার সময় দিই না, কিন্তু কাজে ও আচরণে দিই, ব্যবহার করি সে রকম। ফলে, দায়িত্ববান আমরা হতে পারি না, আমাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ নষ্ট হয়ে যায়। কাজেই আপনাদের সামনে আমার বক্তব্য, কর্মী তৈরি করা এবং ডিসিপ্লিন শেখানো ও রক্ষা করা আমাদের এখন খুব দরকার।
অন্ধ অনুকরণ করে বিপ্লব করা যায় না