
সম্প্রতি এনসিইআরটি কর্তৃপক্ষ ইতিহাসের সিলেবাসে টিপু সুলতানের নামের আগে ‘মহান’ শব্দটি বাদ দিয়েছে। বিজেপি শাসিত অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা এ কাজের জন্য এনসিইআরটি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘‘টিপু-ইপুকে একেবারে মারো …। যেখানে পাঠানোর দরকার সেখানেই পাঠিয়ে দাও। … সাগরে ছুঁড়ে ফেলো।’’ টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে বিজেপির এই তীব্র বিদ্বেষের কারণ কী? তাঁর কোন ‘অপরাধের’ জন্য তাঁদের এই বিদ্বেষ? ইতিহাসবিদরাই বা কোন বিচারের ভিত্তিতে টিপুর নামের সঙ্গে ‘মহান’ উপাধিটি যোগ করেছিলেন? টিপুর নিজ রাজ্য মহীশূর তথা কর্ণাটকে আজও হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে তাঁর সম্পর্কে গভীর শ্রদ্ধা অটুট কেন?
ঐতিহাসিক চরিত্রের বিচার কী ভাবে
এই বিতর্কে যাওয়ার আগে আমাদের দেখতে হবে কোনও ঐতিহাসিক চরিত্রের ভাল-মন্দ আমরা কী দিয়ে, কী ভাবে, কোন মাপকাঠিতে বিচার করব। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে টিপুর যুগ এবং আজকের যুগ সম্পূর্ণ আলাদা। আজ থেকে আড়াইশো বছর আগে টিপুর সময়কাল। টিপুকে বিচার করতে গেলে সেই সময়ের রাজনৈতিক সামাজিক প্রেক্ষাপটেই বিচার করতে হবে। আজকের প্রেক্ষাপটে ফেলে তার বিচার করতে গেলে ভুল হতে বাধ্য এবং এটা ইতিহাস বিচারের কোনও বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়াও নয়। বিজেপি যদি শত শত বছর আগেকার কোনও ঘটনার প্রতিকার করতে বা প্রতিশোধ নিতে বসে, তবে সবার আগে দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনের সীমাহীন অন্যায়, শোষণ-লুণ্ঠনের অপরাধের প্রতিশোধের জন্য ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হয়, ব্রিটেনের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত রকম আদান-প্রদানও বন্ধ করে দিতে হয়। বিজেপি নেতারা নিশ্চয় তা করবেন না। তা হলে হঠাৎ টিপু সুলতানের বিচারই বা তাঁরা আজ কয়েকশো বছর পরে বসে করছেন কেন?
শাসক হিসাবে টিপু সুলতান
দেখা যাক টিপু সুলতান কেমন নবাব ছিলেন। পিতা হায়দর আলির শাসনের পর ১৭৮২ থেকে ১৭৯৯ পর্যন্ত মহীশূরের শাসনক্ষমতায় ছিলেন টিপু সুলতান। ১৭৯৯-তে তিনি ব্রিটিশের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হন। প্রথম কথা, টিপু এবং মহীশূর রাজ্য অন্যান্য রাজ্য থেকে আলাদা কিছু ছিল না। সে যুগে অন্য সব রাজা-নবাবদের যে আচরণ, চাল-চলন লক্ষ করা যেত তার অনেকগুলিই টিপুর মধ্যেও বর্তমান ছিল।
আবার অনেক কিছুতে টিপু ছিলেন সমসাময়িক রাজা, নবাব, সুলতানদের থেকে আলাদা– যা তাঁকে এক বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। নতুন নতুন বিষয় চালুর প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। যেমন, তিনি নতুন ধরনের পঞ্জিকা, নতুন ধরনের মুদ্রা-ব্যবস্থা এবং নতুন ধরনের ওজনের মান চালু করেছিলেন। আধুনিক জ্ঞানচর্চায় তাঁর বিশেষ আগ্রহের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর উন্নত মানের গ্রন্থাগার থেকে। তাঁর গ্রন্থের সংগ্রহে ছিল ধর্ম, ইতিহাস, রণনীতি, চিকিৎসা ও গণিতের অসংখ্য বই। ফরাসি বিপ্লবের ‘স্বাধীনতা-সাম্য-মৈত্রী’র স্লোগান তাঁকে বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ফরাসি বিপ্লবে নেতৃত্বকারী সংগঠন, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংগঠন ‘জ্যাকোবিন ক্লাব’-এর সদস্যও হয়েছিলেন তিনি।
টিপু তাঁর শাসনে পলিগার (জমিদার)দের পুরুষানুক্রমিক ভাবে সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার বিলোপের চেষ্টা করেছিলেন। সেই সময়ে ভারতের সর্বত্র যখন সৈনাবাহিনীর মধ্যে নিয়ানুবর্তিতার খুবই অভাব দেখা যেত, সেখানে টিপু তাঁর সেনাবাহিনীতে দৃঢ় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বাহিনীকে অত্যন্ত আধুনিক করে সাজাতে চেয়েছিলেন। সৈন্য পরিচালনায় তাঁর অসামান্য দক্ষতা ছিল।
অষ্টাদশ শতকের যে কোনও ভারতীয় শাসকের চেয়ে আগে এবং পরিপূর্ণ ভাবে একমাত্র টিপুই ধরতে পেরেছিলেন যে, ব্রিটিশ শক্তি শুধু দাক্ষিণাত্যে নয়, সমগ্র ভারতের যে কোনও শক্তির পক্ষে ভীতি ও বিপদের কারণ। সমসায়য়িক বেশির ভাগ রাজা-নবাবরা যখন নানা ভাবে ব্রিটিশের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে বা অধীনতা স্বীকার করে নিজেদের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে ব্যস্ত ছিল তখন ক্রমবর্ধমান ব্রিটিশশক্তির বিরুদ্ধে অবিচল দৃঢ়তা নিয়ে টিপু রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এর ফলে ইংরেজরা তাঁকে ভারতে তাদের ভয়ঙ্কর শত্রু হিসাবে গণ্য করেছিল। বাস্তবিক টিপুর পরে ব্রিটিশদের চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ বাকি ছিল না।
হায়দর আলি এবং টিপুর শাসন কালে মহীশূরে তার আগের তুলনায় এবং দেশের অন্যান্য স্থানের চেয়ে বেশি বৈষয়িক উন্নতি ঘটেছিল। ১৭৯৯-এ টিপুকে হত্যা করে ইংরেজরা যখন মহীশূর রাজ্য দখল করে তখন তারা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছিল, ব্রিটিশ অধিকারভুক্ত মাদ্রাজের কৃষক সমাজের থেকে মহীশূরের কৃষক সমাজ অনেক বেশি পরিমাণ সমৃদ্ধির অধিকারী। ১৭৯৩ থেকে ১৭৯৮ পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর ছিলেন জন শোর। পরবর্তী সময়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘টিপুর রাজ্যে প্রজাদের স্বার্থ সুরক্ষিত, কাজ করতে তারা উৎসাহিত হয়, কারণ শ্রমের ফল তারা ভোগ করতে পায়।’ আধুনিক ধারায় শিল্প-বাণিজ্য চালুর প্রয়োজনীয়তা সর্বপ্রথম সম্ভবত টিপুই উপলব্ধি করেছিলেন। বিদেশি শিল্প-বিশেষজ্ঞ নিয়ে এসে তাঁদের সাহায্যে তিনি আধুনিক শিল্পোদ্যোগ প্রবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। তখন রাজ্যের অনেকগুলি শিল্পসংস্থাকে সরকারি অর্থসাহায্যও দেওয়া হত। বৈদেশিক বাণিজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে তিনি ফ্রান্স, তুরস্ক, ইরান ও পেগুতে রাষ্ট্রদূত পাঠিয়েছিলেন। অন্যায় ভাবে কোনও বাড়তি কর আদায় রোধ করেছিলেন তিনি। রাজস্ব মকুব বিষয়েও তিনি উদারতার পরিচয় দিতেন।
টিপু কি পরধর্মবিদ্বেষী ছিলেন
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদরা টিপুকে পরধর্ম বিদ্বেষী হিসেবে চিত্রিত করেছেন। বাস্তব ঘটনা থেকে এটা সত্য বলে প্রমাণ করা যায় না। স্বধর্মে তাঁর নিষ্ঠা অবশ্যই ছিল, কিন্তু কার্যত তিনি পরধর্মসহিষুiর ছিলেন। অন্য ধর্মের ব্যাপারে তাঁর মনোভাব উদারই ছিল। ১৭৯১তে মারাঠা অশ্বারোহী বাহিনীর নেতা রঘুনাথ রাও পট্টবর্ধন শৃঙ্গেরী মঠ লুঠ করে সারদাদেবীর মূর্তি ধ্বংস করলে টিপু মূর্তি নির্মাণের জন্য অর্থদান করেছিলেন। তিনি এই মন্দির সহ অপর বহু মন্দিরে নিয়মিত ভাবে অর্থসাহায্য দিতেন। এগুলিরই একটি, শ্রীরঙ্গনাথ মন্দিরের দূরত্ব টিপুর প্রাসাদ থেকে ছিল ১০০ গজ মাত্র। তাঁর প্রাসাদের পাশে আরও দুটি মন্দির ছিল। পরবর্তী কালে উদ্ধার হওয়া চিঠিপত্র থেকে স্পষ্ট, বিদ্বেষ দূরের কথা, মন্দিরগুলির সঙ্গে তাঁর নিয়মিত সংযোগ ছিল। এই সমস্ত নানা বৈশিষ্টে্যর জন্যই ইতিহাসে টিপু বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী।
হিন্দুত্ববাদীদের টিপু-বিদ্বেষ কেন
এমন এক ঐতিহাসিক চরিত্রের বিরুদ্ধে বিজেপি নেতাদের বিদ্বেষের কারণ কী? প্রথমত টিপু ছিলেন ধর্মে মুসলমান। বিজেপি রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য মুসলিম বিরোধিতা। ফলে বিধর্মী টিপুর নামের সঙ্গে ‘মহান’ শব্দটি তাদের কাছে গুরুতর অস্বস্তির কারণ। তা থেকেই টিপুবিরোধী হুঙ্কার। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, এনসিইআরটি-র মতো একটি ঐতিহ্যসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে মোদি সরকার এই হীন কাজে ব্যবহার করল। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ ভারত বিশেষত কর্ণাটকে জনসাধারণের মনে দক্ষ শাসক এবং ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াইয়ের জন্য টিপু সুলতানের মর্যাদার উচ্চ আসন রয়েছে। তাই টিপুর মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করতে না পারলে জনগণের মধ্যে বিভেদ তৈরি করার ক্ষেত্রে অসুবিধা হবে। অন্য দিকে জনমনে এই সমর্থনকে ভোটের কাজে লাগানোর জন্য, বিশেষত মুসলিম ভোট পাওয়ার জন্য ২০১৫ সালে কর্ণাটকে কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া টিপুকে একেবারে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী’ হিসাবে ঘোষণা করে দেয় এবং তাঁর জন্মবার্ষিকী উদযাপনে নেমে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বিজেপি নেতারা টিপুকে হিন্দু-বিদ্বেষী বলে প্রচার চালাতে শুরু করে। এ প্রসঙ্গে তাঁরা রাজ্যের ক্রুগ তথা কোডাগু এবং মালাবার এলাকায় টিপুর বিরুদ্ধে গণহত্যা ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরণের অভিযোগ তোলে। যদিও বিজেপি নেতারা কোনও ঐতিহাসিক নথি বা গবেষণা থেকে এই অভিযোগ তোলেননি। বর্তমান ইতিহাসবিদদের পক্ষ থেকেও এই অভিযোগ তোলা হয়নি। অর্থাৎ কংগ্রেস এবং বিজেপি মিলে সঙ্কীর্ণ ভোট রাজনীতির স্বার্থে টিপুকে এক ঐতিহাসিক চরিত্র থেকে এক ধর্মীয় চরিত্রের স্তরে নামিয়ে নিয়ে এল।
টিপু কি হিন্দু-বিদ্বেষী ছিলেন
মালাবারিস এবং কোভাডদের প্রতি টিপুর আচরণ যুদ্ধরত রাজ্যগুলির মধ্যে প্রায় একটানা ক্ষমতার লড়াইয়ের অংশ হিসাবেই ইতিহাসবিদরা বারবার উল্লেখ করেছেন। এই অঞ্চলের অধিবাসীদের টিপু বিদ্রোহী হিসাবে গণ্য করতেন। তার কারণ এরা বেশ কয়েক বার টিপুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং টিপু তাদের পরাজিত করেন ও ক্ষমা করে দেন। তার পরেও তারা বিদ্রোহ করলে তাদের শাস্তি দিতেই তিনি তাদের ধর্মান্তরিত করে শাস্তি দেন। তাঁর ধর্ম পরিবর্তনের এই নীতি কেবল ক্রুগ ও মালাবার অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এটা কোনও সর্বজনীন নীতি ছিল না। টিপুর সাম্রাজ্যে হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। মহীশূরে হিন্দু প্রজাদের উপর অত্যাচার বা ধর্মন্তরণের আর কোনও উদাহরণ নেই। তাদের উপাসনালয়ের কোনও ক্ষতি তিনি করেননি। তিনি মারাঠা এবং ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করার পাশাপাশি হায়দরাবাদের মুসলিম শাসক নিজামের শাসনের বিরুদ্ধেও লড়েছিলেন। অর্থাৎ এই লড়াইয়ের সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক ছিল না। নিজ রাজ্য অক্ষুণ্ন রাখা এবং আরও বিস্তৃত করার জন্য অন্য রাজ্য আক্রমণ, হত্যা, লুঠপাট সেই সময়ে সাধারণ বিষয় ছিল। এক কথায় এর চরিত্র রাজতান্ত্রিক। টিপুর প্রশাসনের উচ্চতর পদগুলিতে বহু হিন্দু ব্যক্তি নিযুক্ত ছিলেন। তাই বিদ্রোহী মালাবারিস বা কোভাডদের উপর টিপুর সৈন্যদের অত্যাচারের ঘটনায় ধর্মের রঙ দেওয়া চলে না।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদদের বক্তব্য কি গ্রহণযোগ্য
আধুনিক ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন যে, হিন্দু ও খ্রিস্টানদের প্রতি টিপু সুলতানের আচরণে যে নেতিবাচক ভূমিকার উল্লেখ আছে তা প্রথম দিকের ব্রিটিশ ইতিহাসবিদদের বিশেষত কার্ক প্যাট্রিক এবং মার্ক উইলকস এর মতো ইতিহাসবিদদের তৈরি। এই ব্রিটিশ গ্রন্থকারদের মধ্যে টিপু সুলতানকে নিষ্ঠুর হিসেবে উপস্থাপন করার বিশেষ প্রবণতা ছিল। ইতিহাসে টিপুকে এ ভাবে চিত্রায়িত করতে পারলে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের অবস্থানকেই সঠিক বলে গ্রহণ করতে হয়, কারণ ব্রিটিশরা টিপু সুলতানের হাত থেকে মহীশূর ছিনিয়ে নিয়েছিল। আর নিষ্ঠুরতার সাথে টিপুকে চিত্রায়িত করার মধ্যে দিয়ে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদরা এটাই বোঝাতে চেয়েছেন, মহীশূরবাসীকে টিপুর মতো অত্যাচারী শাসকের কবল থেকে মুক্ত করে ব্রিটিশ তাদের জন্য শান্তির দূত হিসেবে এসেছে। তাই কার্ক প্যাট্রিক এবং উইলকসের কাজ নির্বিচারে গ্রহণ করা উচিত হবে না। তার কারণ এই দুই ইতিহাসবিদ শুধুমাত্র ইতিহাসই লেখেননি তারা উভয়ই টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং তারা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে লর্ড কর্নওয়ালিস এবং ওয়েলসলির প্রশাসনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ফলে ব্রিটিশের অনুগত লেখকরা যা বলেছেন তা যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করলে বোঝা যায়, এর পিছনে রয়েছে ব্রিটিশের দখলদারির স্বার্থ।
ব্রিটিশ আর বিজেপির একই সুর কেন
কিন্তু টিপু প্রশ্নে ব্রিটিশের মনোভাবের সাথে বিজেপির মনোভাব মিলে যাচ্ছে কেন? কেন ইতিহাসের ধার ধারেন না বিজেপি নেতারা? ইতিহাসের আস্তাকুঁড় ঘেঁটে পছন্দমতো ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে তাদের বিভাজনমূলক নকশায় মিলিয়ে দেওয়াই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য কেন? বাস্তবে বিজেপি নেতারা টিপু চরিত্রের বিচার করতে বসেছেন তাঁর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদদের তোলা অভিযোগকে পুঁজি করে। ব্রিটিশরা ভারতে এসেছিল এ দেশকে শোষণ-লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে। এবং তা করতে গিয়ে তাদের সব থেকে বেশি প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিল টিপু সুলতানের পক্ষ থেকে। সেই টিপু সুলতান সম্পর্কে ব্রিটিশের মতামতের সঙ্গে যদি আজকের শাসক বিজেপি-আরএসএসের মতামত মিলে যায় তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ১৯৪৭-এর আগে এই হিন্দুত্ববাদীরা যে ব্রিটিশভক্তি দেখিয়ে প্রতি পদে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, এখনও সে ভক্তি যে অটুট, তা তাদের আজকের আচরণ থেকেই স্পষ্ট।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মূল যে উদ্দেশ্য, মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা, এক সম্প্রদায়ের মানুষের মন আর এক সম্প্রদায় সম্পর্কে বিষিয়ে তোলা, টিপু সম্পর্কে বিজেপি নেতাদের বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারের এটিই উদ্দেশ্য। না হলে তাঁরা ইতিহাসকে ইতিহাস হিসাবেই দেখতেন। বাস্তবে বিজেপি-আরএসএস যদি সত্যিই মানুষের উপর শাসকের অত্যাচার, ধর্মান্তরণের বিরোধী হত তবে তো তাদের সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করা উচিত ছিল ব্রিটিশের। সেই ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিজেপির কোনও বিরোধিতা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়েও ছিল না, আজও নেই। পরিবর্তে স্বাধীনতা সংগ্রামের সব চেয়ে উত্তাল সময়টিতে তাঁরা হয়ে উঠেছিলেন অত্যাচারী ব্রিটিশের সহযোগী। বাস্তবে ব্রিটিশের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতিটিকেও তারা আজ তাদের শাসন টিকিয়ে রাখতে দিব্যি ব্যবহার করে চলেছেন। যে টিপু সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়ে ব্রিটিশের বিরোধিতা করেছিলেন এবং ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রামে প্রাণ দিয়েছিলেন, সেই টিপুর বিরোধিতা করছে তারা যাদের ইতিহাস ব্রিটিশের প্রতি বিরোধিতার নয়, পরিপূর্ণ বন্ধুত্বের আর তাঁবেদারির।