
দিল্লির ভারত মণ্ডপমে ছ’দিন ধরে প্রবল আড়ম্বরে হয়ে গেল কৃত্রিম মেধার চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলন তথা এআই সামিট। সম্মেলনের খবরে দিন কয়েক সরগরম হয়ে রইল সংবাদমাধ্যম। থাকবে না-ই বা কেন? আন্তর্জাতিক স্তরের বিশাল এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল বিশ্বের ৬৫টি দেশ। এসেছিলেন ফ্রান্স, ব্রাজিল ইত্যাদি নানা দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা। যোগ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব, আইএমএফ-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রমুখ। উপস্থিত হয়েছিলেন গুগ্ল, ওপেন এআই, মেটা, মাইক্রোসফট, অ্যানথ্রোপিক সহ গোটা বিশ্বের প্রায় সমস্ত খ্যাতনামা এআই কোম্পানিগুলির প্রধানরা। দুনিয়ার প্রথম সারির ধনকুবেরদের অন্যতম বিল গেটস ভারতে এসেছিলেন, কিন্তু কুখ্যাত এপস্টিন কেলেঙ্কারিতে নিজের নাম জড়ানোয়, বিরূপ প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় সম্মেলনে পা রাখেননি। সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সহ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্তারা তো বটেই, উপস্থিত ছিলেন দেশের দুই প্রধান একচেটিয়া কারবারি আদানি ও আম্বানি ছাড়াও টাটা ইত্যাদির মতো বড় পুঁজির অন্যান্য মালিকরা।
উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গোটা বিশ্বের শীর্ষ এআই কোম্পানিগুলির মালিকদের এবং তাঁদেরই মুনাফার স্বার্থ দেখভাল করেন বিভিন্ন দেশের যে রাষ্ট্রপ্রধানরা, তাঁদের স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এই সম্মেলন হল ‘সর্বজন হিতায়, সর্বজন সুখায়’– অর্থাৎ সকলের কল্যাণের জন্য, সকলের সুখের জন্য। বলেছেন, এই সম্মেলন আসলে এআই-কে মানুষের উন্নতিতে ব্যবহারের লক্ষ্যে। এমনকি এআই ব্যবহারের মূল নীতিগুলির ইংরেজি ভাষান্তরের প্রথম অক্ষরগুলি নিয়ে তিনি তৈরি করেছেন একটি শব্দ– ‘মানব’ (এমএএনএভি) অর্থাৎ মানুষ।
সত্যিই তো! ভারতের প্রধান দুই একচেটিয়া পুঁজিমালিক গৌতম আদানি ও মুকেশ আম্বানি সহ বিশ্বের প্রথম সারির পুঁজিপতিরা এবং তাঁদের রাজনৈতিক ম্যানেজার হিসাবে নরেন্দ্র মোদি সহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা যে সম্মেলনে এসে হাজির হয়েছেন, তার প্রধান লক্ষ্য যে আপামর জনসাধারণের ‘কল্যাণ সাধন’ আর ‘সুখ বিধান’– এতে আর আশ্চর্য কী! শ্রমিকের ‘কল্যাণে’র জন্যই তো চিরদিন মালিকদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড!
সে যাই হোক, ‘মানবকল্যাণ’-এর লক্ষ্যে এই সম্মেলনে উপস্থিত মালিকরা বিপুল প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানিয়েছেন, আগামী দু’বছরে এআই-এর বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতে অন্তত ২০০ কোটি ডলার অর্থাৎ ১৮ হাজার কোটি টাকা লগ্নি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ভারতের আদানি গোষ্ঠী ঘোষণা করে দিয়েছে যে, ২০৩৫-এর মধ্যে এআই সংক্রান্ত নানা ক্ষেত্রে তারা ১০০ কোটি ডলার অর্থাৎ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করতে চলেছে। এ দিকে মুকেশ আম্বানিও সম্মেলন মঞ্চ থেকে ঘোষণা করে দিয়েছেন, এআই-এ সাত বছরের মধ্যে ১০ লক্ষ কোটি টাকা ঢালবে তাঁর কোম্পানি। তাঁদের লক্ষ্য নাকি প্রতিটি পরিবারে কম খরচে উন্নত মানের এআই পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া। শুনলেই মনে পড়ে যায়, ঠিক এমন করেই তাঁদের ‘রিলায়্যান্স জিয়ো’ প্রায় বিনা পয়সায় মানুষের হাতে ইন্টারনেট পরিষেবা তুলে দেওয়া শুরু করেছিল, যে পরিষেবার দাম বাড়তে বাড়তে ইতিমধ্যেই প্রায় গলা-কাটার স্তরে পৌঁছে গেছে। এ সবই নাকি তাঁরা করেছেন সর্বসাধারণের কল্যাণ ও সুখের ব্যবস্থা করতেই! আম্বানি ও আদানি গোষ্ঠী ছাড়াও ভারতের আরও কয়েকটি পুঁজি গোষ্ঠী নানা বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে এআই উদ্যোগে পুঁজি ঢালার ব্যবস্থা করে নিয়়েছে এই সম্মেলন থেকে।
এ দিকে দিল্লির শীর্ষ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি কোম্পানির কর্তাদের মুখে যখন সাফল্যের চওড়া হাসি, তখন খবরের কাগজের এক কোণে পড়ে থাকা একটি রিপোর্ট জানাচ্ছে, সরকারি হিসাবেই গত ডিসেম্বরের তুলনায় এ বছরের জানুয়ারিতে দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে গেছে। যদিও এ রিপোর্ট শুধুই সংগঠিত ক্ষেত্রকে ভিত্তি করে, যেখানে কাজ করে দেশের কর্মক্ষম মানুষের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশ। বাস্তবে গোটা দেশের বেকার সমস্যার প্রকৃত চিত্র আজ এতটাই ভয়ানক যে ইদানীং কেন্দ্রীয় সরকার সেই হিসাব প্রকাশ করাই বন্ধ করে দিয়েছে।
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এআই-এর প্রসার হলে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সাধারণ মানুষও ভাবতে পারেন, এই যে এআই ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হল, এতে তো বিপুল সংখ্যক মানুষের কাজ হবে। ফলে দেশের বেকার সমস্যার নিশ্চয়ই বেশ খানিকটা সুরাহা হবে। কিন্তু তা যে হওয়ার নয়, দিল্লির সম্মেলনের ভরা হাটেই সেই হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার বা আইএমএফ-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা স্বয়ং। বলেছেন, এআই দেশের আয় বৃদ্ধির হার বাড়াতে পারে, কিন্তু শ্রমের বাজারে এর ভয়ানক প্রভাব সুনামির মতো আছড়ে পড়তে পারে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, শ্রমের বাজারে এআই-এর প্রভাবে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ কর্মীর কাজ হারানোর আশঙ্কা এবং এই ঘটনা ঘটবে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী এআই-এর সাহায্যে বিপুল কর্মসংস্থানের যে কথা শোনালেন, তা শুধু গল্পই।
এমনিতেই ভয়াবহ বেকার সমস্যায় দেশের মানুষ জেরবার। নতুন কল-কারখানা খোলা দূরে থাক, বাজারসংকটের কারণে ক্রেতার অভাব এতটাই মারাত্মক যে পুরনো উৎপাদন সংস্থাগুলিও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একে একে। চলছে ব্যাপক হারে শ্রমিক ছাঁটাই। চড়া মুনাফার লোভে শ্রমিকনির্ভর পদ্ধতির জায়গায় পুঁজিপতিরা বেছে নিচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা। সরকারি, বেসরকারি উভয় সংস্থাগুলিতেই স্থায়ী পদ বলতে গেলে উঠে গেছে। সর্বত্রই চুক্তি শ্রমিকরা আজ ভয়ঙ্কর শোষণের শিকার।
এই অবস্থায় এআই চালু হলে পরিস্থিতি যে অসহনীয় হয়ে উঠবে সে বিষয়ে সন্দেহ থাকতে পারে কি? অথচ এআই চালু হলে দেশের বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের উপর তার কী প্রভাব পড়বে, এ নিয়ে দিল্লির সম্মেলনে কোনও আলোচনার প্রয়োজনটুকু পর্যন্ত বোধ করলেন না উদ্যোক্তারা। তাঁরা ব্যস্ত দেশ-বিদেশের কোম্পানিগুলির সঙ্গে যৌথ ভাবে এআই সংক্রান্ত উদ্যোগের ব্যবস্থা করে দিয়ে আদানি-আম্বানিদের আরও মুনাফা লুটের সুযোগ করে দিতে।
‘এআই-এর গডফাদার’ বলে পরিচিত নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত প্রখ্যাত কম্পিউটার-বিজ্ঞানী জিওফ্রে হিন্টন মন্তব্য করেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বেকার সমস্যা বাড়িয়ে তোলার পাশাপাশি চড়া মুনাফা লুটের সুযোগ করে দেবে। তিনি আরও বলেছিলেন, ধনীরা শ্রমিকদের বদলে এআই ব্যবহার করে নিজেদের মুনাফা বিপুল বাড়িয়ে নেবে, দেখা দেবে ভয়ঙ্কর বেকার সমস্যা। এর ফলে অল্প কয়েক জন ব্যক্তি আরও ধনী হয়ে উঠবে আর বেশির ভাগ মানুষ হয়ে পড়বে আরও দরিদ্র। বলেছিলেন, ‘এটা এআই-এর দোষ নয়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাই এর জন্য দায়ী’।
স্বাভাবিক নিয়মেই বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এআই-এর মতো নানা নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হচ্ছে। কিন্তু অন্যায় শোষণের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এই সব উন্নত প্রযুক্তি জনসাধারণের প্রয়োজন মেটানো ও কল্যাণের কাজে লাগানোর বদলে একচেটিয়া কারবারিদের মুনাফা লুটের কাজেই ব্যবহার করা হয়। বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের শিক্ষক মার্ক্স এবং এঙ্গেলস দেখিয়েছেন, প্রযুক্তি একদিকে যেমন শ্রমিক ছাঁটাই করে, অন্যদিকে ক্রমাগত শ্রমিকের ওপর কাজের বোঝা বাড়িয়ে যায়। নতুন নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে মুনাফা লুটের হার ক্রমাগত বাড়িয়ে যেতে না পারলে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় টিকতেও পারে না পুঁজিমালিকরা।
এ দিকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির সরকারে আসীন রাজনৈতিক নেতাদের কাজ নিজের নিজের দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের মুনাফার স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখা, তাদের জন্য মুনাফা লুটের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া। দিল্লিতে এআই শীর্ষ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সেই কাজটিই করলেন নরেন্দ্র মোদি সহ সম্মেলনে উপস্থিত নানা দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা। ভয়াবহ বেকারত্বের কোপে গোটা দুনিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ খেটে-খাওয়া মানুষদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ছে জেনেও এবং এআই-এর ব্যবহারে বিপুল কর্মসংকোচনে তাদের পণ্যের বাজার আরও সঙ্কুচিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা সত্তে্বও সম্মেলনে দেশের বিপুল সংখ্যক কর্মহীন মানুষ ও কাজে নিযুক্ত শ্রমিকদের জীবনে এআই-এর প্রভাব নিয়ে আলোচনাটুকুও করলেন না তাঁরা। শুধু মানুষকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে গেলেন যে এআই-এর ব্যবহার বেকার সমস্যা সৃষ্টি করবে না। সম্মেলনে ব্যাপক জাঁকজমকের ঝলকানির আড়ালে লুকিয়ে রাখতে চাইলেন কর্মহীন এবং কাজ হারানোর আশঙ্কায় আতঙ্কিত অসংখ্য মানুষের অসহনীয় জীবনযন্ত্রণাকে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সঠিক নেতৃত্বে জোট বাঁধতে হবে গোটা বিশ্বের খেটে-খাওয়া মানুষকে। দাবি তুলতে হবে, বিজ্ঞানের আশীর্বাদ এআই-কে শোষণের তীক্ষ্ণ হাতিয়ার হিসাবে নয়, মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। দাবি তুলতে হবে মালিকের মুনাফার স্বার্থে এআই ব্যবহার করে একজন শ্রমিকেরও কাজ কেড়ে নেওয়া চলবে না। দেশে দেশে গড়ে তুলতে হবে সংগঠিত ঐক্যবদ্ধ ও লাগাতার শ্রমিক আন্দোলন।
(এই লেখাটি গণদাবী ৭৮ বর্ষ ২৯ সংখ্যা ২৭ ফেব্রুয়ারি – ৫ মার্চ ২০২৬ এ প্রকাশিত)